শিশু মেলা

রমিজ সাহেবের একদিন

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৫-২০১৮ ইং ০২:১৩:০৯ | সংবাদটি ১২০ বার পঠিত

বর্ষাকালে আকাশের মন মেজাজ ঠিক বোঝা যায় না। কখনো মেঘ। কখনো রোদ। কখনো আবার বৃষ্টি ঝরে। বৃষ্টি ঝরে তো ঝরেই। একবার শুরু হলে যেন আর থামতে চায় না। আজ আকাশে মেঘ নেই। ফকফকা রোদ। কোনো মেঘ নেই বলে বৃষ্টি হওয়ার যে একেবারে সম্ভাবনা নেই, এ কথা অন্য কোথাও সত্য হলেও রমিজ সাহেবদের শহরে নয়। বর্ষাকালে এখানে যখন তখন বৃষ্টি ঝরে। দেখা গেল, একই সঙ্গে শহরের এক মাথায় রোদ উঠেছে। অন্য মাথায় আবার এক পশলা বৃষ্টি। আশ্চর্য নয় কী! এ সময়ে ছাতাই একমাত্র ভরসা। তাই ছাতাটি ব্যাগে পুরে বেরিয়ে পড়লেন রমিজ সাহেব।
অফিসে যাচ্ছেন তিনি। বাসা থেকে অফিসটা প্রায় তিন কিলোমিটার। বাসার কাছেই বেবি টেম্পুর স্ট্যা-। প্রতিরোজ ছাতাটা ব্যাগে পুরে সকাল সাড়ে আটটায় তিনি বের হবেন। স্ট্যা-ে এসে বেবিতে চড়বেন। তারপর রাস্তার দুপাশের সারি সারি গাছপালা, বাসাবাড়ি, যানবাহন দেখতে দেখতে তিনি অফিসে পৌঁছবেন। কিন্তু রমিজ সাহেব আজ বাসা থেকে বেরিয়ে দেখেন রাস্তা একেবারে খালি। রাস্তায় কোনো জনমানব নেই। নির্জন রাস্তা ধরে তিনি টেম্পু স্ট্যা- পর্যন্ত হেঁটে আসেন।
স্ট্যা-ে এসে দেখেন, টেম্পু স্ট্যা-ও খালি। কোনো বেবি টেম্পু নেই। রমিজ সাহেব অবাক হয়ে ভাবেন, ব্যাপার কী! তাহলে কী আজ হরতাল, ধর্মঘট! কিন্তু পূর্ব ঘোষণা না দিয়ে তো এসব কখনো পালন হয় না। তবে হয়েছে কী আজ! শহরটা এমন নীরব হয়ে আছে কেন! বিষয় কী?
টেম্পু স্ট্যা-ে দাঁড়িয়ে রমিজ সাহেব যখন এসব ভাবছেন, এমন সময় তার মনে হলো সহসা যেন সব আলো নিভে গেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেন, ঘন কালো পুঞ্জীভূত মেঘ। অবাক হয়ে তিনি ভাবেন, কোথা থেকে এলো এতো মেঘ! একটু আগেও তো এসব ছিল না। তার মানে এখনি বৃষ্টি নামবে। তাড়াতাড়ি ছাতাটা বের করা দরকার। নইলে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে ভেজা ছাড়া উপায় নাই।
রমিজ সাহেব ব্যাগের চেইন খুলে ছাতাটা বের করে মেলে ধরার পরক্ষণেই বিকট শব্দে কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়লো। সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি। ঝুম্ ঝুম্ র্ঝ র্ঝ বৃষ্টি। রমিজ সাহেব ভাবেন, বৃষ্টি যেভাবে শুরু হয়েছে; আজ বোধ হয় আর অফিসে যাওয়া যাবে না। কিন্তু আজ অফিসে না গেলে পর পর তিনদিন তার অফিস কামাই হবে।
রমিজ সাহেব গত দুদিন অসুস্থ ছিলেন। প্রচ- জ্বরে ভুগেছেন। তাই অফিসে যেতে পারেননি। আজও যদি অফিসে যেতে না পারেন, তাহলে তো অফিসের বস্ খুব রাগ করবেন। বেসরকারি চাকরি তার। বস্ কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। তিন দিনের বেতন কেটে নিবেন।
রমিজ সাহেব অধীর হয়ে এসব ভাবছেন। ভাবছেন আর বৃষ্টিতে ভিজছেন। ঠিক তখনি শোঁ-শোঁ আওয়াজ তোলে তুমূল বৃষ্টির মধ্যেই একটি সবুজ রঙের বেবি তার সামনে এসে থামলো। রমিজ সাহেব কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। তিনি কী এখন অফিসে যাবেন, নাকি বাসায় ফিরে যাবেন।
এমন সময় বেবি চালক বললো, কী এতো ভাবাভাবি করছেন ভাই। অফিসে যাবেন তো? জলদি উঠে পড়ুন। আমিও সেদিকেই যাচ্ছি। আপনাকে অফিসের সামনে নামিয়ে দিয়ে যাবো।
লোকটির কথা শুনে রমিজ সাহেব আর দেরি করলেন না। ছাতাটা গুটিয়ে বেবিতে চড়ে বসলেন। রমিজ সাহেবকে নিয়ে তুমূল বৃষ্টির মধ্যে শোঁ-শোঁ আওয়াজ তোলে বেবিটা ছুটে চললো। কিছুদূর এগোনোর পর রমিজ সাহেবের মনে হলো কেমন যেন অজানা অচেনা এক শহরের মাঝ দিয়ে তিনি চলেছেন। আলো জ্বলমল শহর। বৃষ্টি তখনো ঝরেই চলেছে। রমিজ সাহেব পথের দুধারে তাকিয়ে দেখেন, গাছপালা, দোকানপাট সব কেমন যেন অচেনা। অপরিচিত। শহরটির কোনো কিছুই তার কাছে চেনা বলে মনে হচ্ছে না।
রমিজ সাহেব হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন বেলা বাজে নয়টা। সাড়ে আটটায় তিনি রওয়ানা দিয়েছেন। টেম্পু স্ট্যা- থেকে অফিসে আসতে সময় লাগে মাত্র দশ থেকে বারো মিনিট। সে হিসেবে এতক্ষণে তার অফিসে পৌঁছে যাওয়ার কথা। অথচ এখনো অফিসের কোনো নাম নিশানাই তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। তাহলে তিনি চলেছেন কোথায়?
দুপাশে বিস্তীর্ণ সব বহুতল ভবন। আলোকোজ্জ্বল বর্ণিল শহর। অজানা, অচেনা অপরিচিত এই শহর। শহরের মাঝ দিয়ে প্রশস্ত রাজপথ ধরে তুমূল বৃষ্টির মধ্যে বেবি চড়ে রমিজ সাহেব অফিসের উদ্দেশে চলেছেন। এই যে তার পথচলাÑদেখে মনে হচ্ছে এর যেন কোনো শেষ নেই। অনন্তের দিকে নিরন্তর পথচলা তার। ভেবে তিনি বেবি চালককে জিজ্ঞেস করেনÑআমায় নিয়ে কোথায় চলেছেন ভাই? আমার কেমন যেন ভয় ভয় করছে।
জবাবে চালক বলেন, কোথায় আবার। জানেন না বুঝিÑযেখানে সবাই শুধু যায়। সবাইকে একদিন না একদিন যেতেই হয়। না গিয়ে কারো নিস্তার নেই।
চালকের কথা শুনে রমিজ সাহেব একটু সচেতন হয়ে লোকটির দিকে তাকান। দেখেন কীÑবেবিতে কোনো চালক নেই। কোনো মানুষজনই নেই। বেবিটি তবু ধেয়েই চলেছে। কী করে এটি সম্ভব! ভেবে কোনো কূল-কিনার করতে না পেরে ভয়ে সহসা মূর্ছা গেলেন রমিজ সাহেব।
অনেকক্ষণ পর যখন তার মূর্ছা ভাঙলো তাকিয়ে তো তিনি রীতিমতো হতবাক। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন তিনি। শিয়রে লোহার স্ট্যা-ে একহাজার পাওয়ারের স্যালাইন ঝুলছে। স্যালাইনটি তার শরীরেই ভরা হচ্ছে। পায়ের কাছে তার স্কুল পড়–য়া ছেলেটি মুখ ভার করে বসে আছে। বাবার অসুস্থতায় পুত্রের মন খারাপ। পাশে টোলে বসে চিন্তিত মনে তসবিহ্ গুনছেন তার বউটি। আশপাশে নার্স-ডাক্তার ঠিকই আছেন। তবে সবাইকে কেমন যেন উদ্বিগ্ন মনে হলো। বিষয় কী!
এমন সময় কর্তব্যরত ডাক্তার রমিজ সাহেবের মাথায় হাত রেখে বলেন, আপনার ভাগ্য ভালো। এযাত্রা বেঁচে গেছেন। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন আপনি। এখন জ্ঞান ফিরেছে। আর কোনো চিন্তা নেই। ওষুধ লিখে দিয়েছি। খুব শীঘ্রই সেরে উঠবেন ইনশাল্লাহ।
ডাক্তারের কথা শুনে রমিজ সাহেব স্ত্রী-পুত্রের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। পরে বিড়বিড় বলেন, যেখানে সবাই শুধু যায়, কোনোদিন আর ফিরে আসে না; আমি তাহলে এখনি ওখানে যাচ্ছি না। আরো কিছু দিন বোনাস সময় পেয়ে গেলাম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT