সম্পাদকীয় যে ব্যক্তি জেনেশুনে কোন জালিম ব্যক্তিকে সাহায্য ও সহযোগিতা করে, সে নিঃসন্দেহে দীন হতে বেরিয়ে গেলো। -মিশকাত

কোচিং বাণিজ্যের বিস্তার

প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৫-২০১৮ ইং ০২:৩৫:২৩ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত

ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে কোচিং বাণিজ্য। ছেলে-মেয়েদের পেছনে শিক্ষা ব্যয়ের ৩০ শতাংশই কোচিংয়ের পেছনে ব্যয় করছেন অভিভাবকগণ। শিক্ষার্থীর পেছনে মাসে কোচিং বা টিউশনি বাবদ কী পরিমাণ টাকা ব্যয় হয়, কিংবা একজন শিক্ষার্থী এক বছরে তার শিক্ষা ব্যয়ের কতো শতাংশ প্রাইভেট এ কোচিংয়ের পেছনে ব্যয় করছে- এই সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ তথ্যটি। পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এই জরিপে আরও জানা গেছে একজন শিক্ষার্থী বছরে তার শিক্ষার পেছনে যে টাকা ব্যয় করে তার মধ্যে ৩০ শতাংশ চলে যায় কোচিং আর হাউস টিউশন ফি বাবদ। আর ১৮ শতাংশ ব্যয় হয় বই খাতাসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ কেনার পেছনে। এছাড়া, ১৭ শতাংশ ব্যয় হয় ভর্তি, সেশন ফি, পরীক্ষার ফি বাবদ। যাতায়াত ও টিফিন বাবদ ব্যয় হয় ১৬ শতাংশ। টিউশন ফি-তে দশ শতাংশ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইউনিফরম খাতে নয় শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
অনেকেরই ধারণা যে, আমাদের লেখাপড়া হয়ে ওঠেছে কোচিং নির্ভর। বিশেষ করে, শহর অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ছে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য তারা সাহায্য নিচ্ছে কোচিং সেন্টারের। এতে যে তারা মোটেই লাভবান হচ্ছে না তা নয়, তবে অভিভাবকদের গুণতে হচ্ছে মোটা অংকের কোচিং ফি। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত লেখাপড়া হলে, শিক্ষকেরা পাঠদানে মনোযোগী হলে শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারের প্রতি ঝুঁকতে হবে না। দেশে এখন ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে সেখানে গড়ে ওঠেছে কোচিং সেন্টার। রঙ্গিন পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার, হ্যান্ডবিল আর মিডিয়ায় রংছটা বিজ্ঞাপন দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে এইসব কোচিং সেন্টার। প্রচারের এই চটকদারিতে আকৃষ্ট হচ্ছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত লেখাপড়া না হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকে পড়ছে কোচিং সেন্টারের দিকে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঙ্খিত লেখাপড়া হচ্ছে না। হাতে গোনা কিছু বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই বিরাজ করছে শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যা। তাছাড়া, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ক্লাসে পাঠদানে অমনোযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। দেখা গেছে, অনেক শিক্ষক ক্লাসে যথাযথ মনযোগ না দিয়ে কোচিং সেন্টারের প্রতি আকৃষ্ট করছেন শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। অথচ এই শিক্ষকরাই যেখানে ক্লাসের পাঠদানে তেমন মনোযোগী নন, তারা কোচিং সেন্টারে ঠিকই মনোযোগ সহকারে পাঠদান করেন।
শিক্ষাবিদসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য হচ্ছে- দেশে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে একটা অশুভ ও দুষ্ট চক্র তৈরি হয়েছে। এরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। আর পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে সমাপনী পরীক্ষা চালু হওয়ায় কোচিং বাণিজ্য শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। গত প্রায় ছয় বছর আগে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। তখন কোচিং বাণিজ্য বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছিলো। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে শতভাগ মনোনিবেশ করা। অতীতে শিক্ষকরা বেতন ভাতা কম থাকার অজুহাতে কোচিংয়ের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের পথ বেছে নেন। কিন্তু এখন শিক্ষকদের বেতন ভাতা সম্মান সবই বেড়েছে। তাই অভিভাবকরা বলছেন, কোচিংয়ের এই লাগাম ছাড়া বাণিজ্য বন্ধ করতেই হবে যেভাবেই হোক। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠদানে শতভাগ মনোনিবেশে বাধ্য করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT