স্বাস্থ্য কুশল

দি ফেমাস ফোর

ডা. এম সোলায়মান খান প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৫-২০১৮ ইং ০২:৪৬:২৫ | সংবাদটি ৩৫ বার পঠিত

উম্মুল মোমিনীন হযরত আয়েশা বিন্তে আবুবকর (রা.) বলেছেন ‘রাসূল (সা.) এর চরিত্রের পূর্ণ ব্যাখা হলো আল কুরআন’। আল কুরআনই রাসূল চরিত। (আহমদ/হা-২৫৩৪১, বুখারী-৩০৮, মুসলিম-৭৪৬)। রাসূল (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে রাসূল (সা.) এর কোনো সিরাত বা জীবন চরিত রচিত হয়নি। আরবরা লেখা-লেখিকে নিজেদের জন্যে হীনকর মনে করতো। তারা প্রখর স্মৃতি শক্তির কারণে কোনো কিছু মাত্র একবার শুনেই হুবহু তা বলে দিতো এবং বহুকাল তা সঠিক ভাবে মনে রাখতে পারতো। এজন্য কোনো কিছু লিপিবদ্ধ করে রাখার তেমন প্রচলন ছিলো না। সিরাত বা রাসূল (সা.) এর জীবন চরিত লেখা শুরু হয় মুয়াবিয়া (রা.) এর শাসনামলে। সেই থেকে যুগে যুগে যারা সিরাত লিখেছেন তাদের মধ্যে চার জন বর্তমান বিশ্বে মশহুর হয়ে আছেন, যাদেরকে অনেকে বলেন বিখ্যাত চার দি ফেমাস ফোর। র্কীতিমান এই চার মহান ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ করা হলো।
১) ইবনে ইসহাক (৭০৪-৭৬৭ খ্রি.)- সিরিয়ান খ্রিস্টান ঈয়াসার ছিলেন কায়েস ইবনে মাকরামার মুক্ত দাস। তিনি ইসলাম কবুল করে ইরাকের কুফা থেকে মদিনায় চলে যান। তার প্রৌত্র হচ্ছেন ইবনে ইসহাক। জন্ম মদিনায়, লেখা পড়া করেন মদিনা ও আলেকজান্দ্রিয়ায়। ইবনে ইসহাক সিরাত লেখেন রাসূল (সা.) এর মৃত্যুর ১১০ বছর পর আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুরের নির্দেশে। ইবনে ইসহাকের সিরাত হচ্ছে সকল সিরাত গ্রন্থের ভিত্তি। যখন সিরাত লেখা শুরু করেন তখন তার কাছে কোনো লিখিত ডকুমেন্ট ছিলো না। তিনি তাঁর সিরাতের উপকরণ সংগ্রহ করেন প্রচলিত উপকথা, জনশ্রুতি, কিংবদন্তি থেকে। অর্থাৎ যাহা বলেছে তাহা ইতিহাস। মাইকেল কুক তাঁর রচিত ‘মুহম্মদ’, অক্সফোর্ড, ১৯৮৩, পৃ.-৬৫, বলেন ‘অষ্টম শতাব্দীতে গজিয়ে উঠা রূপকথার কাল্পনিক গালগল্পে ইবনে ইসহাক ও অন্যরা নির্ভরশীল ছিলেন’।
প্রথিতযশা মার্কিন ব্লগার রবার্ট স্পেনসার তার রচিত ‘দি ট্রুথ এবাউট মুহম্মদ’ (রিজেন্সি পাবলিকেশন, ২০০৬, পৃ.-২৫) বলেন- ‘ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অতিরঞ্জিত, অপ্রমাণিত, সত্যতা প্রশ্ন যোগ্য’। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অতিরঞ্জিত, অপ্রমাণিত, অসত্য, বিশ্বাস করার পরও রবার্ট স্পেনসার তার ‘দি ট্রুথ এবাউট মুহম্মদ’ বইটির ৪০০টি ফুট নোটের মধ্যে ১২০ টি নিয়েছেন ইবনে ইসহাকের বই থেকে। তিনি বেছে বেছে কেবল ভিত্তিহীন, অপ্রমাণিত, বিতর্কিত বক্তব্যগুলি নিয়েছেন। আলফ্রেড গীয়োম ইবনে ইসহাকের ‘সিরাতে রাসূলুল্লাহ’ ইংরেজি অনুবাদ করেন ১৯৫৫ সালে ‘দি লাইফ অব মুহম্মদ’। প্রফেসর স্টিফেন বলেন- ‘গীয়োমের অনুবাদের সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যায়’। (ইসলামিক হিস্টরী-এ ফ্রেম ওয়ার্ক, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি, পৃ.-৭৮)। ফিলিস্তিনি প্রফেসর আবদুল লতিফ তাবায়ী বলেন ‘এই অনুবাদের পরতে পরতে অশুদ্ধতা বিদ্যমান’। (এরাবিক এন্ড ইসলামিক থীমস, লুজাক, লন্ডন, ১৯৭৬, পৃ.-৭৮)। ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম আহমদ (রহ.), ইমাম নুমায়ের (রহ.) প্রমুখ ইবনে ইসহাকের বর্ণনা প্রত্যাখান করেছেন। (শাইখ জালাল, প্রফেট অব মার্সি, অধ্যায়-২, পৃ.-১০)। শাইখ ইবনে ত্যাইমিয়া (১২৬৩-১৩২৮) বলেন- ‘ইবনে ইসহাকের বর্ণনা সনদ বিহীন’। (তাহদীব, নিজামিয়া, ইন্ডিয়া, খন্ড-৯, পৃ.-৪৩)।
ইবনে ইসহাকের মৃত্যুর পর তার ছাত্র বাক্কাকী তার কাজ সম্পাদনা করেন। বাক্কাকীর ছাত্র ইবনে হিসাম পুনরায় সম্পাদনা করেন যা সিরাতে ইবনে হিসাম নামে পরিচিতি পায়। ইবনে ইসহাকের অপর ছাত্র সালামা ইবনে ফজল। তিনিও ইবনে ইসহাকের কাজ সম্পাদনা করেন। সালামার ছাত্র আল তাবারী পুনরায় সম্পাদনা করেন যা তারিখে তাবারী নামে পরিচিত’। (ফ্রেড ম্যাগগ্রাথ, ন্যারেটিভ অব ইসলামিক অরিজিন, ডারউইন প্রেস, পৃ.-১৩২)।
ইবনে হিসাম এবং আল তাবারীর সিরাতের মধ্যে পার্থক্য হলো হিসাম তার সম্পাদনা কালে ইবনে ইসহাকের ভিত্তিহীন বর্ণনাগুলি বাদ দিয়েছেন এবং নির্ভরযোগ্য বর্ণনা যোগ করেছেন। তাবারী হিসামের মতো সতর্কতা অবলম্বন করেননি।
২) আল ওয়াকিদি (৭৪৭-৮২৩ খ্রি.), জন্ম মদিনায়, পিতামহ ওয়াকিদ এর নাম থেকে আল ওয়াকিদি। আল ওয়াকিদি ছিলেন বিশাল ইলমী জ্ঞানের অধিকারী। তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ৬০০ বান্ডিল কিতাব ছিল যা বহনের জন্যে ১২০টি বাহনের প্রয়োজন হতো। কিন্তু তিনি অধিকাংশ ইসলামী বিশেষজ্ঞদের নিকট গ্রহণ যোগ্য ছিলেন না। আল ওয়াকিদি ইসলাম বিদ্বেষীদের প্রধান অবলম্বন এবং তার রচিত কিতাব আল তারিখ ওয়া আল মাগাযী তাদের সবচেয়ে প্রিয় পছন্দের বই। ওয়াকিদির লেখাগুলি বর্তমানে পিলে চমকানো মিশাইল হিসেবে রাসূল (সা.) এর চরিত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। চার মাযহাবের অন্যতম সমসাময়িক ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন- ‘ওয়াকিদির সকল রচনা মিথ্যায় ভরপুর। সে মদিনার সাত জালিয়াতের একজন’। (ইবনে হাতিম আল রাজী, কিতাব আল র্যুহ, খন্ড-৪, পৃ.-২১)। ইমাম আবু দাউদ বলেন- ‘আমি ওয়াকিদির অথোরিটিতে কোনো হাদিস বর্ণনা করি না। সে জাল হাদিসের কারিগর’। (ইবনে হাজার তাহদীব, ভলিউম-৯, পৃ.-৩৬৬)। ইবনে হাজার আসকালানি (র) বলেন ‘অসীম জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্বেও ওয়াকিদি পরিত্যক্ত’। (তাহদীব, খন্ড-২, পৃ.-১৯৪। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.), ইমাম নূমায়ের (রহ.), ইমাম দাহাবী (রহ.) প্রমুখ মনিষী ওয়াকিদিকে মিথ্যুক বলেছেন। ( আল দাহাবী, মীযান, খন্ড-৩, পৃ.-১১০)।
৩) ইবনে সাদ (৭৮৪-৮৪৬ খ্রি.), জন্ম রাসূল (সা.) এর মৃত্যুর ১৫২ বছর পরে। বসরায় জন্ম এজন্যে নিসবা বসরী। দীর্ঘদিন বাগদাদে ছিলেন এজন্যে বাগদাদী। ওয়াকিদির সহকারী ছিলেন এজন্যে খতীবে আল ওয়াকিদি। তিনি ওয়াকিদির নকল নবিশ হিসেবে খ্যাতিমান। তার কিতাবের নাম ‘কিতাব আল তাবাক্কাত আল কবীর’। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির মর্যাদাপূর্ণ স্যার টমাস এডামস প্রফেসর পদটির অধিকারী লেবানীজ ইতিহাসবিদ তারিফ খালিদি বলেন- ‘ইবনে সাদের অধিকাংশ রচনা ওয়াকিদি থেকে নেয়া, এজন্যে তার মর্যাদা ওয়াকিদির মতো’। (এরাবিক হিস্টরিকেল থট্স, ক্যামব্রিজ, ১৯৯৪, পৃ.-৪৭)।
৪) আল তাবারী (৮৩৯-৯২৩ খ্রি.), তাবারীকে বলা হয় পার্সিয়ান প্রলিফিক পলিম্যাথ ‘পারস্যের চোখ ধাঁধানো প্রতিভা’। তিনি ছিলেন মুফাস্সির, মুহাদ্দিস, মুর্য়ারিক, তাফসির, হাদীস, ইতিহাস বিশেষজ্ঞ। জন্ম ইরানে কিন্তু সকল কিতাব আরবিতে রচনা করেন। আল তাবারী তার তারীখে তাবারীতে বর্ণিত ইতিহাসের দায় দায়িত্ব নিজে নেননি। সত্য মিথ্যার দায় দায়িত্ব চাপিয়েছেন তাদের উপর, যাদের কাছ থেকে তিনি ইতিহাস সংগ্রহ করেছেন। তাবারী তার কিতাবের ভূমিকায় একটি অদ্ভূত স্বীকার উক্তি করেছেন- ‘বর্ণনাকারীদের বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী আমি লিখে থাকি, আমার কিতাবে কোনো ভিত্তিহীন বা অসত্য কিছু পাওয়া গেলে তার জন্যে আমি দায়ী নই বা আমাকে দোষ দেয়া যাবে না। আমার কিতাবের সকল ভুল তথ্য, অসত্য বিবরণ এর দায় দায়িত্ব শুধু মাত্র তাদের যারা আমাকে এই গল্প গুলি বর্ণনা করেছে। তারা আমাকে যাই বলেছে আমি শুধু তাই লিখেছি। (তারিখ আল তাবারী, ইংরেজি অনুবাদ, ফ্রান্জ রাসেনথাল, নিউ ইয়র্ক ভার্সিটি, ভলিউম-১, পৃ.-১৭০-১৭১)। তারীখে তাবারী, ষষ্ঠ খন্ড, ইংরেজি অনুবাদ করেন মন্টগোমারী ওয়াট ‘মহম্মদ এট্ মক্কা’। বিখ্যাত সিরিয়ান ইমাম ইবনে কাথির (রহ.) (১৩০১-১৩৭৩ খ্রি.), যাকে ইমাদ-উদ-দীন বা বিশ্বাসের খুঁটি বলা হয় তিনি বলেন- ‘যদি তাবারী তার অদ্ভূত প্রতিবেদনটি না লিখতেন তাহলে আমি এটা করতাম না’। তার মশহুর কিতাব আল বিদায়া ওয়া আন নিহায়া (আদি থেকে অন্ত) খন্ড-৫, পৃ-২০৮, বলেন ‘তাবারী যা শুনেছেন তাই ইতিহাস হিসেবে লিখে ফেলেছেন। তার ঝুলিতে মূল্যবান মূল্যহীন, সত্য অসত্য, গভীর হালকা, রসদে ভরপুর’।
রাসূল (সা.) এর সিরাত বা জীবনী কোনো সাধারণ মানুষের জীবন চরিত নয়। রাসূল (সা.) এর চরিত্র সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে ‘নিশ্চয়ই আপনি সু-মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত। (সূরা : কালাম, আয়াত : ৪)। ‘নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ’। ( সূরা : আহ্যাব, আয়াত : ২১)।
কতিপয় বিখ্যাত মুসলিম সিরাত লেখক সিরাত রচনার সময়সীমাহীন অজ্ঞতা, অবহেলা, অদূরদর্শিতা, অসচেতনতা, অসতর্কতা, উদাসীনতা প্রদর্শন করেছেন। যার ফলে ইসলাম বিদ্বেষীরা সিরাতে বর্ণিত অনুমান নির্ভর কাহিনী, ভিত্তিহীন তথ্য, অসত্য বক্তব্য, অপ্রমাণিত বিবরণগুলি অতিশয় আনন্দে লুফে নিয়ে কুৎসিত হাতিয়ার হিসাবে রাসূল (সা.) এর চরিত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। খ্যাতিমান মুসলিম স্কলারদের কিতাবে উল্লেখ আছে, এজন্যে এগুলি সত্য, দাবি করে রেফারেন্স দিচ্ছে। আর দূর্বল জ্ঞানের মুসলিমদের মনে সংশয় সৃষ্টির অবিরাম চেষ্টা করছে। বরেণ্য তিউনিসিয়ান ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.) তার মুকাদ্দামায় বলেন- ‘অনেক মুসলিম ঐতিহাসিক কল্পিত ও নির্বোধ কাহিনী লিখে ইতিহাসকে উপহাস করেছেন’।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT