স্বাস্থ্য কুশল

মানবজীবনে উত্তম সাহচর্যের গুরুত্ব

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৫-২০১৮ ইং ০২:৪৮:১৫ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- ‘তোমরা সৎ লোকের সঙ্গী হয়ে যাও’ (সূরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)।
উক্ত আয়াতে আল্লাহপাক সৎ লোক বা উত্তম লোকের সাহচর্য লাভ করার নির্দেশ দিয়েছেন। উত্তম লোকের সাহচর্য লাভ করে অনেক মন্দ লোকও ভালো হয়ে যায়। উত্তম বস্তুর সংস্পর্শের কারণে অনেক অপদার্থ সোনায় পরিণত হয়ে যায়। কথায় আছে ‘সঙ্গগুণে লোহা ভাসে।’ লোহা পানিতে ভাসার কথা নয়। কিন্তু কাঠ পানিতে ভাসে বলে কাঠের সাথে লোহাও পানিতে ভাসে। খেজুর বীজকে সুদীর্ঘকাল টাকচার মধ্যে রাখা হলেও সেই বীজ বীজই রয়ে যায়। আবার এই বীজকে মাটি ও পানির সংস্পর্শে বা সাহচর্যে আনা হলেই সেই বীজ থেকে খেজুর বৃক্ষ উৎপন্ন হয়। এভাবে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুই নিজে নিজে প্রকাশ হতে পারেনা- সাহচর্য ছাড়া। যেমন লৌহ নিজে নিজে তরবারি হতে পারে না। জীবনে প্রকাশিত হতে হলে, প্রতিষ্ঠিত হতে হলে, মুক্তি পেতে হলে উত্তম লোকের সাহচর্য অবশ্যই লাভ করতে হবে। নেককার লোকের সাহচর্য লাভ করলে নেককার হওয়া যায়, ওলীর সাহচর্য লাভ করলে ওলী হওয়া যায়। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহাফের ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। মূর্তিপূজক বাদশা দাকিয়ানুশের আমলে ৭ জন যুবক তাদের ঈমান ও সততা রক্ষার জন্য তাদের দেশ ত্যাগ করেন। তখন একটি কুকুরও তাদের সঙ্গী হয়ে যায়। সেই ৭ জন যুবকের নাম হচ্ছে- মাকসেলাইনিয়া, মারনুশ, মাসলিনিয়া, ইয়ামলিখা, কাফশাততাইয়ুশ, দাবারনুশ ও শাযনুশ। আর কুকুরটির নাম ছিল কিতমীর। তারা একটি গুহায় আশ্রয় নেয়। কুকুরটি পাহারাদার হিসেবে কাজ করে। ঐ গুহার মধ্যে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। এক ঘুমে ৩০৯ বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। ইরশাদ হচ্ছে- ‘উহারা উহাদের গুহায় ছিল তিন’শ বছর, আরো নয় বছর’ (সূরা : কাহাফ, আয়াত : ২৫)
নেককার লোকের সাহচর্য লাভ করায় উক্ত ৭ জন যুবকের সাথে আল্লাহপাক সেই কুকুরকেও জান্নাত দান করবেন। নেককার লোকদের সাহচর্য লাভ করায় একটি কুকুর যেখানে জান্নাতের অধিকারী হল সেখানে আমরা যদি আল্লাহর ওলীদের সাহচর্য লাভ করি তাহলে যে সীমাহীন উপকৃত হবো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হযরত মুকাতিল (রা.) বর্ণনা করেন- নেককার লোকের সাহচর্য লাভ করায় দশটি পশু জান্নাত লাভ করবে। ১) হযরত সালেহ (আ.) এর উটনী। ২) হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর গোবৎস। ৩) হযরত ইসমাইল (আ.) এর দুম্বা। ৪) হযরত মুসা (আ.) এর গাভী। ৫) হযরত ইউনুস (আ.) এর মাছ। ৬) হযরত উজায়ের (আ.) এর গাধা। ৭) হযরত সুলাইমান (আ.) এর সাথে কথোপকথনকারী পিঁপড়া। ৮) বিলকিস রাণীর কাছে প্রেরিত দূত হুদহুদ পাখি। ৯) হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর হিজরতের সওয়ারী উষ্ট্রী কাসওয়া। ১০) আসহাবে কাহাফের সঙ্গী কুকুর (দাষ্কাইকুল আখবার ইমাম গাজ্জালী)। এসব পশু পাখি এতো উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে নবী-রাসূলগণের সাহচর্য লাভ করার কারণেই।
রাসূল (সা.) ছিলেন আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর পবিত্র সাহচর্য লাভ করে সাহাবায়ে কেরামগণ এতো উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলেন যে- আল্লাহপাক সেই সাহাবায়ে কেরামকে বিশ্ববাসীর জন্য পবিত্র কুরআনে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১৩৭)। নবী (সা.) বলেছেন- ‘আমার সাহাবাগণ হলেন তারকারাজের মতো। তোমরা তাঁদের যে কাউকে অনুসরণ করবে হেদায়ত পাবে’ (রজীন, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-৫৫৪)। নবী (সা.) এর পবিত্র সুহবত বা সাহচর্য পেয়ে জাহেলী যুগের সেই বর্বর জাতি সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাস এর জ্বলন্ত প্রমাণ। আমরা সব সময়ই আমাদের অতি আপনজন মাতা-পিতা, উস্তাদগণের সাহচর্যে থাকি এছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতাদের সাহচর্যে অনেক সময় ব্যয় করে থাকি। কিন্তু এদের সহাচর্যে থেকেও আমরা চরিত্রবান হতে পারি না, ভালো হতে পারি না। ফলে আমাদের পুরো সমাজটা সন্ত্রাস ও দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। শান্তির দূরতম লক্ষণও আমাদের সমাজে নেই। এর কারণ কি? এর জবাবে আমি বলবো- বীজ যেমন বৃক্ষ তেমন অথবা বৃক্ষ যেমন ফল তেমন। বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়। বীজ ভালো হলে বৃক্ষ ভালো হবেই, বৃক্ষ ভালো হলে ফল ভালো হবেই। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নানাভাবে দুর্নীতিতে আক্রান্ত। যেখানে যাই, যার কাছেই যাই- সেখানেই দুর্নীতি। নীতিবান হওয়ার জন্য আমরা কার কাছে যাব? কার সাহচর্য লাভ করব?
শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনে বিনোদনের বিকল্প নেই। সেই বিনোদনের নামে অশ্লীল ও নগ্ন নাটক ছবি দেখাকে অনেকে নিত্য সঙ্গী করে নিয়েছেন। পিতার সাথে ছেলে, মায়ের সাথে মেয়ে তথা গোটা পরিবার একই সঙ্গে বসে এসব অশ্লীল ছবি দেখে থাকেন এসব অশ্লীল ছবি ও নাটকে অবৈধ প্রেম-প্রীতি, সন্ত্রাসের কৌশল শিক্ষা ও নগ্নতা ছাড়া আর কিছুই নেই। পিতা- মাতা নগ্ন ছবি দেখলে ছেলে-মেয়েরা তো সেই নগ্ন ছবি দেখবেই। পিতা-মাতার সাহচর্যে থেকে এভাবে ছেলে-মেয়েদের চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। মাতৃক্রোড়ই হচ্ছে সন্তানদের জন্য নৈতিকতা শিক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়। সুতরাং পিতা-মাতা দুর্নীতিবাজ ও নগ্ন প্রিয় হলে সন্তান দুর্নীতিবাজ ও নগ্নপ্রিয় হবেই। প্রশ্ন হলো- নীতিবান ও সততা শিক্ষার জন্য ছেলে-মেয়েরা যাবে কোথায়? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও একই। সন্তানরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায় সৎ ও নীতিবান হওয়ার জন্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এরা উচ্চ শিক্ষা লাভ করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এবং আশ্চর্যজনক হলেও বাস্তব যে, সমাজ ও রাষ্ট্রে যারা দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসী বলে পরিচিতি লাভ করে, দেখা যায় এরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকার পরও তারা সৎ ও নীতিবান হতে পারে না। এর কারণ কি? এর মূল কারণ হচ্ছে উত্তম সাহচর্যের অভাব। উত্তম সাহচর্যের অভাবে ছেলে-মেয়েরা সৎ ও মহৎ হতে পারছেন না। উত্তম হতে হলে উত্তম সাহচর্যে থাকতে হবে। বীর হতে হলে বীরের সাহচর্যে থাকতে হবে। হযরত বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) মায়ের গর্ভ থেকেই পবিত্র কুরআনের আঠার পারা মুখস্ত করে ছিলেন। এর কারণ ছিল তাঁর মায়ের আঠার পারা কুরআন মুখস্ত ছিল। আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) মায়ের গর্ভে থাকাকালে তাঁর মা বার বার কুরআন তেলাওয়াত করতেন। এই কুরআন তেলাওয়াতের পূর্ণ প্রভাব আব্দুল কাদির জিলানীর উপর পড়েছিল। ফলে মায়ের গর্ভে থেকেই আব্দুল কাদির জিলানী কুরআনের আঠার পারা মুখস্ত করতে সক্ষম হয়ে ছিলেন। সন্তান মায়ের গর্ভে থাকাকালে মা যদি অশ্লীল ছবি নাটক দেখেন বা নগ্ন নাটক চর্চা করেন তাহলে সেই সন্তান তো নষ্ট-ভ্রষ্ট ও সন্ত্রাসী হবেই। উত্তম সাহচর্যের গুরুত্ব যে সীমাহীন তার প্রমাণ পাই হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) এর পবিত্র জীবনী চর্চা করলে। হযরত আব্দুল কাদির জিলানীর (জন্ম-৪৭০ হিজরি) সময়ে বাঘের উপর সওয়ার হয়ে এক পীর সাহেব বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানীর বাড়িতে এসে মেহমান হলেন। সেই পীর সাহেব তাঁর বাঘের খাদ্য হিসেবে একটি গাভী দাবি করলেন। বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী মেহমানের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করলেন। তিনি সেই পীরের (মেহমানের) দাবী অনুযায়ী তাঁর বাড়ির একটি গাভী প্রদান করলেন। বড়পীর সাহেবের দেয়া গাভীটি খাওয়ার জন্য যখন সেই পীরের (মেহমানের) বাঘটি উদ্যত হলো তখনই বড়পীর সাহেবের বাড়ির একটি কুকুর এসে ঐ বাঘের উপর আক্রমণ করে বাঘটি হত্যা করে ফেলল। সুবহানাল্লাহ! কুকুর কর্তৃক বাঘ হত্যা করা কি কখনও সম্ভব? এখানে সম্ভব হয়েছে সেই কুকুরটি বড়পীর সাহেবের বাড়িতে বা বড়পীর সাহেবের সাহচর্যে থাকার কারণেই।
একটি কুকুর বড়পীর সাহেবের সাহচর্যে থেকে বাঘ হত্যা করার মতো ক্ষমতা লাভ করলো। সুতরাং একজন মানুষ যে এর চেয়ে আরো বেশি ক্ষমতার অধিকারী হবে উত্তম লোকের সাহচর্যে থেকে তা উক্ত ঘটনা থেকে দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত। আমরা আউলিয়ায়ে কেরামের সাহচর্যে থাকি না বা থাকার চেষ্টাও করি না। আউলিয়ায়ে কেরাম বা উত্তম লোকের সাহচর্যে থাকার মধ্যে যে ‘এটমিক পাওয়ার’ লুকিয়ে আছে তা যদি আমরা জানতাম তাহলে সব সময় আউলিয়ায়ে কেরামের সাহচর্যে থাকতাম- কখনও আউলিয়ায়ে কেরামের সাহচর্য (সুহবত) ত্যাগ করতাম না। আউলিয়ায়ে কেরামের সাহচর্যেই রয়েছে পরম শান্তি।
সৎ ও মহৎ হওয়া ব্যতিত দুনিয়া-আখেরাতে মুক্তির কোনো উপায় নেই। সেই সৎ ও মহৎ হওয়ার জন্য উত্তম সাহচার্যের অতি প্রয়োজন। নেককার লোকের সাহচর্য লাভ করা ও তাঁদের মত ও পথ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- ‘যে বিশুদ্ধ চিত্তে আমার অভিমুখি হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর’ (সূরা : লোকমান, আয়াত : ১৫।
মানবজীবন সুখী-সুন্দর হয় সৎসঙ্গ বা উত্তম সাহচর্যের মাধ্যমেই। সৎসঙ্গ ছাড়া উন্নত মানবজীবন কল্পনা করা যায়না। তাই তো কবি যথাযথ বলেছেন-‘সুহবতে সালেহ তোরা সালেহ কুনদ/ সহবতে তালেহ তোরা তালেহ কুনদ’। অর্থাৎ সৎসঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • কোন জ্বরে কী দাওয়াই
  • মায়ের দুধ পান : সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • রোগ প্রতিরোধে মিষ্টি কুমড়া
  • আমাশয় চিকিৎসায় পরিচিত ভেষজ
  • ভাইরাল হেপাটাইটিস
  • পাইলস কি কোনো গোপন রোগ
  • শিশুর খাবারে অরুচি ও প্রতিকার
  • স্বাধীনচেতা ইবনে সিনা : চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়
  • ধূমপান স্মার্টনেস নয় মৃত্যু ঘটায়
  • থাইরয়েড সমস্যা ও সমাধান
  • আমের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগুণ
  • এলোভেরা ও প্রপোলিস : দাঁতের যতেœ চমৎকার এক জুটি
  • অর্জুনের এত্তো গুণ
  • রোগ প্রতিরোধে আমলকী
  • ঔষধি গুণের ইলিশ
  • ওমেগা-থ্রি : মানবদেহে এর গুরুত্ব
  • নিরাপদ মাতৃত্ব রক্ষায় প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মিডওয়াইফ
  • রক্ত স্বল্পতা : জনস্বাস্থ্যের প্রধান সমস্যা
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • দেশে দেশে রোজা
  • Developed by: Sparkle IT