সাহিত্য ইয়োরডান ইয়োভকভ

শাদা সুয়ালো

ভাষান্তর : আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৫-২০১৮ ইং ০২:১৩:৪২ | সংবাদটি ৬০ বার পঠিত

[ইয়োরডান ইয়োভকভ (Yordan Yovkov)-এর জন্ম ১৮৮০ এবং মৃত্যু ১৯৩৫ সালে। বুলগেরিয়ার প্রখ্যাত লেখক। বলকান যুদ্ধ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সৈনিক জীবনের উপর লেখা তাঁর গল্প যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে সর্বত্র আদৃত। তাঁর লেখায় আছে গ্রামীণ জীবনের আটপৌরে হাসি কান্না। জীবনের ছোট ছোট সমস্যা এবং দ্বন্দ্ব নিয়ে তিনি লেখেন। মানুষের যা কিছু ভালো এবং জীবনের যা কিছু সুন্দর ইয়োভকভ তাঁর গল্প-উপন্যাসে তাই ধরে রেখেছেন। Along the mesta River, The songs of The wheels, A woman’s heart প্রভৃতি গল্প গ্রন্থ ছাড়া ইয়োভকভের উপন্যাসও রয়েছে। তাঁর প্রচুর রচনা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত। শাদা সু য়ালো গল্পে বলকান অঞ্চলের একটি সাধারণ জীবনচিত্র অঙ্কিত।]
পিটার মোকানিন মেষ আর কুকুর নিয়ে ভীষণ বিব্রত। গলা ছেড়ে সে কুকুরগুলোর উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ে। এই ব্যস্ততার মাঝেও সে বুঝতে পারে নবাগত লোকটা সময় কাটাতে আসেনি। নিশ্চয়ই লোকটা কোনো সমস্যা নিয়ে এসেছে। পিটারের মেজাজ বিগড়ে যায়। গালাগাল দেয় কুকুরগুলোকে। জোর করে মুখে হাসি টেনে তাকায় লোকটার দিকে। পরনের জামাকাপড় দেখে আন্দাজ করতে চায় ও কোন অঞ্চলের লোক। দীর্ঘ শক্ত শরীরে অভাবের ছাপ। খালি পা, কুচকানো শার্ট, রংচটা বেল্ট, ছেড়া ট্রাউজার। লোকটার ভেতর বাইর চোখের পলকে মেপে নেয় পিটার। হ্যাঁ, এমন লোকই একটা মাছিকেও ঘা দিতে পারে না।
নবাগত লোকটা বিড়বিড় করে কী যেন বলে। মনে হয় শুভেচ্ছা জানায়। ‘সুপ্রভাত, কেমন আছেন’, ধরনের জিজ্ঞাসা ফুটে ওঠে তার চোখে মুখে। পিটার বুঝতে পারে লোকটা ভিন্ন জগতে ঘুরছে। নিশ্চয়ই সে বড় রকমের কোনা দুশ্চিন্তায় ভুগছে। দূর আকাশে দৃষ্টি ছড়িয়ে আঙ্গুল তুলে প্রশ্ন রাখে-এটাই কি মনজিলারী গ্রামের পথ? গ্রামটা আর কত দূর?
পিটার উত্তর দিতে গিয়ে দেখে অদূরে একটি ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে। একজন মহিলা বসে আছেন। উন্মনা, ক্লান্ত। কোলের উপর হাত দু’টি ছড়ানো। মাথার বাঁধা রুমাল অযতেœ ঝুলে আছে। পিটার জানে গরমের জন্য রুমালের দশা এমন হয়নি। দুশ্চিন্তাই এ শিথিলতার কারণ। গাড়ির পেছনে আরেক জন মহিলা। সম্ভবত তরুণী। চাদর দিয়ে আধখানা শরীর ঢাকা। বালিশে মাথা রেখে স্থির শুয়ে আছে। মুখখানা একপাশে হেলানো। তাই আর দেখা গেল না।
‘মনে হচ্ছে রোগী নিয়ে চলেছেন।’
‘হ্যাঁ! আমার মেয়েটা অনেক দিন থেকে অসুস্থ।’
পিটার মেষ পালের দিকে একবার তাকায়। পাশেই তৃণ ভূমিতে চরছে। চোখ ফেরাতেই লোকটা বলে, ঐ আমার মেয়ে। বড় বিদঘুটে রোগ ওর।’ ... পরিবারটি সম্পর্কে পিটারের আগ্রহ জন্ম নেয়, লোকটি বলতে শুরু করে,
‘আমরা মেদেরা অঞ্চলের লোক। আমি অবশ্য আগেও ওদিকে এসেছি। মাটির বাসনপত্র নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াই। মেয়েরা কিনে। বিক্রি করে ফেরার পথে মাছ, আঙ্গুর, তরিতরকারি, ফল, ফসল কিনে নেই। এভাবে বেশ চলছিল। কিন্তু এই ...,
লোকটা এবার মাটিতেই ধপাস করে বসে পড়ে। চামড়ার ছোট থলে থেকে সুকা বের করে সিগারেট বানাতে লেগে যায়। লোকটার হাতের কর্মদক্ষতার দিকে চেয়ে থাকে পিটার।
লোকটি আবার শুরু করে,
‘ভাই পোড়া কপাল আমার! ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখে সংসার করবো, ভাগ্যে সইলো না। দুটি তো সেই আতুড়ঘরেই মারা গেল। কেবল এই একটি মেয়ে। চোখের মণি আমাদের। নিজে না খেয়ে না পরে ওর সব অভাব-অভিযোগ পূরণ করি। অন্য মেয়েদের দেখে নিজের গরিবী যেন বড় করে না বুুঝে, সতর্ক থাকি। খোদা তাকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সে এখন একেবারেই বদলে গেছে। দিন দিন মলিন হচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে। তার মা বলে, হবে না কেন? ওর সমবয়েসীদের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। মেয়েটির কিছুই করা গেল না। মার কাছে এটা অসহ্য। আমি মেয়েটাকে সান্ত¦না দিয়ে বলি মা, তোমার কষ্ট কিসের! তোমারও বিয়ের পালা আসছে। শুধু শুধু অন্যের দিকে তাকাবে কেন? তারা তো ধনী, বড় লোক। যুবকরাও আজকাল কেমন যেন বদলে গেছে। ঐ ধনী মেয়েদের দিকে ঝুঁকে আছে সব। শুধু বউ নয়। বউর সাথে ধনও চায় তারা। তাতে কী! নিশ্চয়ই তোমারও একদিন বিয়ে হবে মা! বয়স তো এখনো খুব একটা হয়নি। ছিঃ মা, চিন্তা করো না।’
‘মেয়ের বয়স কত হলো এবার?’
জানতে চায় পিটার।
‘ও এবার কুড়িতে পা দিচ্ছে। বিয়ে হয়নি এখনো। কুমারী, তরুণী সে।’ বিড়বিড় করতে করতে মেষগুলোর দিকে নজর দেয় পিটার। লোকটা আবার শুরু করে,
‘গত গ্রীষ্মে মেয়েটা ফসল কাটায় যেতে চাইল। আমরা গরিব ঠিকই। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বারণ করি। সে বলে, যেতে দাও বাবা! অন্য মেয়েদের সাথে মিশে থাকবো ক’দিন। কাজ করবো। ভালো লাগবে। শেষ পর্যন্ত আমি আর বাধা দেইনি। কিন্তু হায়! এতেই বাঁধলো বিপত্তি। মেয়েরা দিনে কাজ করে। রাতে মাঠেই ঘুমায়। একদিন খুব বেশি কাজ করেছে সবাই। রাতে খেয়ে দেয়ে হৈ-হুল্লোড় করে গান-বাজনার পর শুতে গেছে। নানকা-হ্যাঁ, আমার মেয়েও সবার সাথে শুয়ে পড়ে। শস্য স্তূপের মাঝখানে প্রতি রাতের মতো শুয়ে থাকে সে। ঘুম আসে তার। হঠাৎ বুকের উপর কিসের চাপ সে টের পায়। ভারী শীতল, পিচ্ছিল কিছু একটা যেন সারা বুক লেপ্টে আছে। চোখ খুলতেই দেখে একটা বিরাট সাপ। বুক পেঁচিয়ে ঘুমিয়ে আছে বুকের উপর।’
পিটার আঁতকে ওঠে। প্রশ্ন করে-‘তারপর’?
‘তারপর সে ঝাড়া দিয়ে সাপটাকে ফেলে দেয় দূরে, না, তাকে কামড়ায়নি। এভাবেই মেয়েটা বলেছে আমাকে। এটা ঠিকই ঘটেছিল নাকি স্বপ্ন, জানি না। আমি তো সেখানে ছিলাম না। এরপর থেকেই মেয়েটা ফ্যাকাশে হতে থাকে দিন দিন। অকালে ঝরা ফুলের মতো কেমন মলিন দেখায় এখন তাকে। বুকে সে কিসের ব্যথা অনুভব করে। শুধু বলে, এই, এই এখানেই বাবা সাপটা এখানেই ছিল। উহ হচ্ছে কষ্ট বাবা!’
‘কী দুঃখজনক ব্যাপার! এখন যাচ্ছেন কোথায়? ডাক্তারের কাছে বুঝি!’
‘ডাক্তার। কত ডাক্তারই না দেখলেন তাকে। না-এখন আমরা যাচ্ছি ... কী বলবো বলুন, আসলে আমি ওসব বিশ্বাস করি না। কিন্তু মেয়েলী ব্যাপার স্যাপার কি না! আর ওদিকে মেয়েটাও একেবারে কাতর।’
...লোকটার গলা জড়িয়ে আসে। নীরবে নিজের গোঁফ টানতে শুরু করে। ধীরে ধীরে হাতটা চলে আসে দাড়িতে। কতদিন যে শেভ করা হয়নি, কে জানে! রুক্ষ খসখসে দাড়ি। পিটারের মনে হয় প্রতিটি দাড়ি যেন যন্ত্রণায় পাকানো একেকটা দড়ি।
লোকটির মুখে আবার কথা ফুটে, ‘গতকাল সন্ধ্যায় শহর থেকে ক’জন লোক আমাদের গ্রামে ফিরে গেছে। ওরা কী একটা নিয়ে বলাবলি করছে। এদের সবাই হলো গিয়ে বড় লোক। রসিকতাও হতে পারে। কিন্তু স্টনিশা দৌঁড়ে এসে জানায়, সে নাকি শহর ফেরৎদের সাথে কথা বলেছে। ওরা জানিয়েছে, মনিজিলারী গ্রামে এবার শাদা একেবারে বরফের মতো শাদা রঙের সুয়ালো পাখি দেখা গেছে। আমি বললাম, বেশ তো, তাতে কী হয়েছে। সে তিরস্কার করে বলতে শুরু করে, কী বোকা রে বাবা! তাও জানেন না। একশ বছরে একবার মাত্র একটি শাদা সুয়ালো দেখা যায়। যে কেউ একবার পাখিটাকে দেখে, যে রোগই হোক না কেন তা দূর হয়ে যায়। যান, যান দেরি করছেন কেন? নানকাকে নিয়ে এখনই বেরিয়ে পড়–ন। আহ খোদ! নানকা যদি একটি বার পাখিটা দেখতে পায়।’ ... স্টনিশা কান্না জুড়ে দেয়। নানাকার মা এটা বিশ্বাস করে লুফে নেয়। আমরা বেরিয়ে পড়ি পাখিটার খোঁজে।
‘কিন্তু এটা কি সত্য? কই পাখিটা কোথায়? পিটারের বিস্ময় মাখা প্রশ্ন।’
‘বললাম, না, এদিকে কোথাও পাখিটা আছে। হ্যাঁ, শাদা একেবারে ধবধবে শাদা সুয়ালো।’
হতভম্ব পিটার দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয় রাস্তায়। প্রতিদিন সে মাঠে মেষ চড়ায়। টেলিগ্রামের তারে মাঠে ঝাঁকে ঝাঁকে সুয়ালো বসে। উড়াউড়ি করে। একদিনও সে খেয়াল করেনি। প্রথমবারের মতো খেয়াল হলো তার। শরৎকাল আসছে। সুয়ালো এবং বকের ঝাঁক বিদায়ের জন্য তৈরি হচ্ছে। এই তো টেলিগ্রাফের তারে সারবন্দি বসে আছে অসংখ্য সুয়ালো। মনে হচ্ছে, কে যেন এক ছড়া তসবিহ আড়াআড়ি টেনে দিয়েছে। কিন্তু এর সবগুলোই তো কালো। শাদা নেই একটিও।
‘এজন্যই আপনার কাছে আসা। মনে হলো বলে দিতে পারবেন। হয়তো শুনেছেন, দেখেও থাকতে পারেন।’
‘না ভাই, না আমি দেখিনি, কখনও শুনিওনি।’
পিটার কথাটা বলেই ভাবে, লোকটাকে হতাশ করা ঠিক নয়। তাই আবার বলে, ‘অবশ্য থাকতেও পারে। শাদা মহিষ, শাদা ইঁদুর, শাদা কাকও তো আছে। শাদা সুয়ালোও আছে হয়তো। আপনারা যখন শুনেই আসছেন তখন আছে নিশ্চয়ই।’
‘কে জানে বলুন, আমি তো এসব বিশ্বাস করি না। কিন্তু মেয়েদের ব্যাপার স্যাপার তো! তার উপর মেয়েটার অবস্থাও ভালো নয়।’
বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস নেয় লোকটা। দাঁড়িয়ে অদূরে রাখা গাড়ির দিকে পা বাড়ায়। পিটারও এগিয়ে যায় সাথে। পাশে যেতে না যেতেই বিষন্ন মহিলাটি স্বামীর দিকে তাকায়। মুখ দেখে জেনে নিতে চায় খবর। মেয়েটি এখনো মাথাটা কাৎ করে শুয়ে আছে। উদাসীন চোখে খুঁজছে শাদা সুয়ালো।
‘উনি বলছেন গ্রামটা পাশেই।’
গলার স্বর শুনে মেয়েটি ঘাড় ফেরায়। জৌলুসহীন শুকনো শরীর। রোগ পান্ডুর মোমের মতো চেহারা। চোখ জোড়া জীবন্ত উজ্জ্বল। হাসির আভাসে এখনও চঞ্চল। সে পিতা এবং পিটারের দিকে তাকায়। পিটারের দিকে করুণ চোখ রেখে লোকটা বলে ঃ নানকা উনি শাদা সুয়ালোটা দেখেছেন। আহ, এখন যদি আমরাও দেখে নিতে পারি।
আমরা কি পাখিটা দেখতে পাব? ক্ষীণ স্বরে জানতে চায় মেয়েটি। পিটার কিছু বলতে গিয়েও যেন থেমে যায়। একটু দম নিয়ে বলে অবশ্যই, অবশ্যই দেখবে মা। আমি স্বচক্ষে শাদা পাখিটা দেখেছি। একেবারে ধবধবে শাদা। তুমিও দেখবে। খোদা তোমাকে সাহায্য করুন। পাখিটা দেখে তুমি ভালো হও। চিন্তা করো না মা। পাখিটা দেখেই সুস্থ হয়ে উঠবে তুমি।
মা কেঁদে ফেলে এবং লোকটা কাশতে থাকে তখন। আনমনা দুর্বল হাতে সে লাগাম তুলে নেয়। গাড়ি এগিয়ে চলে সামনে।
‘খোদা হাফেজ বন্ধুরা, গ্রাম আর দূরে নেই। তারের দিকে চোখ রাখ তারের উপর ...।’
পিটার খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে চলমান গাড়ির দিকে অপলক চেয়ে থাকে। কালো রুমাল মাথায় মা’র পাশে মুমূর্ষু মেয়ে এবং দীর্ঘদেহী লোকটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ছোট্ট একটি ঘোড়া। প্রতি দুটি টেলিগ্রাফের খুঁটির মাঝখান অগুণতি সুয়ালোর আনাগোনা। চঞ্চল পাখিগুলো স্ফূর্তিতে অস্থির।
বিষন্ন পিটার মেষপালের দিকে ফিরে তাকায়। নিজের কাজে মন দেয়। কিন্তু ওদের ভুলতে পারে না। শাদা সুয়ালো হয় নাকি। ভাবতেই বুকের ভিতর কিছু একটা খোঁচায় তাকে। কষ্ট হয় পিটারের। উদার আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলে, হায় খোদা, কত বিচিত্র সমস্যা দিয়ে দুনিয়াটা ভরে রেখেছ তুমি!
আবার দৃষ্টি চলে যায় সেই চলন্ত গাড়ির দিকে

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT