সাহিত্য

অতিমাত্রিক

সাব্বিরুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৫-২০১৮ ইং ০২:১৫:০৬ | সংবাদটি ৫৭১ বার পঠিত

পুরাকীর্তির বিশাল ধ্বংসস্তুূপের সামনে দাঁড়িয়ে নাকে লাগল বিপদ-সংকটের গন্ধ। দমকা গরম হাওয়া বয়ে গেল চারপাশে কয়েক দফা। শেয়ালের ডাক শুনতে পেলাম দূরে কোথাও। অথচ দেখে এসেছি এটা দিন-দুপুর। কর্কশ শব্দ করে উপর দিয়ে উড়ে গেল অজানা পাখি। আরও অচেনা তার গলার স্বর। উঁচু গাছ-পালার ডালে হুড়োহুড়ির আওয়াজ শুনে তাকালাম উপর দিকে । লাফিয়ে চলে গেল লালচে বানরের দল। দু’চারটে হনুমানও মনে হল রয়েছে দলের ভেতর। একসঙ্গে শূন্যে লাফিয়ে আরেকটা বড় গাছে যাওয়ার পথে মল ত্যাগ গেল কয়েক পশলা। পড়ল এসে আমার সামনেই। ধারে-কাছের শতবর্ষী গাছে ডাক শুনতে পেলাম বারকয়েক। মনে হল হুতোম প্যাঁচা ডাকছে । বিধ্বস্ত পুরাভবনের ওপারটা অন্ধকার। ওখানে যেতে সাবধান করে দেয়া হয়েছে আমাকে হাজারবার। করেছে জৈন্তা রেষ্ট হাউসের ম্যানেজার। তার নাম মনে করতে চেষ্টা করলাম দু’একবার। নাম মনে আসলে লোকটার জানিয়ে দেয়া সতর্কবার্তা এবং অন্যান্য বিষয়গুলোও স্মরণ করতে পারতাম। প্রাচীন, অভিশপ্ত এই ধ্বংসকীর্তির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারা সহজ হয়ে যেত।
সঙ্গে যে ক্যামেরা রয়েছে, উন্নতমানের সেটা। শক্তিশালী লেন্সের ক্যামেরা। জুম করলে অনেক দূরের বিষয়বস্তুও লাফ দিয়ে চলে আসে কাছে। দ্রুত ঝটপট ছবি তোলে ফেললাম বেশ কিছু। ডিসপ্লে দেখে নিশ্চিত হলাম-উঠছে ছবিগুলো। ভালই বেশ স্পষ্ট। পুরাভবনের ধ্বংসস্তুূপের আকার বিরাট। অনুমান করলাম ১৫০-২০০ ফুট উঁচু হবে। জৈন্তা রাজপরিবারের মূল বাসভবন। মিশে যেতে পারেনি মাটিতে। মাঝে মধ্যেই রয়ে গেছে ভেতরে ঢোকার মতো পথ। ফাঁকা দেয়াল আর বড় বড় খিলানের ভাঙ্গা অংশ বিশেষ। দীর্ঘ যুগ ধরে জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে আছে ধ্বংসভবন। প্রাচীন কীর্তির সাক্ষী দিতেই যেনো। রেষ্ট হাউসের ম্যানেজার বলেছিল প্রচুর অভিশাপ আছে রাজবাড়ি ঘিরে। আছে নৃশংস অত্যাচারের শাপান্ত। কান পাতলে নাকি করুণ আর্তনাদ শোনা যায় বিধ্বংস ভবনের দেয়ালে। অথচ জৈন্তারাজের শাসন কালের পর পেরিয়ে গেছে শতাব্দী। ম্যানেজারের নাম মনে আনতে চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলাম আবারও। মনে পড়লে তার কাছে শোনা আরও কিছু বিপদ-আপদের কথাও চলে আসত নিঃসন্দেহে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, যা হয় হবে, ধ্বংসস্তুূপের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাব সামনে। অনুভব করলাম শ্বাসরুদ্ধকর রোমাঞ্চের হাতছানি। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, আসুক। একা অন্ধকারকে ভয় করি না আমি। বিপদ যতই ভয়ানক হোক, সাহস আর শক্তি সঞ্চয় করে নেয়ার অভ্যেস আমার অনেক দিনের। একদল কুকুরের ডাক শুনতে পেলাম হঠাৎ। পরপরই শিয়ালের পলায়নপর আর্তনাদ। হুক্কা-হুয়া। এ সময়ে শিয়াল কুকুর সামনা-সামনি হলো কোথা থেকে!
আশে-পাশে নির্জন বন-জঙ্গল দেখেছি। দূরে খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের চূড়াও চোখে পড়েছে। পাহাড়ের গায়ে জঙ্গল আর গাছপালা। যাকে বলে গহীন বনাঞ্চল। অভাব নেই অজানা-অচেনা জীবজন্তুর । একটু শীত নামলে পাহাড় জঙ্গল থেকে নেমে আসে চিতাবাঘ, বনবিড়াল আর বাঘডাশের দল। একশ’ বছরেও কাটা হয়নি এই রেইন-ফরেস্টের গাছ-গাছালি। সুবিশাল এক-একটা গাছ মাথা উঠিয়েছে আকাশ পর্যন্ত। অবাধে চড়ে বেড়াচ্ছে গাছবানরের দল। ভাবনায় ছেদ পড়ে যায়। ইন্দ্রিয় সক্রিয় হয় আমার। সামনেই ভাঙ্গা ইট-সুরকির উপর শুয়ে আছে এক বিশাল লম্বা কালো সাপ !
হাতঘড়ির সময় জানিয়ে দিয়েছে গত ১০ ঘন্টা ধরে ভগ্নস্তুূপ এলাকার রাজবাড়িতেই রয়েছি। জৈন্তাপুরে আসার কথা মনে করতে চাইলাম। ঢাকা থেকে ট্রেনে করে সিলেটে এসেছি সপ্তাহখানেক আগে। উঠেছি বাসায়ই । গত ৩ বছর ধরে সিলেটে আছেন পরিবারের সবাই। বাবা বদলী হয়ে এসেছেন সিলেটে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চাকরি। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ করা কোয়ার্টারে উঠেছেন পরিবার পরিজন নিয়ে। আমি অবশ্য এসেছি পরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মাষ্টার্সের একটা ইনকোর্স পরীক্ষা ছিল। তাছাড়াও আমাদের যাওয়ার কথা ছিল ভারতের শিলংয়ে। ডিপার্টমেন্টের আয়োজনে । গত ৩ বছরে কয়েকবার সিলেটে এলেও ঈদের ছুটি কাটিয়ে আবার দৌঁড়েছি ঢাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ধরতে। রহস্য-রোমাঞ্চের সন্ধানে আমার ছুটে চলা কিন্তু থেমে থাকেনি। তবে জৈন্তাপুরের হারিয়ে যাওয়া রাজ্যপাট সম্বন্ধে জানতে দেরি হয়েছে একটু। সন্দেহ নেই রোমাঞ্চকর । তিনদিনের ছুটি পেয়ে তাই দেরি করিনি একদম। চলে এসেছি জৈন্তাপুর থানা এলাকায়। লোকবসতি নেই তেমন। ফাঁকা আর উঁচু-নিচু টিলা, পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা পুরো জৈন্তাপুর। বনভূমির ফাঁকে ছোটখাটো জলাভূমি আর হাওর চোখে পড়েছে। শহরের মানুষজন এদিকে আসতে উৎসাহ দেখায় না। সড়ক যোগাযোগের অবস্থা বেহাল একেবারে।
রেষ্ট হাউসে থাকতে আসিনি। এসেছিলাম রাত কাটাবার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে ভেবে। জনবসতিহীন এলাকার রাত কত ভয়াবহ আমার জানা আছে। ঢাকাদক্ষিণের প্রাচীন মন্দিরের পাহাড়ি টিলায় একবার বিপদে পড়েছিলাম। নামার পথ খুঁজতে গিয়ে গভীর রাত হয়ে গিয়েছিল । নিচে নামতে পেরেছিলাম অবশেষে, তবে আহত অবস্থায়। মনে হলে লোম খাড়া হয়ে যায়, কাঁটা দেয় শরীরে। সেসব পাহাড়ে রাতে ঘুরে বেড়ায় হিং¯্র জাতের শুয়োর আর অজগর সাপ। উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের জোরে হয়ত বেঁচে এসেছিলাম সে যাত্রা। এবারকার বিলুপ্ত সা¤্রাজ্যে এসেই পড়েছি ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার মুখে। সমস্যা এখানে অনেকগুলো । বাসায় জানাইনি জৈন্তাপুর অভিযানের ব্যাপারে। আমার পরিবারের কেউই আমার মতো এ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় না। জাগতিক রহস্য-রোমাঞ্চ ভাবায় না, ভারাক্রান্ত করে না তাদেরকে । অতীতে এ ধরনের অভিযান হাসাহাসির পাত্রে পরিণত করেছে আমাকে । পারিবারিক অঙ্গনে আমার রোমাঞ্চপ্রবণ মন তো আর কেউ বুঝতে চাইবে না।
লম্বায় ৪/৫ হাত কি তারও বেশি হতে পারে সাপটা। শুয়ে আছে সটান হয়ে। আমার ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে গেল। আরেকটু হলেই পা দিয়ে মাড়িয়ে দিতাম। পাহাড়ি সাপ সচরাচর বাইরে আসে কম। তবে জ্বালাতন সহ্য করতে পারে না। সম্ভবত ভাল খাওয়া-দাওয়া করেছে দিনে। এখন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। অভিজ্ঞতা থেকে জানি ওকে না ঘাঁটালে কিছুই করবে না। কারণ সাপেরও রয়েছে জানের ভয়। একবার শনির হাওরে ভয়াল মেছো সাপ দেখে ভয়ে উল্টোদিকে দেঁৗঁড়–তে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম সাপও আমাকে দেখে ভড়কে গিয়ে পালাচ্ছে বিপরীত দিকে। তবে বিষাক্ত জাত-সাপের ব্যাপার আলাদা। যে গাছের নিচে শুয়ে থাকে সে গাছের পাতা গায়ে পড়লেও ছোবল মারে। পরিস্থিতি ভয়াবহ কিন্তু আমি ভয় পেলামনা। সন্তর্পনে এড়িয়ে গেলাম সাপটাকে। ঢুকে পড়লাম ভগ্নস্তুূপের ভেতরে সরু এক বা দু’জন যেতে পারবে এমন একটা পথ দিয়ে। আমার ক্যামেরায় ফ্লাস লাইট টর্চের কাজও করে। তবে বেশিক্ষণ সেটা টিকবেনা, চার্জ ফুরিয়ে যাবে সেলের এবং পড়ে যাব বিপদে। ফ্লাসের পাওয়ারে টর্চ জ্বাললাম যথেষ্ট সাবধানে। শব্দ তোলে ছুটে পালাল ইঁদুর, চিকার দল। উপরের দিকে আলো ফেলে ছাদের দেখা পেলাম অনেক উঁচুতে। সামনের দিকটা কোন দিকে, বের করা মুশকিল। অল্পক্ষণেই বুঝে গেলাম এক অলঙ্ঘনীয় চক্রব্যুহে প্রবেশ করে ফেলেছি আমি।
অচেনা কোথাও গেলে দিক নির্ণয়ের জন্য কম্পাস কিনেছিলাম। পল্টনের এক ঘড়ির দোকান থেকে। প্যান্টের পকেট থেকে বের করে দেখে নিলাম। সামনে এগোবার দিক আন্দাজ করতে পারলাম কিছু। ঠিক তখনই মাথার চুলে সজোরে ঝাপ্টা মারল বাদুড়। আরেকটু হলে ক্যামেরা ছিটকে যেত পড়ে। সামলে নিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বুঝতে পারলাম ঠোকর দিয়েছে জোরেই। বড় সাইজের বাদুড় অন্ধকারে শত্রু চিনতে ভুল করেনি। আরেকটু সতর্ক করে দিলো আমাকে। ইন্দ্রিয়কে করে দিলো আরও টান-টান। পা বাড়ালাম সামনে। আমার ধারনা মূল রাজভবনের ভগ্ন কাঠামো ৩০ থেকে ৪০ হাজার বর্গফুট হবে আকারে। পেরিয়ে যেতে কতক্ষণ লাগবে অনুমানে বলা সম্ভব না। তবে চলতে পারলে পেরুনো যাবে। যেহেতু দিক নির্দেশনা কিছুটা হলেও পেয়ে গেছি আগে।
কাদার গর্তে পা পড়ল হঠাৎ।
দেবে গেল ডান পা ফুট খানেক । পায়ে শক্ত সোলের জুতো পরি সবসময়। বাম পায়ে ভর রেখে তুলে নিলাম কাদায় দেবে যাওয়া পা। কলেজে স্কাউটিংয়ে শেখা কসরতগুলো মাঝে মধ্যে এভাবেই কাজে দেয় আমার। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে সামনে বাড়লাম আবার। দেখেই ছাড়তে হবে অভিশপ্ত রাজ্যপাট। একই সঙ্গে কিছু অজানা তথ্য মনে করার চেষ্টাও চালালাম পুনরায়।
অন্ধকার চিরে মাটি ফুঁড়ে দাঁড়ানো বিশাল ছায়াকৃতির অবয়ব দেখে চমকে উঠতেও ভুলে গেলাম। ব্যপারটা ঘটে গেল কিছু বুঝে ওঠার আগেই। ছায়াময় এক দেহাবয়ব ছুটে গেল একপাশে । তার নড়াচড়ার শব্দে কেঁপে উঠল পুরাকীর্তি ভবনের পুরো রাজ্যপাট। মনে হল ভূ-কম্পনই হয়ে গেল রিখটার স্কেলে ৫-৬ মাত্রার। মাথার উপরে ভগ্ন ছাদের কাঁপা-কাঁপি টের পেলাম। একই সঙ্গে পায়ের নিচের মাটিও। ছায়াদানবের চাক্ষুষ মূর্তির ছুটে যাওয়ার সময় তাক লেগে যাওয়ায় ব্যর্থ হলাম ক্যামেরা শুট করতে। তবে মনস্থির করে নিতে দেরি হল না। ধাক্কাটাকে করে নিলাম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। পা বাড়ালাম সামনে, মনেহল ঠিক পথে এগোচ্ছি। রোমাঞ্চ ভাবনা হাতছানি দিয়ে ডাকল নতুন করে। ভয়ার্ত হলাম না বরং বহুগুনে বেড়ে যাওয়া কৌতুহলের সঙ্গে যোগ করে নিলাম অদম্য সাহস।
জলের শব্দ শুনতে পেলাম। ধারনা সঠিক। প্রচুর জলধারা থাকার কথা শুনেছি এদিকে । পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনাও রয়েছে। জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে বেরিয়ে বড় হাওর হয়ে হাকালুকি পর্যন্ত নেমে গেছে জল-প্রণালী। হাটু পর্যন্ত লেগে গেল জলের ছোঁয়া। দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। জল নেমে যাওয়ার আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যে। এমন সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো চোখ ধাঁধিয়ে দিল দূরে গজিয়ে উঠা বিশাল লম্বা ছায়াদেহ মূর্তি। প্রাণপনে ক্লিক করলাম ক্যামেরায়।
হাতঘড়ি দেখে হতবম্ভ হতে হল। রাত ১২ টা কিভাবে সম্ভব ? ভাবতে গিয়ে অবশ হয়ে গেল চিন্তাভাবনা। তাহলে কয় ঘন্টা ধরে আছি এই ধ্বংসাবশেষের ভেতর ? মনেহচ্ছে অনন্তকাল ঘুরপাক খাচ্ছি হারিয়ে যাওয়া সা¤্রাজ্যের অ-দেখা জগতে। আমার গা শিউরে উঠতে শুরু করল। রাজ্যভবন পেরিয়ে এলাম কি-না বুঝতে পারছি না। এখন আবার উপদ্রপ শুরু হয়েছে মশার কামড়ের। হাত, পা নাড়াতে হচ্ছে ক্রমাগত। স্থির হলেই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দলে-দলে মশা। ঘাড়ে চাপড় মেরে হাতটা টর্চের আলোয় তোলে ধরতেই আঁতকে ওঠার অবস্থা। রক্তে লাল। তার মানে বেশিক্ষণ থাকা লাগবে না। রক্ত খেয়ে সব সাফ করে দেবে মশার পাল। যে সে আকার নাকি, এক-একটা যেন ঘাসফড়িং !
পা টেনে লম্বা করে চললাম সামনে।
অভিশাপে ভরা এই ধ্বংসরাজ্যে আমার অভিযাত্রা আসলে ঐতিহাসিক। মনেহয় না এর আগে কারো এমন মরণপণ ইচ্ছে জেগেছে এমন অভিযাত্রায়। নিজের ছায়াকে খুঁজে পাচ্ছি না এখন আর। এভাবে বেশি সময় চলা সম্ভব হবে না আমি নিশ্চিত। উপরে তাকিয়ে কোনোভাবে আকাশের দেখাটুকু পাওয়া যায় নাকি ভাবছি। এমন সময় কানে এলো ভয়ানক আর্তচিৎকার। ভগ্ন ইট-সুরকির দেয়ালে প্রতিধ্বনি উঠল সেই করুণ প্রাণঘাতি চিৎকারের।
নরমুন্ডুহীন একটা শরীর ঠিক তখনই চোখে পড়ল আমার।
ধড় আলাদা করা জীবন্ত শরীর ছুটে আসছে এদিকে। এবার কেঁপে উঠল অন্তরাত্মা । একে তো অন্ধকারের আলোয় আবছা, তার ওপর তীব্র আর্তনাদের রেশ শেষ হয়ে যায়নি। এই অবস্থায় কি করব ঠিক করার আগে বিশাল খিলান আর ধ্বংসে পড়া ইট সুরকির দেয়াল ভেদ করে চলে আসে মুন্ডুহীনটা । কোথা থেকে ডেকে ওঠে একটা তক্ষক তীক্ষ্ম স্বরে । ভূ-কম্পন আবারও অনুভব করতে থাকলাম পায়ের নিচে। কাঁপা হাতে ক্যামেরা তাক করে ছবি তোলার ফাঁকে-ফাঁকে দৌঁড়ুতে শুরু করলাম দিকবিদিক। কোনদিকে ছুটছি আমি জানি না। মুন্ডুহীন ধড়টাও লক্ষ্য করলাম ছুটে চলেছে। উর্ধশ্বাসে একটানা দৌঁড়ুতে গিয়ে হাঁপ ধরে গেল আমার। আর্তনাদের শব্দ কানে এল আবারও। বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে একেবারেই। আমি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি এরই মাঝে। অনুভূতি লোপ পেয়ে গেছে আমার। এবার ফ্লাশ লাইট জ্বেলে সামনে বাড়িয়ে দিয়ে অবাক হয়ে নিজেকে আবিস্কার করলাম প্রাচীন এক বধ্যভূমিতে। গভীর কূপ, একটা বেদী আর ফাঁসির মঞ্চ পেতে রাখা হয়েছে। কূপের পাশের বেদীতে কি হত ? বেদীর পাশেই ধারাল তলোয়ার আর খঞ্জরের সারি দেখে হাত পা জমে ঠান্ডা হয়ে এল আমার।
মনে পড়ল রেষ্ট হাউসের সেই ম্যানেজারের হুসিয়ারী। রাজবাড়ির বেদীতে নরবলি দেওয়া হতো প্রায়ই, আনুষ্ঠানিকভাবে। কোপ দিয়ে মাথা আলাদা করে ফেলে দেয়া হতো কূপের ভেতরেই। আর সহ্য হলো না আমার। সর্বশক্তিতে ছুটে চললাম সামনে। হোঁচট খেয়ে দৌঁড়ে যেতেই পা হড়কালাম। হুমড়ি খেয়ে তাল সামলে দ্বিতীয় চেষ্টায় শরীর সোজা রেখে হান্ড্রেড মিটার হার্ডলস দৌঁড় দিলাম। ভেজা পিচ্ছিল মাটিতে আছাড় খাওয়ার আগেই দেখতে পেলাম জৈন্তা রেষ্ট হাউসের উঁচু সিঁড়িঘর, মিটমিট করে জ্বলতে থাকা আলোর বাতি।
ম্যানেজার আমাকে দেখতে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল কাজে। টেবিল ভর্তি কাগজপত্র, খাতা আর বাঁধানো মলাটের কতগুলো বই ছুড়ে ফেলতে লাগল মেঝের উপরে। মেঝের নিচের দিক মনেহল ফাঁকাই আর বই খাতা-পত্রের ওজন শোনা গেল ভারী। মেঝেতে পড়ে আওয়াজ করল অদ্ভুত ধরনের। কাঁচের একটা জগ সরাতে গিয়ে ফেলে দিল নিচে। অবাক হয়ে দেখলাম ভাঙ্গল না জগ। আমি বললাম, ‘ম্যানেজার সাহেব আমি এসেছি।’
‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’
ব্যাস্ততা কমল না। কিংবা কমাতে চাইল না ম্যানেজার। বিরক্তি অথবা অবহেলার কারণ বুঝতে পারলাম না তার।
‘আমার ব্যাগ ছিল একটা। দিয়ে গেছিলাম আপনার কাছে।’
‘তাই নাকি । কবে ?’
‘আপনি কি ভুলে গেলেন গতকালকের কথা ?’
‘গতকাল ?’ অবাক হল যেন সে,‘ গতকাল কি দিয়ে খেয়েছি, আজকে কি সেটা স্মরণ করার বিষয়?’
‘না, গবেষণার বিষয়।’ রাগ লাগে আমার। লোকটা কি জৈন্তারাজ নাকি? গালি দিতে ইচ্ছে হয়। অসভ্যতা হয়ে যায় তাই দেই না। ঠিক করি পরে দেব। প্রয়োজনে লাথিও দিতে পারব ওর পেছন দিকে ঠিকই।
‘ভাইজান আপনি কোথা থেকে এসেছিলেন? অনেকটা সময় পরে জানতে চায় সে,‘ গিয়েছিলেন কোথায়? রাজবাড়ি দেখতে?’
‘না ভাইজান, বিয়ে খেতে।’ ভেংচি কেটে দিলাম ব্যাটাকে। পরিবর্তন দেখলাম না তাতে।
‘আরে ক্যামেরা আছে দেখছি! তা কিছু ছবি-টবি কি তুলেছেন ক্যামেরা দিয়ে? দেখিতো ভাইজান, দেন ক্যামেরাটা।’
‘আগে ব্যাগ ফেরত দেন।’
‘দেবো তো ভাইজান। ক্যামেরা দেখি। ছবি তুলতে পেরেছেন?’
‘কিসের ছবি তুলতে পেরেছি?’
‘দেহাতীতের ছবি, জৈন্তারাজের ছবি...’ বকতে লাগল লোকটা।
‘হ্যাঁ, তুলেছি ছবি।’
উত্তর শোনে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলনা। ক্যামেরা ছিনিয়ে নিল আমার কাছ থেকে। আটকাতে পারলাম না। দ্রুত দক্ষহাতে ক্যামেরা চালু করে রিভিউ দেখতে শুরু করল সে আমার তোলা ছবির।
‘কই, নাই তো কিছুই’, জানাল সে,‘ কতগুলো ভাঙ্গাচোরা ধ্বংসস্তুুপের ছবি আর মেগালিথিক পাথর...
ক্যামেরা ফিরিয়ে দিল সে। আশ্বস্ত দেখাল তাকে। আমি কথা না বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ক্যামেরা হাতে। দেরাজ খুলে আমার হ্যাভারসেক ব্যাগ বের করে দিল সে,‘আমার নাম মনে আছে ভাইজানের ? জানতে চাইল লোকটা। চোখের দৃষ্টি তীব্র হয়ে উঠেছে ওর।
ক্যামেরার ছবিগুলো দেখতে লেগে গেছি ইতোমধ্যে। এক এক করে প্রতিটা। একবার স্লাইড শো দিলাম। জুম করে ফুল-¯্র‹ীন ইমেজে দেখে চললাম রাজবাড়ির বিধ্বস্ত ভবনের সেই সময়টুকুর ছবি। যখন ঘুরপাক খাচ্ছিলাম পুরাকীর্তির ভেতরে। আর বারবার ম্যানেজারের নামটা মনে করার চেষ্টা করেছি অথচ মনে আসেনি একবারও।
‘আমার নাম কালি সিংহ। জৈন্তারাজ ইন্দ্র সিংহের বংশের লোক। এবার মনে পড়েছে ভাইজান... ?’
হতবাক হয়ে দেখলাম আমার তোলা ছবিগুলোর একটাতেও দেহাতীত কোনোকিছু নেই। নেই অশরীরী মূর্তির ছায়া, না কোনো নরমুন্ডুহীন দেহ! অপার্থিব কিছুই নেই ছবিতে, যেন ছিলই না কোনোকালে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT