সাহিত্য

চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৫-২০১৮ ইং ০২:১৫:৫২ | সংবাদটি ১৭ বার পঠিত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশি বছরের জীবনকে যদি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়, তবে শেষভাগ অর্থাৎ শেষ ষোল বছরের ফসল হল তার আঁকা ছবি। পকেট বুকে আঁকতে আঁকতে কবিতার খসড়ায় আঁকি-বুকি করতে করতে চিত্রকলা তার ‘শেষ বয়সের প্রিয়া’ হয়ে যায়।
শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু তার ‘গুরুদেবের চিত্রকলা’ প্রবন্ধে বলেছেন ক্রমশ দেখলেন এ কাটাকাটি গুলির মধ্যে ছন্দের বেশ এক একটা আদল ফুটে উঠেছে ওদের এখানে ওখানে একটু আধটু কলমের আঁচড় দিলেই সেগুলি আকার নিচ্ছে, ফুল-পাখি কিংবা জন্তুর রূপ ধরছে। এইভাবে ছবি আঁকার তাগিদ এল মনের মধ্যে এবং ধীরে ধীরে তা রূপ নিল রীতিমত চিত্রশিল্পায়নে।’
১৯৩৪-এর ২৩ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছেন অমিয় চক্রবর্তীকে ‘আজকাল একেবারে অরুচি ধরেছে লেখায়। মনটা এখন স্বভাবত ছুটে ছবির দিকে। জীবন আরম্ভ করেছিলাম লীলা দিয়ে-পড়া এড়িয়ে লিখছি কবিতা। মধ্যবয়সে সেই অকর্মণ্যতা পূরণ করেছি লিখে লিখে সে সব লেখা বোঝা টানার লেখনির মত। তখন সেটাতে প্রবৃত্তি ছিল। এখন আমার কলাচর্চার শখটা ছুটছে ছবির দিকে।’
জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ৬নং ঘরে নিমন্ত্রিত হতেন একজন আঁকিয়ে। রবীন্দ্রনাথ যাকে ছবি আঁকার মাস্টার বলেছেন, তিনি মূলত তাদের ইট কিংবা বাড়ি আঁকতে শিখাতেন। তাতে কবির শিল্পীমনের বিকাশ না হয়ে জ্যামিতির চর্চা হত। জীবন স্মৃতিতে বলেছেন,মনে পড়ে, দুপুর বেলায় জাজিম-বিছানো কোণের ঘরে একটি ছবি আঁকার খাতা লইয়া ছবি আঁকিতেছি। সে যে চিত্রকলার কঠোর সাধনা, তাহা নহে সে কেবল ছবি আঁকার ইচ্ছেটাকে লইয়া আপন মনে খেলা করা। ছবি আঁকাটা ও তার মনে শরতের মত অকারণ পুলকে ছুটির হাওয়া এনে দিত।
ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে পড়া শোনার বদলে বিদেশের শিল্পকে আকন্ঠ পান করে কলকাতায় ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথ। ব্রিটিশ সুরকে কত সহজে আমাদের রাগ-রাগিনীর ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায়, তা দেখিয়েছেন বাল্মিকী প্রতিভায়। তার বড় দাদারা এত গুণী, তাদের পাশে কবি যেন ফ্যাকাসে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ দেখলেন, তার এই ছেলেটি বয়েই যাচ্ছে। ঠাকুর বাড়ির উজ্জ্বলতম নক্ষত্রকে দেবেন্দ্রনাথও চিনতে পারেননি। তাকে পাঠিয়ে দিলেন পদ্মার তীরে শিলাইদহে জমিদারী দেখা শোনার কাজে। সেখানেও রবীন্দ্রনাথ তার পিতা-মাতামহের মত অহঙ্কারী দুর্দান্ত প্রতাপশালী জমিদার নন। বরং প্রজাদরদী প্রজা বান্ধব হিসেবেই বেশি পরিচিত। জমিদার হয়েও তিনি তার কবিতায় বলতে পারেন- এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি/ রাজার হস্ত করে সমস্ত- কাঙালের ধন চুরি।
প্রথম যখন রবীন্দ্রনাথ কলকাতা ছেড়ে শিলাইদহে গেলেন, শেয়াল ডাকা অন্ধকার, বাঁশ পচা গন্ধ মাখা গ্রামে মনটা ধাক্কা খেয়েছিল। পোস্ট মাস্টার ইত্যাদি গল্পে তার ছবি পাওয়া যায়। দিনে দিনে তিনি বুঝলেন,. জোড়াসাঁকোর বৈভব থাকলেও না পেয়েছেন প্রকৃতি, না পেয়েছেন সাধারণ মানুষের সাহচর্য। ছোটবেলার আড়াল-আবডাল থেকে তিনি প্রকৃতিকে দেখেছেন। ঘরেই গন্ডী কেটে তাকে বন্দী করে রাখা হত। শিলাইদহে প্রকৃতি তাকে অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে। ১৯০০ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর জগদীশচন্দ্র বসুকে কবি লিখেছেন, শুনে আশ্চর্য হবেন একখানা স্কেচবুক নিয়ে বসে ছবি আঁকছি। কুৎসিত ছেলের প্রতি মার যেমন অপূর্ব ¯েœহ জন্মে, তেমনি যে বিদ্যেটা ভালো আসে না, সেইটের উপর অন্তরের একটা টান থাকে। সেই কারণে যখন প্রতিজ্ঞা এবারে ষোল আনা কুঁড়োমিতে মন দেব, তখন ভেবে ভেবে ওই ছবি আঁকাটা আবিষ্কার করা গেছে। এ সম্বন্ধে উন্নতিলাভ করবার একটা মস্ত বাধা হয়েছে এই যে, যত পেনসিল চালাচ্ছি, তার চেয়ে ঢের বেশি রাবার চালাতে হচ্ছে।
মানুষের ভাষার সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু প্রকৃতির ভাষা উদার। প্রকৃতির কথা বলতে গেলে মানব ভাষায় কুলোবে না। অন্য ভাষা চাই। এই ভাষার সন্ধানে হাত বাড়ালেন রবীন্দ্রনাথ রেখার ভাষায়, রঙের ভাষায়। শিলাইদহে এসে প্রকৃতিকে পেয়ে পাগলের মত ছবি আঁকতে শুরু করলেন তিনি। এর আগে ছিল লেখার কঠোর শিল্প, আঁকিবুকির শিল্প। এই সময় তার লেখায় ফুটে উঠল প্রকৃতির ছবি, জলের ছবি, পাতার ছবি। শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার রবিকার ছবি প্রবন্ধে বলেছেন, ভেবে দেখো, এত রং, এত রেখা, এত ভাব সঞ্চিত ছিল অন্তরের গুহায় যা সাহিত্যে কুলোলো না-শেষে ছবিতে ফুটে বের হলো। নর-নারীর মুখ তার বহু ছবির বিষয়বস্তু। দুঃখ, ক্লান্ত, শ্রান্ত, মালঞ্চ যোগাযোগের মেয়েদের মুখ তার ছবিতে বারবার এসেছে। কবির তিন কন্যা বেলা-রেনুকা-মীরা প্রত্যেকেই তাদের জীবনে দুঃখী। বিধাতা তার দুঃখের ভাঁড় উজাড় করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ওপর। আত্মপ্রকৃতি এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ। নিজের বিভিন্ন বয়সের ছবিতে তার ব্যক্তিত্ব মানসিকতার ভাবটা তার ছবিতে ফুটে উঠেছে। শিল্পী যামিনী রায় বলেছেন- রবীন্দ্রনাথের আঁকা মানুষ যখন দেখি, তখন মনে হয় না সেটা নেতিয়ে পড়বে। মনে হয় না হাওয়ায় দুলছে যেন। স্পষ্ট দেখি, মানুষটার ওজন আছে, সতেজ শিরদাঁড়া আছে। আমার মতে, গত দুশ বছর ধরে রাজপুত্র আমল থেকে আজ পর্যন্ত, আমাদের দেশের যে অভাব বেড়ে চলেছিল, রবীন্দ্রনাথ সেই অভাবের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করতে চান, ছবির জন্য খোঁজেন সতেজ শিরদাঁড়া। রবীন্দ্রনাথের ছবিকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন ১. নর-নারীর মুখের ছবি, ২. জীবজন্তুর প্রতিকৃতি, ৩. প্রকৃতির পটভূমিকায় মানুষের রূপকচিত্র, ৪. অলঙ্কারিক চিত্র, ৫. প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। তার আঁকা নর-নারীর মুখের ছবিতে যেমন বিশিষ্ট মনের আকৃতি, তেমনি প্রতিকৃতিতে পাওয়া যায় তাদের স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। তার চিত্রকলায় অপরূপকে সন্ধানের কোন আকুলতা নেই। আছে শুধু রূপকে অপরূপ করার সাধনা। তার ছবিতে যে রহস্য, তা অরূপের রহস্য নয়, অপরূপের রহস্য। তার কাব্যের এবং চিত্রকলার পার্থক্য এইখানে। কবি নিজেই জানিয়েছেন- কবিতার রবীন্দ্রনাথ আর ছবির রবীন্দ্রনাথ এক নয়।
ইংল্যান্ডের ডার্টিংটস হলে আছে রবীন্দ্রনাথের আঁকা কুড়িটি চিত্র। এগুলো তিনি এলমহার্স্ট দম্পতিকে উপহার দিয়েছিলেন। তারা তাদের প্রতিষ্ঠান ডার্টিংটন হলে সেগুলো রেখেছিলেন। এর থেকে একটি ছবি তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উপহার দেন। ১৯৩০ সালে বার্লিনে তার চিত্র প্রদর্শনীর সময় সে দেশের সরকারকে পাঁচটি ছবি দান করেন। বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় সেই ছবিগুলি বার্লিনের পিচরাস্তায় ফেলে হিটলার পুড়িয়ে ফেলেন।
ভারতীয় শিল্পকলাকে নতুনভাবে বিকশিত করে নতুন যুগের উপযোগী করে তোলার প্রয়াসী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই দেখা যায়, আর্থিক ও সামাজিক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তিনি বিশ্বভারতীতে শিল্পকলা শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন। এর ফলে তার জীবৎকালেই এ প্রতিষ্ঠান থেকে চিত্রশিল্পের একটি ধারা প্রবাহিত হয়ে সমগ্র দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। চিত্র শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের স্থান বিশেষ মর্যাদায় ভাস্বর।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT