সম্পাদকীয় বিদ্যা সমাজের অলংকার স্বরূপ এবং শত্রুর সম্মুখীন হওয়ার জন্য অমোঘ কবচ। আল-হাদিস

বাড়ছে শিশু আত্মহত্যা

প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:১৫:২৯ | সংবাদটি ৫৫ বার পঠিত

বাড়ছে শিশু আত্মহত্যার প্রবণতা। এই শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি জাতীয় দৈনিকে। এতে বলা হয়, দেশে শিশু আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রতি বছর বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে, গত সপ্তাহে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ১৩টি শিশু আত্মহত্যা করেছে। আর অর্ধশতাধিক শিশু আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। এরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলেছে, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নয়শ’ ৭০ শিশু আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে চলতি বছর প্রথম চার মাসেই আত্মহত্যা করেছে একশ’দশ শিশু। বছর ভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ দু’শ ১৩ শিশু আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার শিকার শিশুদের ৬৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। বিশেষজ্ঞগণ এই প্রবণতারোধে অভিভাবকের সচেতনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
শুধু শিশু নয়, প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যেও এই প্রবণতা বাড়ছে। আর তা শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই এই প্রবণতা বেড়ে চলেছে। রীতিমতো ‘মহামারী’ আকারে রূপ নিয়েছে এই প্রবণতা। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যা করে প্রায় দশ লাখ মানুষ। যুদ্ধ ও খুনের শিকার হয়েও প্রতি বছর এতো মানুষের মৃত্যু হয় না। তাছাড়া, প্রতি বছর আত্মহত্যা প্রবণ ও আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় এর চেয়ে ১৫/২০ গুণ বেশি মানুষ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দশ থেকে ১৪ শতাংশ মানুষ আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে ঐকান্তিকভাবে। আর পাঁচ শতাংশ কখনও না কখনও আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তবে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার প্রবণতার প্রকৃত হার উল্লিখিত পরিসংখ্যান থেকে অনেক বেশিও হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। কারণ, কুসংস্কার, ধর্মীয় বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার খবর চেপে যায় পরিবার। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর খবরটি বেরিয়ে এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে। তাদের মতে ২০২০ সাল নাগাদ প্রতি বছর বিশ্বে সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবে।
নানা কারণে আত্মহননের পথ বেছে নেয় মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে হতাশা, বিষণœতা, নেশাযুক্ত হওয়া, সিজোফ্রেনিয়া সহ বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া, গুরুতর আর্থিক সমস্যা, নিঃসঙ্গতা, বার্ধক্য, প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, দাম্পত্য কলহ, যৌতুক, ইভটিজিং ইত্যাদি। তবে আত্মহত্যার জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মানসিক রোগই হচ্ছে বিষণœতা, এমনি মন্তব্য করেছেন অনেকে। বিষণœতায় আক্রান্ত ১৫ শতাংশই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। জটিল মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যার হার দশ শতাংশ। মাদক বহনকারীদের মধ্যে দশ থেকে ২০ শতাংশই আত্মহত্যা করে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, যারা আত্মহত্যা করে তারা হয়তো আপাতদৃষ্টে জীবন যন্ত্রণা থেকে বেঁচে যাচ্ছে, তার আত্মহত্যার পরে পরিবার এবং সমাজে এর সুদূর প্রসারী বিরূপ মানসিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া থেকে যায়। এই ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি। এটা নিশ্চিত হলে কমে আসবে আত্মহত্যার প্রবণতা। সর্বোপরি, সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সব ধরনের প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করার মানসিক শক্তি থাকা উচিত সকলের মধ্যে।
আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন অভিভাবক, সচেতন মহল, বিশেষজ্ঞগণ। বিশেষ করে, শিশু-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা যে হারে বাড়ছে, তা খুবই দুঃখজনক। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য হচ্ছে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের উচ্চাকাক্সক্ষা শিশু-কিশোরদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। যেকোনো ধরনের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে শিশুরা খুব সহজেই সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। শিশুদের আত্মহত্যার কারণগুলো হচ্ছে প্রধানত অভিমান, পারিবারিক কলহ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, কাঙ্খিত ফলাফল না পাওয়া, বাল্যবিবাহ, যৌতুক এবং পারিবারিক নির্যাতন-নিপীড়ন ইত্যাদি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন ও শিক্ষকদের সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সন্তানদের প্রতি। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য চাপ না দেওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের মধ্যে সবধরনের ফলাফল মেনে নেয়ার মানসিকতা গড়ে তোলার দায়িত্ব অভিভাবকের, বন্ধু-বান্ধবদের আত্মীয়-স্বজনের। মূল কথা, আত্মহত্যা প্রতিরোধের কাজটি শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। এই ব্যাপারে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT