উপ সম্পাদকীয়

শুধুই নিরাশা নয় আশার আলোও জ্বলছে

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫৪:৫৭ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত

এক ঃ সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যা-ই হোক না কেন, অনেক ভুক্তভোগী বাংলাদেশী রোগীর মতো আমাকেও চিকিৎসার জন্য বার বার দক্ষিণ ভারতের ভেলুরে যেতে হচ্ছে। সেখানকার CMCH তে প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশী চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্বচক্ষে না দেখলে কারো পক্ষে এ দৃশ্যটি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া খুবই কঠিন। বাংলাদেশী সাংবাদিক ভাইয়েরা সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করলে এর কোন সমাধান করা যায় কিনা চিন্তা করে দেখতে পারতেন। বাংলাদেশের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞগণ। তা-না হলে বাংলাদেশের এই রোগীদের ¯্রােত কিছুতেই রোধ করা সম্ভব হবে না। আর এ সংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও রোধ করা যাবে না। এক্ষেত্রে অনেকে রোগীদের ওপর দোষ চাপাতেও দ্বিধাবোধ করেন না। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেউ কি সখ করে বিদেশের মাটিতে পা বাড়ায়। যে সেবা CMCH এ মানুষ পায় সেটা যদি আমার দেশে পেতো তাহলে মানুষ এতো কষ্ট সহ্য করে কেন দেশ ছেড়ে ভিন দেশে ভিন ভাষাভাষিদের শরণাপন্ন হতে যাবে। মানুষ বিদেশমুখী হবার কারণটা জানতে বোধ হয় কোন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হবে না। আন্তরিকভাবে সৎ চিন্তা নিয়ে খোঁজ নিলেই সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে ১০.০৫.২০১৮ তারিখের দৈনিক জনকণ্ঠের একটি খবরের শিরোনাম চরম লজ্জার উদ্রেক না করে পারে না। শিরোনামটি হলো-‘ঢাকা মেডিকেলের ওটিতে দুই ডাক্তারের হাতাহাতি’। স্টাফ রিপোর্টার লিখেন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রোগী নেয়া মানেই সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা। এখানে চিকিৎসকের বিন্দুমাত্র ভুলত্রুটি গাফিলতি ও অমনোযোগে সর্বনাশ ঘটে যেতে পারে রোগীর। প্রতিটি ডাক্তার ও নার্সকে এ ছবক দেওয়া হয় ইন্টার্নির সময়ই। কিন্তু এমন গুরুদায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে দুই ডাক্তারের মধ্যে ঘটে গেছে হাতাহাতি ও বাকবিতন্ডা। তাদের এমন অস্বাভাবিক ও উন্মত্ত আচরণ দেখে টেবিলে শুয়ে থাকা রোগী চরম ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। এমন অবিশ্বাসী কান্ড ঘটেছে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে। রোগীকে অচেতন করা নিয়ে তাদের মাঝে প্রথমে বাকবিতন্ডা পরে হাতাহাতি। এমন কি দু’জন চিকিৎসক ঘুষাঘুষিতেই উদ্যত হয়। এ প্রসঙ্গে ঢামেক অধ্যক্ষ স্বীকার করেন যে ওটিতে ডাঃ শওকত ও ডাঃ ইব্রাহিমের মধ্যে এক পর্যায়ে নাকি মৃদু হাতাহাতি হয়। তবে সত্য বলে স্বীকার করতে হবে যে ভূমিকম্প মৃদু হলেও কিন্তু মাটির পৃথিবীকে নাড়িয়ে দেয়। অধ্যক্ষ মহোদয় আরো বলেন, এক মিনিটের জন্যও হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা বন্ধ করা যাবে না। কারণ জাতীয় সত্তার পরিচয় হচ্ছে ঢাকা মডেকেল কলেজ হাসপাতাল। দেশবাসীও এতে দ্বিমত পোষণ করেন না অবশ্যই। কিন্তু ঢাকা মেডিকেলের ওটিতে শুয়ে থাকা খাদ্যনালীতে সমস্যাগ্রস্ত সেই নারী যখন দুই ডাক্তার মহোদয়ের বাকবিতন্ডা-হাতাহাতি-মারামারি-ঘুষাঘুষির দর্শন করেন তখন সেই নারীর মনে যে ভয়ভীতির সঞ্চার হয়েছিল তা কি কল্পনাও করা যায়? আতঙ্কিত রোগী যে অপারেশন থিয়েটার থেকে পালিয়ে যায়নি সেটাইতো বড় কথা। একটিবার কি ভেবে দেখা যায়-ঐ রোগী ঢাকা মেডিকেলের জাতীয় সত্তাকে কি ধরনের সত্তা মনে করবেন? এরপর যদি ঐ রোগী নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু থাকে? আর সমস্যার সমাধান তো হলো; কিন্তু ওটিতে মিনি যুদ্ধেরত ডাক্তার মহোদয়ের কি কোন বিচার হবে না? ঢামেকের জাতীয় সত্তায় যারা কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে দিল তারা কি এমনিভাবেই পার পেয়ে যাবেন? এমনটি হলেও দুঃখজনক হলেও এমন ঘটনা ঘটেই চলবে। মনে রাখতে হবে বিচারহীনতাই অপরাধের জন্ম দেয়।
দুই ঃ ভেলুরে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গত ৩০.০৪.২০১৮ তারিখে আমরা তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করি। সেখান থেকে পাহাড়ী কন্যা শিলং হয়ে আসামের গৌহাটি। সেখান থেকে বিমানে চেন্নাই। তারপর আবারো দু’তিন ঘন্টার সড়কপথে ভ্রমণ! আসাম রাজ্য দু’ভাগে ভাগ হয়ে এক অংশ মেঘালয়। রাজধানী যার শিলং। আসামের রাজধানী গৌহাটি। তামাবিল থেকে প্রথমেই ভারতের ডাউকি বাজার। পাহাড়ের ওপর দিয়ে আঁকাবাকা রাস্তা। দু’ধারে মায়াবী বনের দৃশ্য। পাহাড়ের বুকে ভাসমান মেঘের মেলা। ছোটবেলা পড়েছি বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্প ভারতের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসে মেঘ থেকে বৃষ্টির জন্ম। সে দৃশ্য বাস্তবে দেখা গেলো। ধাক্কা খাওয়া মেঘমালা আমাদের গাড়ীর ওপর দিয়ে আঘাত করে পাহাড়ের বুকে। সবুজ পাহাড় ঢেকে দেয় ঘনকালো মেঘের টুকরোগুলো। বাম দিকের রাস্তায় একটু এগিয়ে গেলেই প্রাকৃতিক দৃশ্যের লীলাভূমি চেরাপুঞ্জি। শিলং যেতে রাস্তার দু’পাশে যে দৃশ্য ১৯৭১-এ দেখেছি সে যেন আজ কোথায় হারিয়ে গেছে। রাস্তার দু’পাশে সবুজ পাহাড়ে সে এক নতুন কান্নার সুর। যন্ত্রদানব পাহাড় কাটার মেশিনগুলোর বিকট শব্দে দারুন হাহাকার। বনভূমি-গাছপালা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। সবুজে ঢাকা পাহাড়ে পাথরগুলো বের হয়ে আসছে। সবুজের বুকে ধুধু মরুভূমির দেখা মেলে মাঝে মাঝে। দেখে শুনে মনে হয় পাহাড় কাটা ধ্বংসের উৎসব শুধুই বাংলাদেশেই চলছে তা নয়; বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা’ এর স্মৃতি জড়িত শিলং ও মোটেই পিছিয়ে নেই। মেঘালয় কবে জানি ধুলির আলয়ে পরিণত হবে সেটাই ভাবনার বিষয়।
তিন ঃ তারপর গৌহাটি। যাওয়ার পথে আসার পথে দিন কয়েক অবস্থান করতে হয়। শহরটি ছিমছাম। ভাল লাগে। শিলং-গৌহাটি সিলেটী ভাষাই সবই বুঝেন। শিলং তো খাসিয়া ভাষা। বাঙালি যারা সবাই সিলেটী ভাষায় কথা বলেন। গৌহাটিতে অসমীয়া ভাষাই প্রধান। বাঙালির মুখে সিলেটী। হিন্দী ভাষার দাপট খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু গৌহাটিতে যে দুটি আত্মীয় বাসায় অবস্থান করছিলাম সেখানে দেখা গেলো একটা আতঙ্কে তারা প্রতিনিয়ত ভুগছেন। সে আতঙ্কের নাম NRC আতঙ্ক। NRC এর পুরো অর্থ জানি না তবে মনে হয় সেটার অর্থ Nationae Regestration Certificate অর্থাৎ মোদ্দাকথা হলো নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়টি। আর সেটা বাঙালি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে। যে দু’টি পরিবারের সাথে আমাদের আত্মীয়তার বন্ধন তারা পাকিস্তান আমল থেকে ভারতের শিলং, গৌহাটিতে বসবাস করে আসছেন। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ আমলেই তার পূর্ব পুরুষেরা আসাম সরকারের সরকারি দপ্তরে চাকুরি করছিলেন। তারপরও তাদের নাগরিকত্ব যাচাই বাছাই এর নামে তাদের নোটিশ দেয়া হচ্ছে। আকারে ইঙ্গিতে বা সরাসরিভাবে বুঝানো হচ্ছে তারা নাকি বাংলাদেশের নাগরিক এবং যথাযথ প্রমাণ না থাকলে তাদেরকে নাকি বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে।
এছাড়া বাঙালিদের নিয়ে আরো একটা মারাত্মক ষড়যন্ত্রের খেলা চলছে। বাঙালিদের মধ্যে বিভেদের বীজ রোপন করতে গিয়ে সেখানে ‘হিন্দু বাঙালি’, ‘মুসলিম বাঙালি’ বলে নতুন বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বাঙালিতো বাঙালিই। এখানে ‘হিন্দু বাঙালি’, ‘মুসলিম বাঙালি’ বলে তো কিছু থাকার কথা নয়। বাংলা ভাষাভাষিরাই তো বাঙালি। ভারতের পার্শ্ববর্তী রাজ্য অসমে NRC এর নামে যে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাদেশকে এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। এটাকে হালকাভাবে দেখার কোনই অবকাশ নেই। বাংলাদেশের পাশের রাজ্য মেঘালয়, ত্রিপুরা বা পশ্চিমবঙ্গে NRC আতঙ্কে তো কেউ আতঙ্কিত নন! তাহলে অসমে এমন আতঙ্ক সৃষ্টির পেছনে অন্যকোন গভীর ষড়যন্ত্র নেইতো? ১১ লাখ রোহিঙ্গাদের চাপে জর্জরিত বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের কারণে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে কক্সবাজার সহ সমগ্র পাহাড়ী অঞ্চল। বৃহত্তর চট্টগ্রাম। তথা সারা বাংলাদেশ। তারপর গোদের ওপর বিষফোড়া অসমের NRC যেন অকারণে বাংলাদেশ দুশ্চিন্তার মহাসাগরে ডুবিয়ে দিলে এই বাংলাদেশ নামক এই ছোট্ট ভূখন্ডটির অবস্থা নিয়ে সারা বিশ্ববাসীকেই ভাবতে হবে!
চার ঃ তারপরও নানা প্রতিকূলতা ও নিরাশার মধ্যেও আশার আলো আমরা দেখতে পাই। যে যত পেছনেই টানুক এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে হয়ে গেল ঢাকায় ওআইসি সম্মেলন। সম্মেলনে আমাদের সাহসী নেত্রী প্রধানমন্ত্রী ওআইসি নেতাদের উদ্দেশ্য পাঁচ দফা চিন্তাধারা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন-সাম্প্রদায়িক মানসিকতা বর্জন করতে হবে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব বিবাদের সমাধান করতে হবে এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর আহবান জানান। এর ফলশ্রুতিতেই ওআইসির সম্মানীত মহাসচিব সম্মেলনে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা হবে। বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে বসা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ওআইসি এর নেতাদের এগিয়ে আসা তো বাংলাদেশের এক বড় বিজয়। ওআইসি যদি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অবশ্যই আমরা সুফল পাব। বাংলাদেশের জন্য কি ঢাকার ওআইসি সম্মেলন এক বিরাট অর্জন নয়? এ বিষয়ে সবাই সরকারের পাশে দাঁড়ালে বাংলাদেশের সম্মান বাড়বে বৈ কমবে না। এখানেও নিন্দুকের ভূমিকা কখনো কাম্য নয়।
পাঁচ ঃ দেশের পত্র-পত্রিকার পাতায় পাতায় ভেসে আসলো বাংলাদেশের বিরাট অর্জন। দৈনিক সিলেটের ডাক লিখে (সচিত্র) ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ, মহাকাশে ‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইট, দৈনিক জনকণ্ঠের সচিত্র শিরোনাম-‘এবার মহাকাশে পা, আরেক স্বপ্নপূরণ, স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ, ফ্লোরিডা কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপন, নিয়ন্ত্রণ করা হবে গাজীপুর থেকে, আয় হবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা, স্যাটেলাইট পাঠানোর তালিকায় ৫৭তম। স্যাটেলাইটের মালিক হিসাবে ৫৭তম দেশ হিসেবে আমরা আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়ালাম। স্যাটেলাইটে বাংলায় ‘জয়বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগানটি লেখা রয়েছে। আসুন আমরা এবার সবাই মিলে বাংলার জয়গান গাই। বিজয়ের জয় গান গাইতে অকারণে আমরা কেউ যেন দূরে সরে না যাই।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, সাবেক ব্যাংকার।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : কওমি মাদরাসা সনদের সরকারি স্বীকৃতি
  • পাহাড় ধ্বস
  • কালের গভীরে অমূল্য জীবন
  • সড়ক সন্ত্রাস প্রসঙ্গ
  • সনদ অর্জনই কি শিক্ষার লক্ষ্য?
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • সিসিক মেয়র এবং আমাদের প্রত্যাশা
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
  • ১৫ আগস্ট ’৭৫ : ধানমন্ডি ট্রাজেডি
  • সেই দিনটির দুঃসহ স্মৃতি
  • মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • চিরঞ্জিব বঙ্গবন্ধু
  • ক্ষমা করো পিতা
  • এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
  • পোয়েট অব পলিটিক্স
  • শুধু সাক্ষরতা বৃদ্ধি নয়, প্রকৃত শিক্ষা চাই
  • নাগরিক সাংবাদিকতা ও দায়বদ্ধতা
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : আমাদের শিক্ষা
  • Developed by: Sparkle IT