সম্পাদকীয়

আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস

প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫৫:৫৫ | সংবাদটি ২৪ বার পঠিত

আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস আজ। যৌথ পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখার মানসিকতা সৃষ্টির লক্ষে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। সময়ের তাগিদে যৌথ পরিবার কিংবা পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার বিষয়টি যখন এই সমাজে ক্রমান্বয়ে গুরুত্বহীন হয়ে উঠছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আজকের এই আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। রক্তের বন্ধন মানেই পারিবারিক বন্ধন। পরিবারের সকল সদস্যের মধ্যে অকৃত্রিম সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তা অটুট রাখা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের চিরায়ত সমাজ ব্যবস্থায় সুন্দর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, সুন্দর পারিবারিক বন্ধন। পরিবারের সকল সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধুর মতো হলে পারিবারিক নানা জটিল সমস্যা ও মোকাবেলা করা যায়। সকলের এগিয়ে চলার পথ হয় মসৃণ। মূলত এই প্রেক্ষাপটেই আজ দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস।
আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালন শুরু হয় ১৯৯৫ সাল থেকে। বিশেষ করে, শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিশ্বের পশ্চিমা উন্নত দেশ গুলোতে পরিবারের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভেঙে যেতে থাকে পরিবারের প্রচলিত বন্ধন। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে বিবাহ বিচ্ছেদসহ নানান সামাজিক সমস্যা। ফলে অনেক শিশুই বাবার পরিচয় ছাড়া বড় হতে থাকে। এই অবস্থায় পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে জনসচেতনতা সৃষ্টির ওপর তাগিদ দেয় জাতিসংঘ। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ই মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। তাছাড়া, ১৯৯৫ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত ‘সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিশ্ব’- শীর্ষক সম্মেলনে সামাজিক বন্ধনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মূলত এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে পারিবারিক ছোট বড় সকল সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখা। বিশেষ করে, শিশুদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব পোষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবার মানেই হচ্ছে মা, বাবা, ভাই, বোন, দাদা, দাদী বাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসবাস। আমাদের সমাজব্যবস্থায় পরিবারের এই ধারণা প্রচলিত অতীত থেকেই। কিন্তু দিন যতোই যাচ্ছে, আমরা যেন ততোই এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছি। যেন ক্রমেই ‘স্বামী-স্ত্রী-সন্তানে’ই সীমাবদ্ধ করে ফেলছি আমরা পরিবারকে। সেখানে মা-বাবা কিংবা দাদা-দাদীর কোন স্থান নেই। মা-বাবাকে হয়তো গ্রামের বাড়িতে কাটাতে হচ্ছে নিঃসঙ্গ-অসহায় জীবন। আবার অনেক মা-বাবার ঠিকানা হচ্ছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে একান্নবর্তী কিংবা যৌথ পরিবারের ধারণা যেন এখন ‘সেকেলে’ হয়ে গেছে। বিশেষ করে, শহুরে জীবন ব্যবস্থায় এই ব্যাপারটি চরম আকার ধারণ করেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের সমাজে প্রচলিত যৌথ পরিবারে পারস্পরিক সম্প্রীতি গভীর হয়, অটুট থাকে। অসুখ বিসুখসহ নানা সমস্যায় একে অন্যের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এতে অনেক বড় সমস্যাও সমাধান হয়ে যায় অতি সহজে।
শহুরে সমাজে যৌথ পরিবারের ধারণা ফিকে হয়ে আসলেও গ্রামীণ সমাজে এখনও যৌথ পরিবারগুলো সুখে-শান্তিতে বসবাস করে আসছে। আর এটাই আমাদের ঐতিহ্য। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি অনুসরণ করে যারা প্রত্যক্ষভাবে রক্তের সম্পর্ক অস্বীকার করে নিকটজনকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, তারা পরোক্ষভাবে আমাদের চিরাচরিত সমাজ-ব্যবস্থাকেই অস্বীকার করছে। আমাদের জাতিগত একটা বৈশিষ্ট্য আছে, আছে নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি। এই সবকিছুকেই আমাদের ধারণ করে সামনে এগুতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, অন্যের কাছ থেকে ধার করা কোন কিছুতেই গৌরব নেই। বরং তা আমাদের জন্য অপমান। সর্বোপরি, পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে বলেই আমাদের সামাজিক নানা সমস্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বাড়ছে অস্থিরতা। ধর্মীয় বিধানেও রক্তের সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখার ওপর তাগিদ দেয়া হয়েছে। আজকের আন্তর্জাতিক পরিবার দিবসে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য অক্ষুণœ থাকুক, প্রতিটি পরিবারে বিরাজ করুক অনাবিল সুখ-শান্তি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT