উপ সম্পাদকীয়

প্রয়োজন সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৫-২০১৮ ইং ০২:৩৬:০২ | সংবাদটি ৬৪ বার পঠিত

বর্তমান সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা একটি আতঙ্কের নাম। প্রতিদিন পত্র-পত্রিকা ও টিভি-মিডিয়া খুললেই খবর পাওয়া যায় অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর, যা নিত্য দিনের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, দিন দিন যেন দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে নিহত-আহত মানুষের সংখ্যা। ফলে পথে বসছে অসংখ্য ব্যক্তি, পিতা-মাতা ও পরিবার। পত্র-পত্রিকাসহ দেশের গণমাধ্যমগুলো জনগণের এই করুণ ও অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও কার্যকর ভূমিকা নিতে শুধু চেঁচিয়েই যাচ্ছে কিন্তু দুর্ঘটনা বন্ধের ব্যবস্থাতো দূরের কথা, যথাযথ কোনো প্রতিক্রিয়াও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
কয়েক দিন পূর্বে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা সদরের সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়কে স্থানীয় পথচারী ট্রাক ড্রাইভার বিলাল আহমদ ট্রাক চাপায় নিহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা সদরের মল্লিকপুর এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ী চাপায় রুহুল আমিন হৃদয় নামে মটর সাইকেল আরোহী ছাত্র নিহত হয়েছেন। ঢাকার ব্যস্ততম সড়কে বাসচাপায় হাত হারানো তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব এবং ঘাতক বাস চাপায় পা হারানো গৃহকর্মী রোজিনাকেও পৃথিবীর আলোবাতাস থেকে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে। রাজধানী ঢাকা-সিলেটসহ সারাদেশের গণপরিবহন ও ট্রাক চালকরা যেন কোনো আইন-কানুন মেনে চলার তোয়াক্কা করে না। এক দশক আগেও নিয়ম রীতি মোতাবেক নির্দিষ্ট স্থানের বাসের টিকেট কেটে বাসে ওঠার নিয়ম ছিল এবং নির্দিষ্ট স্টপেজগুলো ছাড়া কোনো বাস অন্যত্র থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করতো না কিন্তু এখন ঢাকাসহ প্রতিটি বড় বড় শহরেই যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী উঠা-নামানো নিত্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি দীর্ঘ আন্ত-বিভাগীয় রাস্তার বাসগুলোও মাঝপথে যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা করে থাকে ফলে যাত্রীবেশী ডাকাত দ্বারা গাড়ীগুলোতে ডাকাতি সংঘটিত হচ্ছে। চালকরা রাস্তার পাশে লোকজন দাঁড়ানো দেখলেই বাস থামিয়ে যাত্রী উঠাতে চেষ্টা করে থাকেন। বিষয়টি চালক-মালিক সবাই কিন্তু স্বীকার করে থাকেন। অন্যদিকে গাড়ীর মালিকদের দাবি, দেশে ভালো ও দক্ষ ড্রাইভারের অভাব থাকায় তারা বাধ্য হয়েই অদক্ষ ও নবীন ড্রাইভার নিয়োগ দিয়ে থাকেন। নবীন, অদক্ষ ও মাদকাসক্ত ড্রাইভার দ্বারাই বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ তার সঙ্গে লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ড্রাইভার এবং ফিটনেসহীন গাড়ীতো রয়েছেই।
বেশির ভাগ ড্রাইভার হয় মাদকাসক্ত, নয়তো অল্প বয়স্ক দায়িত্ব জ্ঞানহীন হয়ে থাকে ফলে নিজের জীবনতো বটেই পরের জীবনের প্রতিও দরদবোধ থাকে না। মানবিক গুণাবলি, দরদিমন ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজের সম্পৃক্ততা ও সচেতনতা না থাকায় তারা যেনতেনভাবে গাড়ী চালিয়ে থাকে ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে মালিকদের আইন অমান্য করার মনমানসিকতাতো রয়েছেই। গাড়ীর অসাধু মালিক ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ফিটনেস বিহীন গাড়ী যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে ফলে ফিটনেসবিহীন গাড়ী, লাইসেন্সহীন অদক্ষ ড্রাইভার চালিত বাস, ট্রাক দ্বারা দুর্ঘটনার পরিমাণতো বৃদ্ধি পাবেই। সে ক্ষেত্রে যদি সারাদেশের গাড়ী চালকদেরকে সঠিকভাবে কারিগরি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবিক জ্ঞান দিয়ে গড়ে তোলা সম্ভব হয় এবং রাস্তায় ট্রাফিক ও শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরধারী ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা সম্ভব হয় তবে সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৭,৩৯৭ জন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১৭২২ জন, আহত হয়েছেন প্রায় ১৬,১৯৩ জন। উক্ত দুর্ঘটনাসমূহে ১২৪৯ বাস, ১৬৩৫টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ২৬২টি কার জিপ ইত্যাদি যানবাহন সহ মোট ১৪৭৫টি মোটরসাইকেল রয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকান্তরে জানা যায়, সম্প্রতি ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক এন্ড সোশ্যাল কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় দেশজ উৎপাদনের (২) দুই শতাংশ ক্ষতি হয়ে থাকে, সে অনুযায়ী মোট আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৬ হাজার ৬ শত কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপির আকার প্রায় বত্রিশ লক্ষ কোটি টাকার হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার ২ শত কোটি টাকা। যা দিয়ে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ন্যায় দূরত্বের কয়েকটি মহাসড়ককে চারলেন-এ উন্নীত করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বের যানবাহনের গতি যদি ৫ শতাংশ কমানো সম্ভব হয় তবে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। সে জন্য গাড়ী চালকদেরকে সড়ক আইন মান্য করার নির্দেশনা জ্ঞান দান এবং মন-মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সমন্বিত উদ্যোগ নিলে আমাদের দেশেও সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা কম হওয়ার কারণ হল, সেখানকার গাড়ী চালক ও পথচারীবৃন্দ সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চলে, ভূয়া লাইসেন্সধারী ও অদক্ষ গাড়ী চালক নেই। ত্রুটিপূর্ণ বা ফিটনেসবিহীন গাড়ী রাস্তায় নেই। তাদের সড়কগুলো সুপরিসর এবং চালকবৃন্দ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও মানবিক জ্ঞানসম্পন্ন, সর্বপরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরধারী রয়েছে। আমাদের দেশেও উল্লেখিত সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব হলে, বিশেষ করে সবাই সচেতন হয়ে ট্রাফিক আইন মেনে চললে, শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল করতে না দিলে, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক সংস্কার করা হলে সর্বপরি পথচারী ও গাড়ী চালক সচেতন হলে এবং ট্রাফিক আইন যথাযথ প্রয়োগ করা হলে সড়ক দুর্ঘটনার উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করে উন্নয়নের মহাসড়কে উন্নীত করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী সরকারের পাশাপাশি পথচারী ও চালকসহ সকল মহল সচেতন হয়ে সরকারকে সহযোগীতার হাত প্রসারিত করলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে ইনশাল্লাহ।
লেখক : সাবেক কর্মকর্তা, সিলেট পাল্প এবং পেপার মিলস।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • যুব সমাজের অবক্ষয় রোধে যা করণীয়
  • জাতিসংঘ দিবস আজ
  • নির্বাচনী ইশতেহার এবং ভোটারদের করণীয়
  • ইয়েমেন সংকট : কে কার সঙ্গে লড়াই করছে?
  • বৃটিশ আমলে সিলেটের প্রথম আইসিএস গুরুসদয় দত্ত
  • ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব
  • প্রবীণদের যথাযথ মূল্যায়ন কাম্য
  • ইতিহাসের একটি অধ্যায় : প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান
  • সড়কে মৃত্যুর মিছিল কি থামানো যাবে না?
  • স্বাস্থ্যসেবা : আমাদের নাগরিক অধিকার
  • কে. আর কাসেমী
  • আইনজীবী সহকারী কাউন্সিল আইন প্রসঙ্গ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • Developed by: Sparkle IT