উপ সম্পাদকীয়

ভাসানীর লালটুপি সম্মেলন ও ফারাক্কা মার্চ

সৈয়দ আছলাম হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৫-২০১৮ ইং ০২:৩৬:৩৭ | সংবাদটি ১৬ বার পঠিত

সর্বজন শ্রদ্ধেয় কৃষক শ্রমিকের নয়নমনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কালের সাক্ষী হয়ে স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক তৎপরতা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে, পাকিস্তানের প্রাদেশিক ও জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণের লক্ষ্য নিয়ে তিনি দলকে প্রস্তুত করতে সচেষ্ট হয়েছেন। জনসংযোগের পাশাপাশি জনসমর্থন বৃদ্ধির জন্য তিনি কৌশল নির্ধারণ করেন। সেই কৌশলের অন্তর্ভুক্ত ছিল তিনটি কৃষক সম্মেলন, যা তিনি ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছিলেন তা বাস্তবও করেছিলেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি ১৯৬৯ সালের জুন মাসের শেষে ঘোষণা দেন যে, পাবনা জেলার শাহপুরে ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর প্রথম কৃষক সম্মেলন করবেন। শাহপুর জায়গাটি ঈশ্বরদী ও পাকশীর মাঝামাঝি দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এই সম্মেলনে যোগদানের জন্য মাওলানা ভাসানী কৃষকদের লালটুপি মাথায় দিয়ে আসতে বলেছিলেন। সেপ্টেম্বর মাসের ৫ ও ৬ তারিখ শাহপুরে সফলভাবে কৃষক সম্মেলন সম্পন্ন হয়েছিল। মাওলানা ভাসানী সম্মেলনে ১০ হাজার কৃষকের অংশ গ্রহণের পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু সারাদেশ থেকে স্বতস্ফুর্তভাবে কৃষকরা সেই সম্মেলনে যোগ দেয়ার ফলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৩০ হাজার অতিক্রম করে। (যদিও কেউ কেউ লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল বলে উল্লেখ করে থাকেন) যাই হোক সংগঠকদের সতর্কতা ও ত্বরিৎ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছিল।
হাজার হাজার কৃষক লালটুপি মাথায় দিয়ে আসার কারণে শাহপুরের প্রান্তর সেদিন লালে লাল হয়ে গিয়েছিল। সে কারণে ইতিহাসে এ সম্মেলনটি মাওলানা ভাসানীর ‘লালটুপি সম্মেলন’ নামে পরিচিত।
দ্বিতীয় লালটুপি সম্মেলনটি হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১০ ও ১১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষে মাওলানা ভাসানীর বাড়িতে, এখানে আরো বেশি লোকের সমাগম হয়েছিল। যারা সেদিন সন্তোষে গিয়েছিলেন তারা মনে করেন, টাঙ্গাইলে যদি ট্রেন যোগাযোগ থাকতো তাহলে এত লোক সমাগম হত যে, ম্যানেজ করা আয়োজকদের অসাধ্য হয়ে পড়তো।
তৃতীয় লাল পুটি সম্মেলনটি হয় ১৯৭০ সালের ১৫, ১৬ মার্চ বগুড়া জেলার মহীপুর। (মহীপুর বর্তমান জয়পুর হাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার অন্তর্গত)। সে কারণে মহীপুর সম্মেলন পাঁচবিবি সম্মেলন নামেও পরিচিত। এই সম্মেলনেও প্রচুর লোক সমাগম হয়েছিল। উল্লেখ্য যে শাহপুর এর সন্তোষের আলোকে মহিপুরে খাবার সরবরাহ করা হয়েছিল প্রায় ৪ ঘন্টা ধরে। ব্যাচে ব্যাচে। যাতে এক সাথে ১৫-২০ হাজার লোকের খাবার বিতরণের চাপ এড়ানো যায়। সফলভাবে তিনটি কৃষক সম্মেলন সম্পন্ন করার পরে মাওলানা ভাসানীকে খুব আত্মবিশ্বাসী ও ফুরফুরে মনে হচ্ছিল। তখনো তিনি ব্যাপক গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। পাশাপাশি তিনি তার রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)কে পুনর্গঠিত করার কাজে মনোযোগী হন।
মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ফারাক্কা মার্চ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টির পরও ভাসানী থেমে থাকেননি। তিনি এ সমস্যাকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখতেন। এটা ছিল তার বাস্তববাদী চিন্তার প্রতিফলন। ফারাক্কা সমস্যা একটি বড় সমস্যা, এর পানি বন্টন চুক্তির মাধ্যমে পদ্মার পানির ন্যায় হিস্যা আদায় করে আনা যে জরুরি এটা তো আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি কোন সরকারই অস্বীকার করেননি। বরং যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে বারবার তারা ভারতীয় প্রতিপক্ষের সাথে মিটিং করেছে যে, ফারাক্কা আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে মাওলানা ভাসানীকে পৃথক করে বিশেষভাবে ভারত বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কেউ করতে চাইলে বুঝতে হবে সেটা উদ্দেশ্যমূলক। মাওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে, ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ঐতিহাসিক লং মার্চে নেতৃত্ব দেন। উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হবার পর মাওলানা ভাসানী কম বেশি বছর খানেক বেঁচেছিলেন। এই সময়ের মধ্যে দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা বিবেচনায় নিয়ে তিনি নিজের দলকে পুনর্গঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার এই উদ্যোগ বিশেষ প্রয়োজন ছিল, কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ‘বাকশাল’ গঠনের পর দেশে বেশিরভাগ প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মাওলানা ভাসানী ১৯৬৯-৭০ সালে যেমন লালটুপি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন, ঠিক তেমন নিজের দলের নেতাকর্মীদের পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি ‘ফারাক্কা মার্চ’ আয়োজন করেছিলেন। এটা ভারত বিরোধী কোন কার্যক্রম বা পদক্ষেপ ছিলনা। তবে তখন দেশে যে সামরিক সরকার ছিল তারা বিভিন্ন কৌশলে ফারাক্কা মার্চ থেকে নিজেদের স্বার্থে সুবিধা আদায় করেছিল সেটাও অনস্বীকার্য। ঐতিহাসিক ফারাক্কা মার্চ হলো মাওলানা ভাসানীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের শেষ উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি। এর কিছুদিন পরই তিনি অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হোন। কয়েক দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই দেশবরেণ্য নেতা ইন্তেকাল করেন। তাকে টাঙ্গাইলের সন্তোষে দাফন করা হয়। সারাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ জানাযায় আসেন। ক্ষণজন্মা এ মহান পুরুষ আজও বাংলার ঘরে ঘরে অসহায়, বঞ্চিত, শোষিত মানবের কাছে জেগে উঠার প্রেরণা যোগায়। তিনি মরেও সকলের মাঝে বেঁচে আছেন।
বাংলার ইতিহাসে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতেন হৃদয় উজাড় করে। শুধু লালটুপি সম্মেলন নয়, রাজনৈতিক সমস্যা, ফারাক্ক সমস্যা, সহ জাতীয় সকল সমস্যা সমাধানকল্পে বাংলার ঘুমন্ত জনগণকে সজাগ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন। তাই বাংলার আপামর জনতার নয়নমণি মাওলানা ভাসানী চির অমর ও অক্ষয়।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ কাম্য
  • বিশুদ্ধ প্রেমের কবি নজরুল
  • আচার-আচরণ ও মানবিক মূল্যবোধ
  • নদীর নাব্যতা সংকট প্রসঙ্গে
  • রমজানে ইফতারি ও সেহরিতে কি খাবেন?
  • মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফারুক আহমদ
  • রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস
  • উচ্চ মূল্যস্ফীতির শঙ্কায় দেশের অর্থনীতি
  • প্রসঙ্গ : উত্তরাধিকার কর
  • কাঁদো ফিলিস্তিন কাঁদো
  • জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি
  • মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে যেন রক্তক্ষরণ না হয়
  • সমুদ্রতীরের দৃশ্য : একটি প্রশ্ন
  • হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
  • কোটা : সমস্যার কি নেই সমাধান?
  • মালেশিয়া : চৌর্যবৃত্তিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন
  • সাহ্রি ও ইফতারে সতর্কতা
  • মালয়েশিয়া ও মাহাথির মোহাম্মদ
  • মাছ চাষ এবং মেয়ের বাড়ি ইফতারি
  • রমজানে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ
  • Developed by: Sparkle IT