উপ সম্পাদকীয়

গুটিয়ে আসছে আইএস

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৫-২০১৮ ইং ০২:৪৭:১৭ | সংবাদটি ১৯ বার পঠিত

ইরাক ও সিরিয়ায় তৎপর উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছে। সিরিয়ার আল-বুকামাল শহর থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসের পতাকা ভূলুন্ঠিত করে সিরিয়ার পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে সম্প্রতি। এর মাধ্যমে সিরিয়া থেকে আইএস নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলেও জানা যায়।
কীভাবে এবং কেন আইএসের উত্থান এটি এমন একটি প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্বের নামকরা বিশ্লেষকরাও বিভ্রান্ত হয়েছেন। গত কয়েক বছরে নানা প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে আইএসের উত্থানকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা হয়েছে। রাজনৈতিক, আদর্শগত, ঐতিহাসিক, এমনকী ঔপনিবেশবাদী প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে এই জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা হয়েছে। তবে উপযুক্ত দলিল ও প্রমাণ দিয়ে বেশিরভাগ বিশ্লেষক এটা প্রমাণ করেছেন, আইএসের উত্থানে আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইজরায়েল মূল ভূমিকা পালন করেছে।
তাদের মতে, আইএসের উত্থানের বীজ বপন করা হয় ২০০৩ সালে ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে। ওই আগ্রাসনের মাধ্যমে সাদ্দামের নেতৃত্বাধীন বাথ সরকারের পতন হলে ইরাকে বড়ধরনের নিরাপত্তাগত শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এই অরাজক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক আল-কায়দা ইরাকে তাদের নতুন শাখা খোলে। সাদ্দামের বাথ সরকারের পদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আবু মুসআব আল-জারকাভিকে ওই শাখার প্রধান করা হয়। সাদ্দামের পতন-পরবর্তী পরিস্থিতে ইরাকে যাতে একটি স্থিতিশীল সরকার ক্ষমতায় বসতে না পারে, সে দায়িত্ব দেওয়া হয় জারকাভিকে। জারকাভিও বাধ্য ছাত্রের মতো ইরাকজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার তান্ডব চালিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করে। জারকাবির জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে প্রাণ হারান বহু রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাসহ হাজার হাজার মুসলমান।
পরবর্তীতে আবু ওমর আল বাগদাদি এবং আবু বকর আল-বাগদাদি দিয়ে জারকাভির পালিত দায়িত্বকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে তারা তাদের গোষ্ঠীর নাম দেয় দৌলতে ইসলামিয়ে ইরাক বা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক। পরবর্তীতে এর সঙ্গে শাম বা সিরিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করে দৌলতে ইসলামিয়ে ইরাক ওয়া শাম বা আইসিস নামে আত্মপ্রকাশ করে এই জঙ্গিগোষ্ঠী। আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কিছু মিত্র দেশের অর্থ, অস্ত্র ও গোয়েন্দা সাহায্য নিয়ে এই গোষ্ঠী রাতারাতি সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে ফেলে।
সৌদি আরব ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও কিছু দেশের সমর্থন নিয়ে ২০১৪-র জুনে হঠাৎ করে ইরাকের নেইনাভা সালাউদ্দিন ও আল-আনবার প্রদেশের পুরোটা এবং দিয়ালা ও কিরকুক প্রদেশের একাংশ দখল করে নেয়। এমনকী ওই জঙ্গিগোষ্ঠী ইরাকের রাজধানী বাগদাদের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। আইএস নামক বিষফোঁড়ার দিন দিন স্ফীত আকার ধারণের পেছনে আরব দেশগুলোর সরাসরি সমর্থন থাকলেও এর পেছনে ছিল ইজরায়েল-বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন দুর্বল করে ফেলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। সিরিয়া ও লেবাননকে কেন্দ্র করে ইহুদিবাদী ইজরায়েল-বিরোধী যে প্রতিরোধ আন্দোলন চলছিল, তাকে প্রতিহত করার জন্য ইসলামের বাহ্যিক বেশভুষা পরিয়ে ওই জঙ্গিগোষ্ঠীকে লেলিয়ে দেওয়া হয়। অথচ বাস্তবে ওই জঙ্গিগোষ্ঠীর আচরণের সঙ্গে ইসলামের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না।
ইসলামের বাহ্যিক বেশভুষা দেখে প্রথম দিকে হাজার হাজার তরুন বিভ্রান্ত হয়ে ওই জঙ্গিগোষ্ঠীতে যোগ দেয়। এই জনবলকে কাজে লাগিয়ে ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আইএস। দু‘টি দেশের এসব এলাকার সব সামরিক ও দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে তারা। এ কাজে তাদের সামরিক পরামর্শ ও কমান্ড দিয়ে সহযোগিতা করে পতিত সাদ্দাম সরকারের বাথ পার্টির সামরিক কমান্ডাররা। উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ভয়াবহ অপরাধযজ্ঞ চালায়। তারা সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, তেল ও গ্যাসের খনি, তেল শোধনাগার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এগুলোর অনেক কিছু ধ্বংস করে দেয়। এমনকী তারা নির্মম হাতে ইরাক ও সিরিয়ার হাজার হাজার বছরের পুরানো প্রতœতাত্তিক নিদর্শন ধ্বংস করে। ইরাকে দায়েশের বর্বর জঙ্গিদের অড়গ্রাভিযানের ফলে দেশটিতে ভয়াবহ জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের আশঙ্কা তৈরি হয়। কারবালা নাজাফ, সামেরা ও কাজেমাইনে অবস্থিত আহলে বাইতের ইমামদের কবরগুলো হুমকির মুখে পড়ে। এর মাধ্যমে ইরাক একটি ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ও মহা দাঙ্গা থেকে রক্ষা পায়। আয়াতুল্লাহ সিস্তানির ফতোয়া অনুসরণ করে ইরাকে তৈরি হয় জনপ্রিয় গণবাহিনী ‘হাশদ আশ-শাবি।’
এদিকে, জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের অগ্রাভিযান রুখতে ইরাকের সেনাবাহিনী ওহাশদ আশ-শাবিকে প্রস্তুত করা হয়। ওই মাটিতে জঙ্গিরা বাগদাদের উপকন্ঠে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারা বাগদাদের শহরগুলোতে কাজেমাইন এলাকা থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। কিন্তু এর পর আর ওই জঙ্গিগোষ্ঠীকে এক বিন্দু পরিমাণ অগ্রগতি অর্জন করতে দেয়নি ইরাকের সেনাবাহিনী ও হাশদ আশ-শাবি। ওই দু’টি বাহিনীর সমম্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী ইরানের সামরিক উপদেষ্টাদের পরামর্শ অনুযায়ী আইএসের পশ্চাদ্ধাবন করে। তাদের ধাওয়া খেয়ে জঙ্গিরা বাগদাদ থেকে পিছু হঠে এবং বাগদাদ ও সামেরার মধ্যবর্তী এলাকা যৌথ বাহিনী পুনরুদ্ধার করে। এর পর অল্প সময়ের মধ্যে সালাউদ্দিন প্রদেশের বেশিরভাগ এলাকা থেকে আইএসকে হঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৫-এর ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে আল- আনবার প্রদেশের রাজধানী রামাদি সহ আরও কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার হয়।
ইরাকের পাশাপাশি সিরিয়ায়ও একই ধরনের প্রতিরোধ সংগ্রামে একের পর এক সাফল্য আসতে থাকে। ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে আইএস-বিরোধী যৌথ বাহিনীর হামলায় ইরাকের ফলুজা শহর জঙ্গিমুক্ত হয়। এভাবে একের পর এক শহর ও এলাকা আইএস মুক্ত হতে থাকে এবং চলতি মাসে ইরাকের আল-কায়েম শহর পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে ইরাক থেকে আইএসকে পুরোপুরি নির্মুল করে ফেলা হয়। ওদিকে, সিরিয়ার সেনাবাহিনীও সম্প্রতি আইএসের শেষ শক্ত ঘাঁটি বুকামালে জঙ্গিদের পতাকা নামিয়ে সিরিয়ার পতাকা উত্তোলন করে। উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান হয়েছিল ইসলামকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে তাদের লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বিশেষ করে ইরাক ও সিরিয়াকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলা। ওই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি প্রখ্যাত এক মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্টানের প্রতিবেদনে ধরা পড়ে। ২০১৬-ও জুলাইয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায়, আমেরিকা রাশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পদস্থ কর্মকর্তারা যখন ভিয়েতনাম একত্রিত হয়ে সিরিয়া সংকট সমাধানের চেষ্টা করেন, তখন ওই বৈঠক থেকে ইতিবাচক কোনও কিছু আশা করা যায় না। প্ররোচনামূলক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘এই যুদ্ধ হয়তো বহু বছর ধরে চলতে থাকবে। আর যত দিন যুদ্ধ চলবে ততদিন যে গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যে এলাকা রয়েছে সেই গোষ্ঠী সেই এলাকা শাসন করবে।’
প্রতিবেদনে একটি বার্তা সুস্পষ্ট। আর তা হলো অস্থায়ী ভিত্তিতে হলেও সিরিয়াকে খন্ড বিখন্ড করে রাখা। বিশেষ করে গোটা সিরিয়ায় আবার কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করার আগ পর্যন্ত আইএসের দখলে থাকা এলাকাগুলোকে আর্ন্তজাতিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি সিরিয়াকে ১৯৪৫- পরবর্তী জার্মানির সঙ্গে তুলনা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি চারটি অংশে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার মাধ্যমে আবার অখন্ড জার্মানি হতে ৪৪ বছর সময় লেগেছিল।
কিন্তু সিরিয়ার ভাগ্য মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারণ করতে পারেনি বরং যুদ্ধের ময়দানেই দেশটির ভাগ্য নির্ধারিত হয়। মার্কিন সরকার-বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পেছনে প্রায় ২০০ কোটি ডলার খরচ করে। কিন্তু দেইর আজ-জোর ও বুকামাল থেকে আইএসের শেষ চিহ্ন মুছে ফেলার মাধ্যমে আমেরিকার সে অর্থ ব্যয়কে চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, ইরাক আইএস ছাড়া অন্য কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠী তৎপর ছিল না বলে ওই জঙ্গিগোষ্ঠী নির্মূলের ফলে দেশটি এখন বাগদাদের ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। অন্যদিকে, সিরিয়া থেকে তাদের নির্মূলের পর এখন দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অচিরেই সিরিয়ায় পরিপূর্ণ শান্তি ফিরে আসবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ কাম্য
  • বিশুদ্ধ প্রেমের কবি নজরুল
  • আচার-আচরণ ও মানবিক মূল্যবোধ
  • নদীর নাব্যতা সংকট প্রসঙ্গে
  • রমজানে ইফতারি ও সেহরিতে কি খাবেন?
  • মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফারুক আহমদ
  • রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস
  • উচ্চ মূল্যস্ফীতির শঙ্কায় দেশের অর্থনীতি
  • প্রসঙ্গ : উত্তরাধিকার কর
  • কাঁদো ফিলিস্তিন কাঁদো
  • জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি
  • মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে যেন রক্তক্ষরণ না হয়
  • সমুদ্রতীরের দৃশ্য : একটি প্রশ্ন
  • হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
  • কোটা : সমস্যার কি নেই সমাধান?
  • মালেশিয়া : চৌর্যবৃত্তিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন
  • সাহ্রি ও ইফতারে সতর্কতা
  • মালয়েশিয়া ও মাহাথির মোহাম্মদ
  • মাছ চাষ এবং মেয়ের বাড়ি ইফতারি
  • রমজানে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ
  • Developed by: Sparkle IT