শিশু মেলা

গ্রহাণু

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৫-২০১৮ ইং ০২:২৩:৩৪ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

‘পৃথিবীবাসীর জন্য বিরাট এক দুঃসংবাদ! মহাকাশে ভাসমান একটি গ্রহাণু তীরবেগে ছুটে আসছে পৃথিবীর দিকে। কোটি কোটি মাইল দূর থেকে গ্রহাণুটি পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে। বছর তিনেক সময়ের মধ্যে পৃথিবীর সাথে এর বিরাট এক সংঘর্ষ হবে। প্রবল ভরবেগ নিয়ে এসে এটি পৃথিবীকে ধাক্কা দেবে। পৃথিবীর কোন অঞ্চলে যে এটি এসে ধাক্কা দেয়, তা পরিস্কার করে বলা মুশকিল। কারণ সংঘর্ষের মুহূর্তে ভ্রাম্যমাণ পৃথিবী তার কোন অংশটি যে গ্রহাণুর সামনে মেলে ধরে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে পৃথিবীর যে অঞ্চলে এটি এসে ধাক্কা দেবে সে অঞ্চল বিরাট ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবে। মানবসভ্যতা ও প্রাণীজগৎ বিরাট বিপর্যয়ের মুখে পতিত হবে। শুধু তা-ই নয়, পৃথিবী নিজেও তার কক্ষপথ থেকে কিছুটা সরে আসতে পারে। এতে মহাবিশ্বীয় বিরাট পরিবর্তনের আশংকা রয়েছে...।’
স্বনামধন্য একটি আন্তজার্তিক গণমাধ্যমের খবর এটি। খবরটি পড়ে বিজ্ঞানী রহমত আলী ভ্রু কোচকালেন। বর্তমান পৃথিবীর একজন সেরা বিজ্ঞানী তিনি। বিড়বিড় করে তিনি বললেন, সর্বনাশ! তিন বছর মাত্র সময়! তিন বছর পরই পৃথিবীর বুকে বিরাট বিপর্যয় নেমে আসবে। কী সাংঘাতিক কথা! ভাবা যায়।
এতক্ষণ তিনি বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে খবরটি পড়লেন। এবার চেয়ার থেকে উঠে পত্রিকাটি ভাঁজ করে রেখে রুমের দিকে পা বাড়ালেন। রুমের কোনে রাখা টেলিফোন। রিসিভার তুলে তিনি প্রথমে বিজ্ঞানী জামসেদকে ফোন করলেন।
Ñহ্যালো, রহমত আলী বলছি।
Ñকি খবর স্যার? অনেকদিন ধরে আপনার কোনো দেখা নেই। ভালো আছেন তো স্যার? বললেন বিজ্ঞানী জামসেদ।
Ñআমি ভালো আছি ভাই। আপনি কেমন আছেন, ভালো তো?
Ñজি স্যার ভালো আছি।
Ñতা খবর কিছু শুনেছেন? বললেন বিজ্ঞানী রহমত।
Ñকি খবর স্যার? অবাক হয়ে বিজ্ঞানী জামসেদ জানতে চাইলেন।
Ñকেন, আজকের পত্রিকা পড়েননি বুঝি?
Ñপড়েছি তো স্যার।
Ñপড়ে থাকলে তো জানার কথা।
Ñকী জানার কথা স্যার। আমি ঠিক আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
Ñআপনি দেখছি কিছুই জানেন না জামসেদ সাহেব। শুনুন বলছিÑযা কিছু খাওয়ার জলদি খেয়ে নিন। সময় মাত্র তিন বছর। মহাকাশে খুব খারাপ একটি গ্রহাণু ভেসে বেড়াচ্ছে। তিন বছর পর পৃথিবীর সাথে এটির বিরাট সংঘর্ষ ঘটবে। পৃথিবীর যে অঞ্চলের সাথে সংঘর্ষটা হবে, সে অঞ্চলে মনে করুন একেবারে কিয়ামত।
Ñবলেন কি স্যার? সাংঘাতিক খারাপ খবর তো! খবরটি কেন যে আমার চোখে পড়েনি, ঠিক বুঝতে পারছি না। এখুনি আমি পত্রিকা দেখছি স্যার। আপনার সাথে আজ বিকেলেই আমি দেখা করব। এ বিষয়ে আলোচনা করব। সে পর্যন্ত ভালো থাকুন স্যার। বলে তিনি রিসিভার রেখে দিলেন।
বিজ্ঞানী রহমত আলীও রিসিভার রাখলেন। মনে মনে তিনি ভাবলেন, বিজ্ঞানী আবদুর রহিমকেও খবরটা জানানো দরকার। ভেবে তিনি তার কাছে ফোন করলেন।
Ñহ্যালো! রহমত আলী বলছি।
Ñজি স্যার বলুন।
Ñরহিম সাহেব। আপনি এখন কোথায়?
Ñকেন স্যার? বাসাতেই তো আছি। জরুরি কিছু নাকি স্যার?
Ñজরুরি খবর তো অবশ্যই।
Ñবলুন তাহলে স্যার। আমি শুনছি।
Ñপত্রিকার খবরটির কথা বলছিলাম। পড়েছেন নিশ্চয়ই।
Ñহ্যাঁ স্যার পড়েছি। এটা নিয়েই তো খুব ভাবছি স্যার। মানবসভ্যতার সামনে বিরাট এক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। কী করে যে এটাকে রোখা যায় ঠিক বুঝতে পারছি না স্যার।
Ñএক কাজ করুন না রহিম সাহেব। বিকেলে আমার ল্যাবরেটরিতে একবার আসুন। চা চক্র হবে। জামসেদ সাহেবও আসবেন বলেছেন। তিনজন বসে একটু ভেবে দেখিÑকী করা যায়।
Ñঠিক আছে স্যার। আমি অবশ্যই আসব। বলে দুজনই রিসিভার নামালেন।
বিকেলে দুজনই বিজ্ঞানী রহমত আলীর ল্যাবরেটরিতে চলে এলেন। বিজ্ঞানী রহমত আলীর মতো এ দুজনও দুনিয়া বিখ্যাত বিজ্ঞানী। তবে বয়সে এখনো তরুণ। কালো রঙের সুন্দর একটি একপায়া গোল টেবিল ঘিরে বসলেন তিন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী।
প্রথমে বিজ্ঞানী রহমত আলীই মুখ খুললেনÑআমাদের কিছু একটা করা দরকার। পৃথিবীকে এ অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা দরকার। অসহায় মানবসভ্যতাকে বাঁচানো দরকার।
বিজ্ঞানী আবদুর রহিম বললেন, পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে আমরা আসলে দায়বদ্ধ। আমরা কখনো এ দায় এড়াতে পারি না স্যার। আমাদের কিছু একটা করতেই হবে।
বিজ্ঞানী জামসেদ বললেন, কিছু একটা যে অবশ্যই করতে হবে বুঝতে পারছি স্যার। কিন্তু কী করব আমরা। এটা একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকানোর সাধ্য মানুষের নেই।
বিজ্ঞানী জামসেদের কথা শুনে বিজ্ঞানী আবদুর রহিম বললেন, হোক না প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আমরা মানুষ। সৃষ্টির সেরা জীব। তাছাড়া আমরা হলাম পৃথিবীর অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী। মানুষ অসহায়ভাবে আমাদের মুখপানে তাকিয়ে আছে। আমরা তাদের জন্য কিছু একটা করব। অসহায় মানবসভ্যতাকে আমরা বাঁচাব।
তাদের কথা শুনে বিজ্ঞানী রহমত আলী বললেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। আমরা পৃথিবীকে রক্ষা করতে নাই বা পারি, অন্তত চেষ্টা তো করতে পারব। বাঁচার জন্য চেষ্টা। সভ্যতাকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা। পরে তিনি আরও বললেন, আমার ল্যাবরেটরির ছাদে সুপার টেলিস্কোপ চালু করে রেখেছি। সন্ধ্যার পর আমরা একবার ছাদে যাব। ছাদে গিয়ে গ্রহাণুটির অবস্থান, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করব। এখন তাহলে চা চক্র হোক। কি বলুন আপনারা?
বিজ্ঞানী রহমত আলীর কথায় বাকি দুজন সাঁই দিলেন।
এরই মধ্যে একজন পাচক এসে চা আর স্যান্ডউইচ পরিবেশন করে গেল। উচ্ছ্বাসের সাথে প্রত্যেকেই খাবার খেতে লাগলেন। চা পান করলেন। চা পান করতে করতেই বেলা ডুবে গেল। দিবা শেষের পাখিরা আপনমনে গান গেয়ে ওঠল। বিজ্ঞানী রহমত বললেন, চলুন এবার ছাদে যাওয়া যাক। বাকি দুজনও তার সাথে ছাদে এলেন।
ছাদের ওপর মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য চমৎকার একটি মঞ্চ পাতানো। মঞ্চে তিনটি সুপার টেলিস্কোপ বসানো। গ্রহাণুটি দেখার জন্য তিনজন বিজ্ঞানী গিয়ে তিনটি টেলিস্কোপ অধিকার করলেন। ইচ্ছেমতো তারা মহাকাশ জুড়ে গ্রহাণুটির অস্তিত্ব খুঁজতে লাগলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিজ্ঞানী জামসেদ সহসা চিৎকার দিয়ে উঠলেনÑপেয়েছি স্যার পেয়েছি। ওই তো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশে ৭৫ ডিগ্রি কৌনিকভাবে একবার তাকিয়ে দেখুন স্যার। কী ভয়ংকার গতি নিয়ে গ্রহাণুটি পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে। কী সাংঘাতিক গতি তার!
বিজ্ঞানী জামসেদের কথামতো বাকি দুজনও ৭৫ ডিগ্রি কৌনিকভাকে তাকালেন। তাকাতেই তারাও গ্রহাণুটি স্পষ্ট দেখতে পেলেন। গ্রহাণুটি দেখে বিজ্ঞানী রহমত আলী বললেন, সর্বনাশ! এ যে দেখছি ভয়ংকর দানব রে বাবা। গ্রহাণুটির ছুটে আসার আশ্চর্য গতি দেখে বিজ্ঞানী রহমত আলী হতাশভাবে তার আসনে এসে বসে পড়লেন। বললেন, খুবই ভয়ংকর সেই গ্রহাণু! খুবই ভয়ংকার! কী করা যায় এখন।
বিজ্ঞানী আবদুর রহিম এবং বিজ্ঞানী জামসেদও এসে তার পাশে বসলেন। তারা তিনজনই ভাবাভাবি শুরু করে দিলেন। কী করা যায় এখন!
বিজ্ঞানী জামসেদ হঠাৎ বললেন, আমার মাথায় একটি ধারণা এসেছে স্যার। ধারণামতো কাজ করলে হয়তো আমরা সাফল্য পেতে পারি।
বিজ্ঞানী রহমত জিজ্ঞেস করলেন, কি সেই ধারণা?
বিজ্ঞানী আবদুর রহিমও বললেন, বলুন না শুনি আপনার মনে কী এসেছে।
দুজনেরই শোনার আকুতি দেখে বিজ্ঞানী জামসেদ বলতে লাগলেনÑগ্রহাণুটিকে আমাদের প্রতিহত করতে হবে। প্রতিহত করতে পারলে নিশ্চয়ই সভ্যতার এ বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব।
বিজ্ঞানী জামসেদের এরূপ কথা শুনে বিজ্ঞানী আবদুর রহিম হেসে বললেন, সে কী কথা! আপনি একজন বিজ্ঞানী হয়ে এটাকে প্রতিহত করতে বলছেন। গ্রহাণুটিকে আপনি প্রতিহত করবেন কেমন করে? বলুন।
বিজ্ঞানী আবদুর রহিমের কথার জবাবে বিজ্ঞানী রহমত আলী বললেন, আমার মনে হয় আমি কিছুটা বুঝতে পেরেছি জামসেদ সাহেব কী বলতে চাচ্ছেন। গ্রহাণুটিকে মহাশূন্যে রেখেই ধ্বংস করে ফেলতে হবে। আর যদি ধ্বংস করা সম্ভব হয়, তাহলে এর ক্ষুদ্র অংশ অণু-পরমাণুতে বিভক্ত হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে গিয়ে মহাশূন্যেই বিলীন হয়ে যাবে। এতে রক্ষা পাবে আমাদের প্রিয় পৃথিবী। রক্ষা পাবে মানবসভ্যতা।
বিজ্ঞানী আবদুর রহিম বললেন, এবার বিষয়টি আমিও ঠিক বুঝতে পেরেছি স্যার।
বিজ্ঞানী জামসেদ বললেন, রহমত স্যার আমার মনের কথাটিই বলেছেন। এ কাজের জন্য আমরা ইতিমধ্যে আমাদের আবিষ্কৃত উপগ্রহ-৯৯ কে কাজে লাগাতে পারি। কারণ উপগ্রহটির ভর ওই গ্রহাণুর ভরের প্রায় দ্বিগুণ। দ্বিগুণ ভর সম্পন্ন উপগ্রহটির যদিও গতিবেগ কিছুটা কম। এটা কোনো সমস্যা নয়। আমরা যদি এর গতিবেগ বাড়াতে পারি, তাহলে উপগ্রহ-৯৯ ই পারবে এ বিপর্যয় ঠেকাতে। এখন আমাদের উচিত এর গতিবেগ দ্বিগুণ করার ব্যাপারে কাজ করা।
বিজ্ঞানী জামসেদের কথাগুলো বাকি দুজনেরও মনপুত হলো। তার পরের সপ্তাহ থেকেই তারা কাজে লেগে গেলেন। বছরখানেকের মধ্যেই মোটামুটি তারা সাফল্যের মুখ দেখে ফেললেন। তারা উপগ্রহ-৯৯ কে অত্যধিক ক্ষমতা সম্পন্ন উপগ্রহে উন্নীত করলেন। পরে তারা এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে লেগে গেলেন। পরীক্ষায়ও তারা চমৎকার ফলাফল পেলেন। পরে তারা উপগ্রহটিকে আরও আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। তাতে আরও উন্নততর প্রযুক্তি সংযুক্ত করলেন।
তার প্রায় আড়াই বছর পর একদিন তারা আন্তজার্তিক এক জার্নালে ঘোষণা দিলেনÑতাদের এ মহা সাফল্যের কথা। শুনে পৃথিবীবাসী যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে মানবসভ্যতা। রক্ষা পাবে পৃথিবী। ভাবা যায়!
তারও প্রায় মাস তিনেক পর একদিন বিজ্ঞানী তিনজন তাদের আবিষ্কৃত উপগ্রহ-৯৯ কে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাকাশে প্রেরণ করলেন। উপগ্রহটি বিজলি বেগে ছুটে চলল মহাকাশের গ্রহাণুটির পানে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই পৃথিবীর বাইরে গ্রহাণুটির সাথে এর বিরাট এক সংঘর্ষ ঘটার কথা। সেই সংঘর্ষের পর গ্রহাণুটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে অণু-পরমাণুতে বিভক্ত হয়ে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়বে। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ স্তরের বাইরেই ঘটনাটা ঘটবে। তাই এতে পৃথিবীর কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকবে না। ফলে রক্ষা পাবে পৃথিবী। রক্ষা পাবে মানবসভ্যতা। যদি তা-ই হয়, কী মজার ব্যাপারই না হবে। ভাবুন তো একবার বিষয়টা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT