পাঁচ মিশালী

নগর সভ্যতার আবর্জনা সমাচার

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৫-২০১৮ ইং ০০:৪৬:০৩ | সংবাদটি ৩২ বার পঠিত

গ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে শহর ও নগরে এসে ভার জমানো আর নিত্য বসবাসরত মানুষদের আমরা শহরবাসী নাগরিক বলেই জানি। প্রাথমিক ধারণাটা থাকে এরকম, শহর মানে সুন্দর এক জায়গা যা বাসযোগ্যতায় গ্রামের কাদাজল ভরা পথঘাট থেকে পথিককে অধিক সুস্থ ও সুন্দর পথ দেখায়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ শিখছে আর কম গতির চাকাকে করেছে গতিশীল। সময়ের প্রয়োজনে পৃথিবীজুড়ে নগর সৃষ্টি হয়েছে, আধুনিক সভ্য মানুষজন গড়ে তুলেছে নগর সভ্যতা। মানুষ গড়েছে বড় বড় রাস্তা, বাজার এবং বিশালাকারের ভবন। আমাদের এই দেশটিও উঁচু দালানের নাগরিক সভ্যতায় পিছিয়ে নেই। তা কেমন আছি এই আমরা? এই প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসুন এক টুকরো এই নগর জীবনে আমরা কতোটা সুন্দর আছি আর কতোটা সুস্থভাবে জীবন যাপন করছি দেখে নেই।
এই শহরস্থ আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক ভবন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, বিদ্যালয়, দোকানপাট ও বসতি এলাকাজুড়ে যতো মানুষের বসবাস তাদের প্রত্যেকের খাওয়া দাওয়া ও নিজ ব্যবহার্য দ্রব্যাদির উচ্ছিষ্ট ও অব্যবহার্য অংশই হচ্ছে নিত্য দিনের আবর্জনা বস্তু। এসব আবর্জনা কেউ ঘরে নিয়ে বসে থাকে না। ফেলে দেয়া হচ্ছে। কেউ কেউ ফেলছেন সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক বিভিন্ন ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট করে দেয়া ডাস্টবিনে। তবে অধিকাংশই ফেলে দিচ্ছেন বাসার সামনের রাস্তায় অথবা পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পানি নিষ্কাশন ড্রেনে। এতে করে পায়ে চলার পথ কিংবা রিক্সা, গাড়ির চাকা ঘুরার পথে দিনে দিনে জমা হচ্ছে আবর্জনা। তারপর পচে গলে বের হচ্ছে দুর্গন্ধ। মাছিদের ভনভন এবং সেই সাথে এই মাছির পায়ে লেগেই তা যাচ্ছে আপনার দামি পানির গ্লাসের মুখে। আপনি খাচ্ছেন অদেখা পচা ময়লা। যা হবার তাই হচ্ছে। অসুখ লেগেই আছে। হয়তো মাছ বা মুরগির নাড়িভুঁড়ি কোনো কাক ছোঁ মেরে নিয়ে উড়ে গিয়ে বসেছে আপনারই ছাদে কিংবা উঠানের তারে টানানো দামি ডিটারজেন্ট পাউডারে ধোয়া কাপড়ে। অনেকে পলিথিন ব্যাগ ভরে ড্রেনেই ফেলছেন। এতে করে ড্রেনের স্বাভাবিক গভীরতা ধীরে ধীরে কমছে। আবার অপচনশীল পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল, কাঁচের বোতল, সাইকেলের টিউব, টায়ার, সিট কভার, জুতা, ভাঙা টাইলসের টুকরা ইত্যাদি ড্রেনে ফেলে দেয়ার ফলে একদিকে ড্রেন সংকুচিত হচ্ছে, পাশাপাশি ড্রেনের পানির নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখানেও পচনধরা পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। আর হেমন্ত, শীত ও বসন্তের বাতাসে ঘরে দুর্গন্ধই আসে। পথ চলতে গেলে নাকে মুখে রুমাল দিয়ে হাঁটতে হয়। আমি যখন লিখছি তখন ফাজিলচিস্ত আবাসিক এলাকার ড্রেনে আর ময়লা ধরে না এবং পানি নিষ্কাশন বন্ধ আছে প্রায় পনের দিন যাবৎ। ওইসব নোংরা ময়লা নিয়ে কোনো পোকা এসে বসে আমাদের আদরের বাচ্চার ঠোঁটে বা গালে। আর বর্ষার সামান্য বৃষ্টিতে নর্দমার ইঁদুর পচা পানি উঠে আসে রাস্তায়, যা পায়ে পায়ে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাহলে নগর মানে যে এক সুন্দর বাসযোগ্য পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর জায়গা সেটা কোথায়?
কেন এমনটি হচ্ছে? আমার সরেজমিন ঘুরে দেখা অভিজ্ঞতা বলছে, প্রথমত প্রতি ওয়ার্ডের মহল্লা হিসাবে ডাস্টবিন অপ্রতুলতা, দ্বিতীয় শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত নগরবাসীর অসচেতনতা, তৃতীয়ত আমাদের সিটি কর্পোরেশনের তৈরি নর্দমা বা পানি নিষ্কাশনের জন্যে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি ঢাকনা বিহীন ড্রেন। এখন সহজেই চিহ্নিত হলো সমস্যা। তাহলে সমাধানের পথে যেতে হবে। নাগরিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের বুঝতে হবে আমাদের সুস্থতার জন্যে প্রয়োজন সুস্থ সুন্দর পরিবেশ। আমাদেরকে জানতে হবে ড্রেন মানে ডাস্টবিন নয়। এটি মূলত বাসার বাথরুমের আর রান্নাঘরের পানি ও বৃষ্টির পানি সহজে প্রবাহিত হবার নালা, এটি কোনোভাবেই ময়লার ভাগার নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শহুরে লেখাপড়া জানা মানুষের মাঝেই এই বোধের ঘাটতি লক্ষ্যণীয়। এ আমাদেরই লজ্জা। প্রায় প্রত্যেক মহল্লায় সামাজিক উদ্যোগে ময়লার ছোটো ভ্যান আছে। সেখানেও টাকার ব্যাপারটা অনেককে নিরুৎসাহিত করে। তাই প্রত্যেক ওয়ার্ডের মহল্লাগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত ময়লার ডাস্টবিন গড়ে তুলতে হবে।
নগরবাসী সিটি কর্পোরেশনের কাছে এ দাবি করতেই পারে। তবে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে কেউ ডাস্টবিনের বাইরে ফেলতে না পারে। এতে অধিক বেকারদের দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এখন আসি অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ প্রসঙ্গে। সাধারণত আমাদের শহরের ড্রেনের উপরেই আমাদের ফুটপাত। শহরের অলিগলি মিলিয়ে খুব কম সংখ্যক ড্রেন আছে যেগুলো ঢাকনাওয়ালা। যদি ড্রেন নির্মাণ প্ল্যান করার শুরুতেই ঢাকনাসহ নির্মাণের প্ল্যান করা হয়, তাহলে ড্রেনে কেউ পলিথিন বা অন্যান্য বস্তু ফেলার সুযোগ পাবে না। এতে করে পথচারীদের হাঁটার সু-ব্যবস্থাও হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কাজ হবে এসব বিষয়ে পাড়ায় পাড়ায় জন সচেতনতা মূলক কর্মশালার আয়োজন করা।
শহর নগরের আবর্জনা বিষয়ক এবং ফুটপাত, ড্রেন ও ডাস্টবিন সংক্রান্ত অপরিকল্পিত নগরায়নের জটিলতা সারা দেশের এক ভয়াবহ চিত্র। এ নিয়ে আমাদের দুঃশ্চিন্তার কোনো কূল কিনারা হচ্ছে না, বছরের পর বছর ধরে চলছে আবর্জনায় মাখামাখি করে চলা। এসব বিষয়ে দীর্ঘ লেখা তুলে ধরার আর প্রয়োজন বোধ করি না। আমার সংক্ষিপ্ত চিন্তাশক্তি যথাযথ কর্তৃপক্ষীয় বিবেচনায় নিলে সকল নগরের নাগরিক জীবনে কিছুটা শান্তি আসবে মনে করি। আমাদের বোধ শক্তি জাগ্রত হোক। আসুন সকলে মিলে সুন্দর ফুটপাত, রাস্তা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়, সুস্থ পরিবেশে এবং সচেতন নাগরিক সমৃদ্ধ এক নগরে আমরা করি বসবাস।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT