পাঁচ মিশালী

মায়ার বন্ধন

মো. মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৫-২০১৮ ইং ০০:৪৬:৪০ | সংবাদটি ৯৩ বার পঠিত

প্রতিদিনের মতো আজও সময় কেটে যায় কিন্তু গরুগুলিকে সময় মতো ঘাস, খড় দেওয়া হয় না। গরুগুলি ক্ষুধা লাগলে শুধু বেঁ... বেঁ... করে শব্দ করে। কিন্তু ঘাস দেয়ার যে মানুষটি সে মানুষ আজ আর নেই। তিনি পৃথিবীর সব মায়া কাটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। অসীমের মা হঠাৎ মৃত্যু বরণ করায় গরুগুলির এহেন অবস্থা। অসীম প্রতিদিন হাওর থেকে ঘাস নিয়ে বেলা ৮টায় বাড়ি ফিরে। তারপর হাত, মুখ ধোয়ে কিছু খেয়েই তার কাজে চলে যায়। অসীম রাজ মিস্ত্রীর কাজ করে। সে বেগ কাঁধে করে আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরবে। রাজ মিস্ত্রীর কাজ আর গাভী গরুর দুধ বিক্রি করে অসীমের সংসার কোনো রকম চলছিল। হঠাৎ তার মা মারা যাওয়ায় গাভীগুলির খাওয়া ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে না।
একদিন অসীম দেখল গাভীগুলো বিক্রি করা ছাড়া কোনো পথ নেই। তার ছোট বোন করিমা অবিবাহিত, বয়স ১৪ বছর। সে দেখল গাভীগুলো বিক্রি করলে ভাইয়ের সংসারে অভাব নেমে আসবে, তাদের খাওয়া পরায় কষ্ট হবে। করিমা নিজ থেকেই বলল : অসীম ভাই আমি ঐ আগলা ঘরে গিয়ে গাভীদের ঘাস দেব এবং দুধ দোহন করব তুমি কিন্তু না কর না। অসীম বলল, নারে তুই আমাদের একমাত্র বোন, তুই আমাদের বড়ই মায়ার, তোকে কষ্ট দিলে আমাদের মায়ের আত্মা কষ্ট পাবে তাই তুই এ কাজ করবি না। করিমা বলল, গরুগুলি যে শুধু বেঁ... বেঁ... করে, দুধও কম দেয় তাই এদের ঠিকমতো ঘাস দিতে হবে। অসীম আর কোনো কথা বলে না। করিমা বুঝল আলগা ঘরে গিয়ে ঘাস দিতে অসীম ভাই মৌন সম্মতি দিল। বাপরে বাপ প্রথম দিনই গাভীগুলি গোয়াল ঘরে নতুন মানুষ দেখে এক লাফ দিয়ে রশি ছিড়ে করিমাকে গুতো দিল, করিমা আহত হলো। সন্ধ্যার সময় অসীম বাড়ি ফিরে একা- দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। আজ সে কাজের টাকাও পায়নি, কি করে বোনের চিকিৎসা করাবে। অসীমের ছিল সঞ্চয়ের অভ্যাস। ঘরের বাঁশের খুঁটিতে সে ছিদ্র করে ব্যাংক আকারে টাকা পয়সা রাখত। সেই বাঁশের ব্যাংক দা দিয়ে কেটে বোনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করল।
করিমা সুস্থ হতে ৩/৪ দিন সময় লাগল। অসীম তার মায়ের অনুপস্থিতির গুরুত্ব করিমার মধ্যে খোঁজে পেয়েছিল। কিন্তু করিমাও এখন শয্যাশায়ী। করিমা সেরে ওঠার পর অসীম গাভীগুলির সাথে তার বোন করিমাকে পরিচয় করে দিতে চায়। করিমা তাতে সাহস পায় না। এভাবে একদিন দুইদিন করে করিমাকে তার সাথে করে নিয়ে গাভীর সামনে দাড় করিয়ে রাখতে রাখতে গাভীগুলি করিমাকে চিনে ফেলে। এখন করিমা দুধ দোহন করে ও সামনে গিয়ে ঘাস দেয়।
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান ওরা তাই সংগ্রাম করে জীবন যোদ্ধা হয়ে সম্মানের সাথে বাঁচতে চায়। কারো কাছে হাত পাততে লজ্জাবোধ করে। করিমা দুধ দোহন করে গ্রাহকদের দুধ বোতল ভর্তি করে রাখে। অসীম সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে যার যার দুধের বোতল পৌঁছে দেয়। মাসের শেষে টাকা পেয়ে তার বোনকে সুন্দর একটি থ্রী পিছ কিনে দেয়। ভাই-বোনের এমন মায়া মমতা দেখে সবাই খুশি। অসীম ও করিমার মায়ার বন্ধন দেখে পড়শীরাও শিক্ষা নিতে থাকল।
একদিন অসীম দেখে করিমা তাড়াহুড়া করে বোতল গুলি নোংরা পানিতে পরিস্কার করছে। সে ক্ষিপ্ত হয়ে ছোট বোনকে গালমন্দ করে একটা থাপ্পড় মেরেছিল। ওমনি করিমা রেগে গিয়ে ঘরে খাওয়া ছেড়ে দেয়। অসীম আদর দিয়ে মিনতি করে বোনের রাগ ভাঙাতে ব্যর্থ চেষ্টা করে। সে রাত অসীমও রাগ করে ভাত খায়নি। সে বলেছে আমার একটি মাত্র বোন সে না খেলে আমিও খাব না। মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে সে ভাত খাবে না, বোনকে নিয়েই সে খেতে চায়। করিমা ভীষণ আঘাত পেয়ে তার খালার বাড়ি চলে যায়। পার্শ্ববর্তী গ্রাম, অসীমও সে বাড়ি গিয়ে হাত জোড় করে আর তাকে আঘাত করবে না বলে মিনতি করে। করিমা, ভাইয়ের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। ভাইয়ের এমন মায়ার বন্ধন সবাইকে আনন্দ দিয়েছে। পিতৃহীন পরিবারে ভাই-বোনের মায়ার বন্ধন সবার কাম্য।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT