সাহিত্য

পেছনে তাকাতে ভয়

নৃপেন্দ্রলাল দাশ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৫-২০১৮ ইং ০১:৪৩:৩৯ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

আমার আয়ূ যখন সত্তরের কোটায় এসে পৌঁছেছে, তখন আমার মায়ের মতোই কিছু জিনিস আমাকে তাড়িত করে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার পা-ুলিপিতে দেখেছি কত পরিবর্তন ও পরিমার্জনা করতেন। কত শ্রম, নিষ্ঠা ও আনন্দ বিনোদ ছিল তুঙ্গতম নান্দনিকতায় যাওয়ার- আর আজ যখন দেখি মোবাইল ফোনের ক্ষুদ্র পরিসরে তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা লেখা হচ্ছে। ইন্টারনেটে, লেপটপে ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য কবিতা। পাঠক হিসেবে সে সব কবিতা পড়ে মুগ্ধ হই না। সেই কবিতায় দ্রুততা আছে, দ্যুতি নেই। অপূর্ব নির্মাণকলা নেই। পড়ে অসহায়বোধ করি।
তথ্য প্রযুক্তির এই রাজসুয় যজ্ঞে নিজেকে বড়ই তুচ্ছ মনে হয়। আমার তো ভালো লাগে ষোলবার সংশোধনের পর লেখা জীবনানন্দের কবিতাই। আমার মনে পড়ে আফ্রিকার সেই বৃদ্ধার কথা। সরকারিভাবে ফরাসী ভাষা দেশে চালু হওয়ার অন্য সব ভাষা বাতিল হয়ে গেলে সেই অসহায় নারী শুধু বিলাপ করে বলেছিল আমার মাতৃভাষা ছাড়া আমি যে আর কিছুই জানি না। তোমরা আমাকে জঙ্গলে ছেড়ে দাও- আমি পশুদের সঙ্গেই বাস করবো। আমার অবস্থাও অনেকটা সে রকম।
আমার মায়ের যেমন পুকুরের জল, আমার তেমনি কলম। কম্পিউটার নয়-ই-বুক নয়। শ্রীমঙ্গলের আমার আত্মজনেরা একটি বই বের করেছেন। সেখানে আমার সাহিত্যকর্মের উপর মেধাবীজনদের মূল্যায়নধর্মী লেখা আছে। আমি বিস্মিত হয়েছি। যখন শুনতে পাই যে, ‘রিডিং হ্যাবিট’ কমে যাচ্ছে, মানুষ নতজানু হয়ে আছে যাদুর বাকসের কাছে, আকাশ সংস্কৃতির কাছে। প্রিন্ট মিডিয়া এখন দুয়োরানী। ইলেকট্রনিক মিডিয়া এখন সুয়োরানী। সে বইকে বনসাই বানিয়ে দিচ্ছে। মানুষকে বানাচ্ছে রোবট। অযান্ত্রিক এই ইলিশের দেশে যান্ত্রিকা মুছে ফেলছে সব রকম রক্ত সম্পর্ক। ধনী পুঁজিবাদী দেশে আর কবিতা লেখা হয় না। সুকুমারবৃত্তি মরা শ্যামাপোকার মতো গিয়ে লেপ্টে আছে চেক বইয়ের পাতায়, মনের মলিন অলিন্দে।
এই যে সমসাময়িকদের আলোচনা, সে সম্পর্কে ১৮২১ সালে কবি শেলী যখন লেখেন ‘এ ডিফেন্স অব পোয়েট্রি’- যা তাঁর মৃত্যুর ১৮ বছর পর প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে তিনি লিখেছেন-
‘সমসাময়িক আলোচনা ভুলের পাহাড় ছাড়া আর কিছু নয়, যার সঙ্গে প্রতিভাবানকে সারাক্ষণ কুস্তি লড়তে হয়।’ শেলী রাষ্ট্র কিংবা সমাজ, ব্যক্তি অথবা সংস্থা সবার কাছ থেকে বঞ্চিত হয়েই এসব কথা বলেছিলেন। আমি যদিও রাষ্ট্রীয় কোন সম্মাননা পাইনি- ‘তবু ব্যক্তিগত ভালোবাসা পেয়েছি প্রচুর। সে কারণে শেলীর মতো এত আগ্নেয় উচ্চারণ করতে পারি না। বায়রন ১৮১৩-এর ২৮ নভেম্বরে তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন- ‘আজকাল দালালদের তুলনায় লেখকদেরও কেউ কেউ খাতির করছে এটা দুর্লক্ষণ।’ আমিও বিশ্বাস করি- শুধু ভোটার প্রসবিনী এই দেশে কবির বড় শত্রু করতালি। অন্ধ করতালির কাছে বধির হতে চাই না। করতলে মহাদেশকে ধারণ করতে চাই।
নিন্দা অথবা প্রশংসার কোনো সম্মোহনের কাছে পরাজিত হতে চাই না। পদক, পুরস্কার ও পাদুকাকে অস্বীকার করে লিখে যেতে চাই।
এই সভায় বসে যখন পেছনে ফিরে তাকাই, আমি বড্ড স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি- নষ্টালজিয়াগ্রস্ত হয়েছি। ১৯৭০ সালে আমার প্রথম কবিতার বই বের হয়েছিল সিলেটের গীতাপ্রেস থেকে। চালিবন্দরে এই প্রেস স্থাপন করেছিলেন নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী গরিব মেয়েদের কর্মসংস্থান করার জন্যে। সেখানে দেড়শত টাকা দিয়ে ছেপেছিলাম ‘রম্যানি রুচিরা’। তিন কিস্তিতে টাকা শোধ করেছিলাম। গোঁসাইদা জানতেন না, ম্যানেজার যশোদা বাবুর সঙ্গে গোপন চুক্তি হয়েছিল। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কবি বন্ধু মানস পাল। দ্বিতীয় বই ‘অনীহার অন্ধকারে আমি’ প্রকাশ করেছিল আমার ক্ষণিকের বন্ধু মাসুকুর রহমান চৌধুরী। দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন ছিল। সে মধ্যপ্রাচ্যে ছিল। তাঁর অন্তিমকালে আবার খুঁজের পাই সেই বন্ধুকে কুলাউড়ার আশ্রয়গ্রামে পরের বাড়িতে থেকে কবিরাজী করতো। দারিদ্রপীড়িত, অক্ষম সেই কবিতাপ্রেমীর মৃত্যুর পর আমি জানি যে মাসুক কত নিঃস্ব ছিল। বেদনার বুকে পাথর জমে যায় আমার। যখন শেষ দেখা দেখতে যাই আমার হাতে রণেশ দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ দাশের কাব্যসম্ভার’ বইটি দেয়। ‘অনীহার অন্ধকারে আমি’ বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিল আমার বন্ধু কবি আলতাফ হোসেন চৌধুরী। আমার কাব্যনাটক ‘দাঁড়াও দুঃখ’ প্রকাশ করেছিল বীরেন পাল, নবীগঞ্জের আউশকান্দির ছেলে। পরে প্রকৌশলী হয়। এত বছর পর লক্ষ্য করি যে কোন সংস্থা বা প্রকাশক নয় আমার বই বের হয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, ব্যক্তিগত ভালোবাসায়। গদ্য গ্রন্থের অন্যরকম অভিজ্ঞতা। সবই বের হয়েছে ঢাকার অভিজাত প্রকাশনা থেকে।
আমার পঞ্চাশ বছরপূর্তিতে শ্রীমঙ্গল থেকে বের হয়েছিল ‘ভাসো, পঞ্চাশের ভেলা’ তার সঙ্গে যুক্ত ফনীদা ও এ কে আনাম ভাই আজ নেই। রব্বানী চৌধুরী আমাকে লন্ডন থেকে এসে আবিষ্কার করেন। আমার জীবনী লেখেন। ড. তপন বাগচী আমার বাসায় থেকেই লেখেন আমার সম্পর্কে বই। কবি অধ্যাপক শাহজাহান হাফিজ সর্বপ্রথম আমার কবিতা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা লিখেছেন। (এই প্রেক্ষাভূমির উপর আজ স্থাপিত হলো- ‘ভাবে বিভাবে।’ মৃদুলকান্তি পাল মলয় একদিন আমার বাসায় আসে এই প্রস্তাব নিয়ে- সে সভা আহ্বান করে গঠন করে পরিষদ। সবার নাম বলার সুযাগ নেই তবু বলি দ্বীপেন্দ্র ভট্টাচার্য, অবিনাশ আচার্য, জহর তরফদার, ড. মোতাকাব্বির মাসুদ, কমলকলি চৌধুরী প্রমুখ যুক্ত হন। সকলের সমবেত চেষ্টা ও সমবায়ী মানসতা এই বই প্রকাশ্যে ভূমিকা রাখে। আজকের প্রকাশনা উৎসবে যোগ দিয়েছেন ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, মিহিরকান্তি চৌধুরী, অপূর্ব শর্মা, পুলিন রায়, জাফর ওবায়েদসহ অনেক আত্মজন সকলের নাম উল্লেখ করা গেল না-তাই ক্ষমা প্রার্থী, শ্রীমঙ্গলের সকল স্বজনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এই সঙ্গে স্মরণ করি চ্যানেল ‘এস’-কে সুভাষ পাল কানুকে যারা আমার জীবন ও কর্মবিষয়ে ২২ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন অপূর্ব নান্দনিক স্থাপত্যে।)
আমার কবিতা বিষয়ে দু’টি অভিযোগ শুনতে পাই- একদল মনে করেন, আমি আস্তিক্যবুদ্ধির মানুষ, তাই বর্জনীয়। ধর্মগ্রন্থের নান্দনিকতায় আমি মুগ্ধ পাঠক। আমি চাই আমার লেখায় সেই মুগ্ধতাকে ছড়িয়ে দিতে। আমার প্রজ্ঞাপারমিতাকে কলাকৈবল্যবাদের মোহগর্ত থেকে বের করে এনে মানুষের দিকে ধাবিত করতে। আস্তিকতার দিকে নয়-আমার অভিগমন ক্ল্যাসিকেলের দিকে। এই পরিপ্রেক্ষণীকে অনেকেই ভুল বুঝেন। অন্য শিবিরের অভিযোগ, আমার লেখা দুর্বোধ্য। গজদন্তমিনারবাসীর মতো আমি অনেক শব্দ ব্যবহার করি যা বহুকাল আগেই অভিধানে গঙ্গাপ্রাপ্ত হয়েছে। ধর্মের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে নিরীক্ষা কবি বলে কেউ কেউ কটাক্ষও করেন আমার সৃজন অস্মিতাকে।
আমার জীবনের এক স্মরণীয় ঘটনা- বলা উচিত স্মরণীয়তম- আজকের দিনটি। যতদিন বেঁচে থাকবো, মনে রাখবো এ দিনের সুখস্মৃতিকে। ‘কবি নৃপেন্দ্রলাল পরিষদ’ গঠন করে শ্রীমঙ্গলের আমার আত্মজনরা আমার প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন- সেটা নতজানু হয়ে মাথা পেতে নিয়েছি আর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যতদিন বেঁচে থাকবো লিখে যাবো। আপনাদের ¯েœহকে শৌভনিক করে তুলবো। রাজধানী কেন্দ্রিকতার বাইরে, মিডিয়ার নেটওয়ার্কের দূরবর্তী এক ক্ষুদ্র লেখক আমি। পদ ও পুরস্কারের নেপথ্যে থেকে সত্তর বছর বয়সে রিক্ত হাতে জরার শেষ প্রান্তে উপনীত হয়েছি। রাজনীতির মুনাফাভোগী নই, রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মাননার প্রত্যাশী নই, আপনাদের ভালোবাসাই আমার পাথেয়। আমি কোনো দলের নই, কোনো ডগমার গাধাবৃত্তিও করি না। ফলে নিঃসঙ্গতাই আমার আশ্রয়।
কবিতাই আমার আয়ূধ। সুখ দুঃখের অবলম্বন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ব্যক্তির সহায়তাই আমাকে প্রকাশের সুযাগ করে দিয়েছে, কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা নয়। আমি ও এলিয়েটের মতো বিশ্বাস করি- ‘চড়বঃৎু ংযধষষ ফড় যিধঃ ধষড়হব ঢ়ড়বঃৎু পধহ ফড়.
আমার একটা স্বপ্নসাধ আছে, যখন দেহযন্ত্র লুঠিয়ে পড়বে এই ইলিশের দেশে, তখনও যেন আমার হাতে থাকে একটি কলম। সাতগাঁও পাহাড়ের আদিম লতাগুল্ম যেন হয় আমার কবিতার এপিটাফ, হাইল হাওরের আবর্তমুখর পানি যেন বার বার আমার শৈশবকে ডেকে আনে। চা-পাতার একটি কিশলয়ে যেন আঁকা হয় আমার আত্মপ্রকৃতি। বরকত প্রসবিনী বাংলায় জন্মে জন্মে যেন কবি হয়ে আসি। সুরমা নদীর প্রবাহের মধ্যেই যেন খুঁজে পাই অমরতাকে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT