সাহিত্য

তুমি আমার পূর্ণিমার চাঁদ

ডা. এম এ সালাম প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৫-২০১৮ ইং ০১:৪৮:০৬ | সংবাদটি ২৩২ বার পঠিত

জন এফ ক্যানেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা। তরুণ প্রফেসর ডা. নাইমুর রসিদ অপু, দারুণ হ্যান্ডসাম, কাঁধে একটি ছোট্ট এয়ারব্যাগ ঝুলিয়ে খুশ মেজাজে ডিপারচার লাউঞ্জে পায়চারী করছিল। ফ্লাইটের এখনও পঁচিশ মিনিট বাকী। লাউঞ্জে যাত্রীদের দারুণ ভীড়। অপুর মনে হলো তার একটু বাথরুমে যাওয়া দরকার। গ্লাসের দরজা পুল করে ভিতরে ডুকেই পরমা সুন্দরী তার মতো টলফিগারের এক এয়ার হোসটেস এর সাথে ধাক্কা। হোসটেস পিরিচের উপর বসিয়ে রাখা এক গ্লাস পানি নিয়ে যাচ্ছিল। ধাক্কা লেগে পানি তার চোখ, মুখ এবং শাড়ির বুকের দিকের কিছুটা অংশ ভিজে গেল কিন্তু গ্লাসটি পড়তে পড়তে অপু লুফে নিল। অপু ভেস্িেছল মেয়েটি খুব রাগ করবে এবং তাকে বকা দেবে। কিন্তু না, মেয়েটি ছোট্ট একটি মায়াবী হাসি দিয়ে বলল: আই এ্যম ভেরি স্যরি ফর দ্য ইনসিডেন্ট। দিন, গ্লাসটি দিন। অপু বলল: দিচ্ছি। আগে আপনি হাত মুখ মুছে শাড়িটি ঝেড়ে নিন। অনেকটাই ভিজে গেছে। মেয়েটি তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়ে দ্রুত হাত মুখ মুছে শাড়ি ঝেড়ে জ্যোৎ¯œাঝরা হাসি দিয়ে বলল: সত্যি করে বলুনতো ইচ্ছে করে ধাক্কাটা মেরেছেন না-কি অ্যাক্সিডেন্ট। আমার তো মনে হয় আপনি ইচ্ছে করেই নাটকটি তৈরি করেছেন, কোনটা সত্যি? মুচকি হেসে অপু বলল: ম্যাডাম, আমাকে ক্ষমা করবেন। এটা একটা অনাকাক্সিক্ষত ইনসিডেন্ট। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আসলে এটা একটা কোইনসিডেন্ট। হয়ত বিষয়টি এমন হতে পারে আমরা হৃদয়ে ছবি এঁকে পরস্পর পরস্পরকে হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম আর নিয়তি এক ঝটকায় নিজ নিজ মনের মানুষটিকে পাইয়ে দিল। আমার মনে হয় এই কনসেপ্টটি মেনে নিলে আমাদের সামনের পথ চলা সহজ হবে। আমাকে অপু বলে ডাকবে। মুক্তাছড়ানো হাসি দিয়ে হোস্টেস বলল: অপু, খুব মিষ্টি নাম। আমাকে বৃষ্টি বলে ডাকবে। অপু, তোমার বাকপটুতায় আমি মুগ্ধ। আমরা একই ফ্লাইটে লন্ডন যাচ্ছি। দীর্ঘ আটঘন্টা আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে নন্স্টপ জার্নি, প্রচুর সময়, মনখুলে কথা বলব দু’জনে, অনেক কথা। তোমার তো ফাস্টক্লাস, কেবিনে বসবে। অপু শোন তোমার বোর্ডিং কার্ডে যা-ই থাকুক, আমি যে কেবিনে বসতে বলব সেখানেই বসতে হবে।’ অপু উৎফুল্ল চিত্তে বলল: মাই ডিয়ার সুইট বৃষ্টি, তোমার অনুগ্রহ। তুমি যেখানে বসতে বলবে আমি সেখানেই বসব। যদি বল প্লেইনের ছাদে গিয়ে বসে থাক, তাও পারব। নিচে মহাসাগর, উপরে মহাকাশ, মধ্যে মেঘ এবং মেঘ গলে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সোজা হিথ্রু বিমানবন্দর। কি রোমাঞ্চকর আকাশ ভ্রমণ! তবে বৃষ্টি যেখানেই বসাও, সারাপথ কিন্তু সঙ্গ দিতে হবে। বৃষ্টি নিঃশব্দ একটি মায়াবী হাসি দিয়ে বলল: বন্ধু, সঙ্গ অবশ্যই তোমাকে দেব। কবি নজরুলের ভাষায় বলব না: তোমার পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিবনা, কোলাহল করে, সারাদিন কারো ধ্যান ভাঙিব না। কথা বলার জন্যই তো কেবিন চেঞ্জ করলাম। চল টেক্অফ্ এর সময় হয়ে গেছে। তুমি আমার সাথে এসো। জাস্ট ফলো মী।’ অপু ও বৃষ্টি প্লেইনে ইন্ করল। বৃষ্টি অপুকে উনডোর পাশে পর্দা দিয়ে ঘেরা একটি কেবিন দেখিয়ে বলল: এটা তোমার কেবিন। দুটি মাত্র সীট। অপু বলল: বৃষ্টি পাশের সীটে কে বসবে?’ বৃষ্টি নিঃশব্দ হাসি দিয়ে বলল: ওটা সারাপথ খালিই থাকবে। মাঝে, মাঝে আমি এসে বসে গল্প করব। তোমাকে সঙ্গ দেব।’ মুগ্ধ হয়ে অপু বলল: মাই সুইট বৃষ্টি,্ এই সুন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বৃষ্টি বলল: মোস্ট ওয়েলকাম। শোন অপু, এই ফ্লাইটের সুপারভাইজার আমি। এখন গিয়ে এ্যানাউন্সমেন্ট করব। টেক্-অফ্-এর পর হোস্টেসদের জরুরি কর্মকান্ড বুঝিয়ে দিয়ে ইন-ফ্লাইট এ্যানাউন্সমেন্ট দিয়ে ফ্রি হয়ে তোমার কাছে আসব। মন-টি তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি, যতনে ধরে রেখো। তোমার জন্য কফি পাঠাচ্ছি। বসে বসে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাটি পড়।’ অপু বৃষ্টির অসাধারণ লোভনীয় ডান হাতটি ধরে বলল: বৃষ্টি। বৃষ্টি বলল: কি? হাত ধরে বসে আছ, নিশ্চয়ই কিছু বলতে চাও। টাইম শর্ট, তাড়াতাড়ি বল। অপু বলল: না, বলছিলাম তুমি চোখের আঁড়াল হওয়া মাত্র আমার মনোকষ্ট শুরু হয়ে যাবে, আমি একা বসে বসে কি করব? বৃষ্টি তড়িৎ জবাব দিল: জানি। আমার অবস্থা তোমার চেয়েও গুরুতর। কিন্তু কি করব, দায়িত্ব তো ষোলআনা পালন করতে হবে। তবে ঐ যে আগে বললাম, মনটা তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। মনের সাথে কথা বল, ভবিষ্যত পরিকল্পনা তৈরি কর। ঘর তো বাঁধবই। তুমি-আমি দু’জন এক ঘরে, গভীর রজনী, বাতাসে রজনীগন্ধার মন ভোলানো খুশবু, সোহাগরাত, দুজনা মুখোমুখি, ফুলে ফুলে সাজানো পালঙ্ক, কারো মুখে কোন কথা নেই, বলো এই নিঃসীম সোহাগী ক্ষণে কে আগে কথা বলে জড়িয়ে ধরবে। এই চিত্তহরণকারী পরিকল্পনা তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি, তুমি ঠিক কর পরবর্তী ফুলশয্যার রাত কিভাবে উদযাপন করবে। এবার দয়া করে হাত ছাড়, আমি আসি। অপু হাত না ছেড়ে বলল: সুইট বৃষ্টি, তোমার জীবনবোধ অসাধারণ, কাব্যিক এবং সুখস্বপ্নে ভরপুর। আমি এমনটিই চেয়েছিলাম, পেয়ে গেছি। তবে তোমার প্রত্যাশা পূরণে আমি কতটুকু যোগ্য তা তো বললে না। নিঃশব্দ জ্যোৎ¯œাঝরা হাসি দিয়ে অপুর নাকের ডগায় একটি টান দিয়ে বৃষ্টি বলল: আমি ঘুরে এসে সব বলব। তুমি তো পালিয়ে যাচ্ছ না। আর ইচ্ছে করলে পালাতেও পারবে না। তুমি এখন আমার আঁচলে বাঁধা। এ বাঁধন বড় শক্ত, ইচ্ছে করলেই ছিড়তে পারবে না। অপু একটি মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল: বৃষ্টি, আমি তোমার আঁচলে বন্দি হয়ে থেকে জীবন কাটাতে এসেছি, পালিয়ে যাবার জন্য নয়। তা বৃষ্টি ইন-ফ্লাইট সার্ভিসে যাবার আগে আমার কপালে একটি মায়াচুম্বন এঁকে দেবে না? বৃষ্টি বলল: কেন নয়, অবশ্যই দেব। এসো, বলে দু-হাত দিয়ে অপুর গালে চাপ দিয়ে কপালে শব্দ করে একটি সোহাগী কিস্ দিয়ে বেরিয়ে গেল। কেবিনে রেখে গেল তার মোহনীয় শরীরের খুশবু ও ড্রিম্গার্ল পারফিউমের মাতাল করা গন্ধ। অপু বুঁদ হয়ে বসে বসে মিশ্র সুভাস নিতে নিতে বৃষ্টির গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল। কি অপূর্ব অঙ্গসৌষ্ঠব, আকর্ষণীয় হাঁটার স্টাইল। ¯্রষ্টার কাছে সৌন্দর্যের কোন কমতি নেই, যাকে দেন, উজাড় করেই দেন যেমন বৃষ্টিকে দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর মাইক্রোফোনে বৃষ্টির কন্ঠঃ লেডিজ এন্ড জেন্টলম্যান, প্লিজ ফ্যাসেন ইওর সীটবেল্ট, ইন-এ-সর্টহুয়াইল উই শ্যাল-বি-ফ্লাইং অভার দ্য গ্রেট ওসেন আটলান্টিক। দ্য ওসেন ইজ ভেরী র‌্যাফ্। দ্য স্কাই ইজ ভেরী ভেরী ক্লাউডি। ফ্রিকোয়েন্ট জার্কিং ইজ লাইকলি। ডু নট আন-লক ইওর সীটবেল্ট আনটিল ফার্দার এ্যানউন্সমেন্ট। থ্যাংক ইউ অল। উইস ইউ হেপী ফ্লাই উইথ অ্যাস। প্লেইনটি ম্যাক্সিমাম হাইটে উড্ডয়ন করে স্টেইট এয়ারওয়ে ধরে যাত্রা শুরু করলে বৃষ্টি এক প্লেইট স্পেশাল নাস্তা এবং কফি নিয়ে অপুর কেবিনে ঢুকল। অপু দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। বৃষ্টি এক ঝলক হেসে অপুর নাকের ডগায় টান দিয়ে বলল: কী আমাকে উন্মুক্ত আকাশে ছেড়ে দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছ। অপু চট নড়ে চড়ে বসে বৃষ্টির হাত ধরে টেনে পাশের সীটে বসিয়ে বলল: লক্ষ্মী আমার সোনা, আমার হৃদয়ের স্পন্দন বৃষ্টি, আমি ঘুমে ছিলাম না, আমি ঘুমের ভান করে, অন্ত:দৃষ্টি দিয়ে তোমাকে ফলো করছিলাম। কারণ, এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। বউ-কে একা আকাশের হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে বসে হুক্কা টানতে পারি না। বৃষ্টি মাধুর্যমন্ডিত একঝলক হাসি দিয়ে বললঃ আচ্ছা, তাই বুঝি। তাহলে বলোত এতক্ষণ ভিতরে আমি কি করছিলাম? অপু বলল: যতদূর আমার অন্ত:র্দৃষ্টি দেখেছে, দুই আইল্যান্ডের মাঝ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাত্রীদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করছিলে, কলিগদের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছিলে এবং অবশেষে কফি নিয়ে আমার প্রিয়া, আমার ঘরে বধুবেশে এসে আমার পরিচর্যা করছে। বৃষ্টি বাঁধা দিয়ে বলল: এ্যই থাম থাম। অপু টাইপের লোকেরা বোধ হয় বেশি কথা বলে, তাও বানিয়ে বানিয়ে গল্প তৈরি করে। যেমন আমার হবু বর, লক্ষ্মী অপু। ধর, ব্রিটিশ বার্গার খাও, এগুলো আমরা ইন-ফ্লাইট তৈরি করে পরিবেশন করি। কফির সাথে খাও, খুব ভালো লাগবে। বার্গার খেতে খেতে অপু বলল: বৃষ্টি শুভ কাজে দেরী করতে নেই। সময়ের অপেক্ষা আমার অসহ্য লাগছে। তুমি একটু খুঁজ নিয়ে দেখ যাত্রীদের মাঝে কোন কাজী সাহেব আছেন কি-না। থাকলে আমাদের বিয়েটা আটলান্টিক মহাসাগরের উপরেই সেরে ফেলতে চাই। একটা নতুন ইতিহাস তৈরি করতে চাই। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম এই ইতিহাস পড়ে উজ্জীবিত হবে এবং অনাদিকাল আমাদেরে স্মরণ করবে।’ বৃষ্টি বলল: আমার লক্ষ্মী অপু, বিলম্ব আমারও সহ্য হচ্ছে না। কাজটি করতে পারলে ভালোই হত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিয়ে করে প্লেইনের ভিতর ফুলশয্যার তো কোন ব্যবস্থা নেই। বিয়ে করলাম কিন্তু সোহাগ রাত পালন করতে পারলাম না, এই অসহনীয় যন্ত্রণা কি দিয়ে লাঘব হবে। অপু বলল: বৃষ্টি ওগুলো কোন ফ্যাক্টর নয়। আমি ম্যানেজ করতে পারব। কিন্তু তুমি তো সারাক্ষণ আমার পাশে থাকতে পারছ না। ঘনঘন অবজারবেশনে যাচ্ছ। ইন-ফ্লাইট সার্ভিস দিচ্ছ। এ্যানাউন্সমেন্ট করছ। সার্বিক তদারকি করছ। তোমার ফুলশয্যার সময় কই? বৃষ্টি বলল: আমার লক্ষ্মী অপু, আমি চাই বধুবেশে ফুলশয্যার রাতে দুজন সামনা-সামনি বসে তোমার চোখে চোখ রেখে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করব। আমার স্বপ্নের কথা বলব। ভালোলাগার কথা বলব। প্রত্যাশার কথা বলব। তোমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বহুক্ষণ দেখব। তোমার তপ্ত গায়ের সেক্সি গন্ধ শোকব। তোমার চাওয়া-পাওয়ার কথা জানব। কেমন সংসার হবে তার পরিকল্পনা করব। আমার এই প্রগাঢ় আবেগ উষ্ণ থাকতে থাকতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসব আমরা। কোন অজুহাতেই সময় নষ্ট করব না। আর সময় নষ্ট না করার যথেষ্ট কারণও আছে, আমার মনোকষ্টের বিষয়টি তোমাকে বুঝিয়ে বলব কাল লন্ডন পৌঁছে তোমার বাসায় বসে। যে মনের মানুষটি, যার ছবি আমার হৃদয়ে অঙ্কিত, যার জন্য হন্যে হয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরছিলাম, তাকে যখন পেয়ে গেছি তখন একদিনও আর বিলম্ব নয়। অপু, তুমি শুধু আমার। তুমি আমার স্বপ্নের রাজকুমার। শয়নে স্বপনে সারাবেলা, সারাক্ষণ আমার। শুধু আমার। অপু আবেগে আপ্লুত হয়ে তড়াক সীট থেকে উঠে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে ওঠে একটি সোহাগী কিস্ দিয়ে বলল: বৃষ্টি তোমার চমৎকার ইচ্ছেগুলোর কথা শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমি দেখলাম, আমার প্রত্যাশার কথাগুলো তুমি তরতর করে দিব্যি বলে যাচ্ছ, এমনটি মনে হলো যেন আমার হৃদয়ের অঙ্কিত ভাষাগুলো তুমি দেখে দেখে পড়ছ। এর অর্থ হচ্ছে বিয়ের এখনই সময়।
সন্ধ্যা সাতটায় হিথরু বিমানবন্দরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের প্লেইনটি ল্যান্ড করল। প্লেইনটি বোর্ডিং ব্রিজে এসে হল্ট করা মাত্র বৃষ্টি দ্রুত অপুর কেবিনে এসে তার কপালে একটি মায়াবী চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল: অপু, প্লেইন লীভ্ করতে আমার অনেক দেরী হবে। তুমি এ্যরাইভাল লাউঞ্জ দিয়ে বেরিয়ে যাও। কাল আমার অফ। আমি বিকালে তোমার বাসায় আসব। কি জানি বলছিলে, নব্বই ফুলডার স্ট্রীট। অপু বলল: ধর, আমার ভিজিটিং কার্ডটি রাখ। পার্লামেন্ট ভবনের পিছনের রাস্তার নামই ফুলডার স্ট্রীট। ভুল যেন না হয়, কাল বিকেলে অবশ্যই আসবে। আমি অপেক্ষায় থাকব, আসি।’
পরদিন বিকেল পাঁচটায় অপু জানালা দিয়ে দেখল তার বাসার সামনে একখানি টেক্সি এসে থামল। কাঁধে ছোট্ট একটি ট্রাভেল ব্যাগ ঝুলিয়ে বৃষ্টি নামল। অপু দ্রুত দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বৃষ্টিকে রিসিভ করল। বৃষ্টিকে খুব ক্লান্ত এবং বিমর্ষ মনে হল, অপু বলল: বৃষ্টি মাই সুইট ডারলিং, তোমাকে ক্লান্ত মনে হচ্ছে। তুমি একটু রিলাক্স কর। আমি কফি এবং ইন্টারকনের স্যান্ডউইচ নিয়ে আসছি। খেতে খেতে দু’জনে দু’জনার মনের কথাগুলো শোনব। প্লেইনে তুমি বলছিলে তোমার মনোকষ্টের কথাগুলো বলবে। আমি শোনতে খুব আগ্রহী। আমার বিশ্বাস তুমি নির্দ্বিধায় সব খুলে বলবে। বৃষ্টি বলল: অপু অবশ্যই তোমাকে সব খুলে বলব। আমি সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েই তোমার কাছে ছুটে এসেছি। দেখ, আমি আমার আপা ও দুলাভাই’র কাছে চিরকৃতজ্ঞ এবং আজীবন ঋণী হয়েই থাকব। তাদের বাসাতে থেকে আমি লন্ডন ভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছি। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এয়ার হোসটেস-এর ইন্টারভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান মি. টমাস ক্লার্ক খুব রসিক লোক। তিনি হেসে হেসে বলেছিলেন: লুক্ সিজ বৃষ্টি, উই আর গিভিং ইউ এ্যাপয়েন্টমেন্ট নট বিকোজ ইউ আর ফার্স্ট ক্লাস ইন ইংলিশ বাট বিকোজ ইউ আর মোস্ট বিউটিফুল ইয়াং লেডি উইথ হাই অ্যমবিশন এন্ড এরিলিটি ফর হোস উই ওয়ার লুকিং ফর। জয়েন করার পর ছয় মাস ডোমেস্টিক ফ্লাইটে প্রবেশনারী অফিসার হিসাবে কাজ করি এবং পরে ইন্টারন্যাশনাল রুটে প্রমোশন পেয়ে বর্তমানে সুপারভাইজার এর দায়িত্ব পালন করছি। লম্বা বেতন এবং যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা পাই, আমার কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু সমস্যা যেটা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সেটা হচ্ছে আমার বিয়ে নিয়ে। আমার দুলাভাইয়ের ছোট ভাই জাবেদ আমাকে বিয়ে করার জন্য উন্মাদ হয়ে আছে। অর্ধশিক্ষিত, আনস্মার্ট এবং ভবঘুরে টাইপের ছেলে। প্রথম প্রথম আপা-দুলাভাই বিষয়টি তেমন পাত্তা দেন নাই। আপা বলেছিল বৃষ্টি ও জাবেদ এর মাঝে আকাশ-পাতাল ফারাক, এ বিয়ে কিছুতেই হতে পারে না। আমি জেনে শুনে আমার বোনের জীবন নষ্ট করতে পারব না। তার সামনে চমৎকার জীবন, বর্ণিল স্বপ্নের হাতছানি। আমি জেনে শুনে তার চাঁদের আলোয় ভরা জীবন আষাঢ়ের কালো মেঘ দিয়ে ভরে দিতে পারি না। এটা অন্যায় এবং একটি গর্হিত কাজ। অপু বৃষ্টির কথা কেটে বলল: বাহ্, আপাতো যথার্থ বলেছেন এবং তোমার পাশে আছেন, তাহলে সমস্যা কোথায়? বৃষ্টি বলল: অপু সমস্যা যথেষ্ট আছে, হাওয়া এখন পাল্টে গেছে। জাবেদ বলেছে আমাকে বিয়ে করতে ব্যর্থ হলে সে এ বাড়িতেই আত্মহত্যা করবে এবং চিঠি লিখে যাবে তার ভাই-ভাবী ও বৃষ্টি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং তার মৃত্যুর জন্য এই তিনজন সরাসরি দায়ী। জাবেদের এই প্রত্যাশা শোনার পর আপা-দুলাভাই দারুণ ঘাবড়ে গেছে। তারা এই বিয়ে মেনে নেয়ার জন্য আমাকে অতিষ্ট করে তুলেছে। তাদের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত হলো বৃষ্টি বড় অংকের মায়না পায় আর তাই তাদের বেকার ভাই ওর উপর দিয়ে পার পেয়ে যাবে। এমনি দুঃসহ সংকটের সময় তোমার সাথে পরিচয়। আমি আমার টুকটাক জিনিসগুলো নিয়ে চলে এসেছি এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঐ বাসায় আর ফিরব না। অপু দাঁড়িয়ে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে দু’হাত দিয়ে বৃষ্টির দু’গাল চেপে ধরে তার মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল: বৃষ্টি তুমি আমার পূর্ণিমার চাঁদ, তুমি আমার কবিতা, তুমি আমার স্বপ্ন, তুমি আমার অহংকার। তোমাকে পেয়ে আমি ধন্য, আমি গর্বিত। কথাগুলো শোনতে শোনতে বৃষ্টির দু’চোখ থেকে টপটপ অশ্রু তার দু’হাত বেয়ে পড়তে লাগল। অপু বলল: বৃষ্টি আর দেরী নয়। কাল সকালে কোর্টে গিয়ে আমরা বিয়ে করব এবং নেকস্ট সান-ডে হোটেল ইন্টারকনে রিসিপশন থ্রো করব। এতে তোমার আমার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা জয়েন করবে। বৃষ্টি গভীর আবেগে অপুকে জড়িয়ে ধরে বলল: অপু, তুমি আমাকে একটি নতুন জীবন উপহার দিলে। আমি চিরকাল তোমার দাসী হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। কী, তোমার বিশাল হৃদয়ে আমার জন্য একটু জায়গা হবে না? অপু তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল: একবার এসেই দেখ না, দেখবে আমার হৃদয়ে শুধু তুমি আর তুমি, আর একটু জায়গা নয়, বরং সমস্ত হৃদয় জুড়ে তোমারই রাজত্ব।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT