সম্পাদকীয়

মাতৃদুগ্ধ পানে পিছিয়ে

প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫৭:০৩ | সংবাদটি ৩০ বার পঠিত

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ইউনিসেফ এই তথ্য দিয়েছে। তাদের মতে বাংলাদেশে নবজাতকের মাত্র ৫১ শতাংশকে জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা হয়। আর ছয় মাসের কম বয়সী ৫৫ শতাংশ শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো হয়। ইউনিসেফ-এর মতে একজন মা তার সন্তানকে ও নিজেকে সর্বোত্তম যে উপহার দিতে পারেন, তা হচ্ছে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো। জানা গেছে, আফগানিস্তানে ৯৮ শতাংশ, ভুটান, নেপাল ও শ্রীলংকায় ৯৯ শতাংশ শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যান্য দেশেও ৯৪ থেকে ৯৭ শতাংশ শিশুকে খাওয়ানো হচ্ছে বুকের দুধ। ইউনিসেফ এর মতে, শিশুকে দীর্ঘদিন ধরে বুকের দুধ খাওয়ানো মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একজন মা যদি তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান, তবে তার ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায় ছয় শতাংশ।
মায়ের দুধ শিশুদের সর্বোৎকৃষ্ট খাবার। বলা যায় মায়ের দুধ সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সমগ্র জাতির জন্য একটি বিশেষ আশীর্বাদ। চিকিৎসা বিজ্ঞানও এই ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়েছে। শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর তার প্রথম খাবারই হচ্ছে মায়ের দুধ। শুধু তাই নয়, শিশু পৃথিবীতে এসে প্রথম মায়ের ‘শাল দুধ’ খায়, সেটা হচ্ছে তার সারাজীবনের রোগ প্রতিষেধক টিকা। আসল কথা হলো, মায়ের যে দুধের প্রকৃত মূল্যায়ন পৃথিবীর সবকিছুর উর্ধ্বে। শিশুর পুষ্টি, বেঁচে থাকা এবং বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের দুধই সর্বোত্তম ভূমিকা রাখে। শিশু-স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং শিশুদের বিভিন্ন রোগ কমানোর জন্য যেসব জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় যেমন টিকাদান, ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ, পরিবার পরিকল্পনা এবং অপুষ্টি দূরীকরণ, এইসব কার্যক্রমের সফলতায় সাহায্য করতে পারে মায়ের দুধ। তাছাড়া মায়ের দুধ মা ও শিশুর মধ্যে যে মমতার গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলে, তা জগতের উর্ধে। তাই শিশুদের জন্য মায়ের দুধের বিকল্প নেই।
আবহমান বাংলার নারীরা সন্তানদের জন্য বুকের দুধকেই প্রধান খাবার হিসেবে জেনে এসেছেন। বুকের দুধের উপকারের ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তারা সেভাবে না জানলেও শিশুদের খাবার হিসেবে বুকের দুধের বিকল্প কিছু ভাবেন নি। কিন্তু এই ধারণা অনেকটাই পাল্টে যেতে থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। তখন থেকে বিশেষ করে পাশ্চাত্যের প্রভাবে আমাদের দেশে মায়ের দুধের বিকল্প নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়। উৎপাদন হতে থাকে ‘মায়ের দুধের বিকল্প’ গুঁড়ো দুধ। তথাকথিত আধুনিকতার দোহাই দিয়ে এক শ্রেণির মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো থেকে বিরত রেখে বাজার থেকে কেনা গুঁড়ো দুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তখন বিশ্বের গুঁড়ো দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও শিশুদের মায়ের দুধ না খাওয়ানোর ব্যাপারে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারা শিশুদের গুঁড়োদুধ খাওয়ানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে মায়েদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। এক পর্যায়ে তারা সফলও হয়। আর মায়েরা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে টিনজাত গুঁড়ো দুধ আর ফিডারের ওপর।
অবশ্য পরিস্থিতি এখন অনেকটাই পাল্টেছে। শিশুকে মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত করা মানে তাকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। তাছাড়া, গুঁড়ো দুধ খেয়ে অনেক সময় শিশুদের উপকারের পরিবর্তে অপকার হচ্ছে বেশি। এই দুধ থেকে শিশুরা নানা অসুখ বিসুখের শিকার হচ্ছে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে তারা আরও অনেক ধরনের রোগে। অথচ এই গুঁড়ো দুধের পেছনে মা-বাবাকে ব্যয় করতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ইদানিং পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এশিয়ায় অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কম। তাই এ ব্যাপারে মায়েদের ব্যাপকভাবে সচেতন করে তুলতে হবে। ‘মায়ের দুধের বিকল্প নেই’ এই শ্লোগান ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT