মহিলা সমাজ

মননশীল জ্ঞানতাপস

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৫-২০১৮ ইং ০০:৪৫:৪৫ | সংবাদটি ৭৮ বার পঠিত

এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষাতত্ত্ববিদ, জ্ঞান তাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ছিলেন একাধারে ভাষাবিদ, গবেষক, লোকবিজ্ঞানী, অনুবাদক, পাঠসমালোচক, সৃষ্টিধর্মী সাহিত্যিক, কবি, ভাষাসৈনিক এবং খাঁটি দেশপ্রেমিক। বাংলা ভাষার গবেষণায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। একটি কাল, একটি শতাব্দী, একটি সংস্কৃতির অন্যতম সাহিত্যিক ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই ভাষাবিদ। ডা. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বাবা-মা’র পঞ্চম সন্তান। বাবা মফিজ উদ্দিন আহমদ ছিলেন ইংরেজ আমলে সরকারি জরিপ বিভাগের একজন কর্মকর্তা। মা হরুন্নেছা খাতুনের শিক্ষার প্রতি ছিল প্রচন্ড আগ্রহ। তিনি বাড়িতে মহিলাদের শিক্ষা দিতেন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাম প্রথম দিকে রাখা হয় মুহম্মদ ইব্রাহিম। কিন্তু এই নাম তাঁর বাবার পছন্দ না হওয়ায় আকিকা করে পুনরায় নাম রাখা হয় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিন বোন ও চার ভাই’র মধ্যে শহীদুল্লাহ ছোটবেলায় ছিলেন দারুণ আমোদে ও আত্মভোলা। বাড়ির সবাই তাঁকে ‘সদানন্দ’ বলে ডাকতো। পাঠশালার পন্ডিত মশাইরা তাঁকে ‘সিরাজ দৌল্লাহ’ নামে ডাকতেন। অবশ্য তিনি নিজের নাম রেখেছিলেন ‘জ্ঞানানন্দ সংগ্রামী’। ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলাস্কুল থেকে শহীদুল্লাহ কৃতিত্বের সাথে সংস্কৃতসহ প্রবেশিকা পাস করেন। ১৯০৬ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পাস করেন। সাময়িক বিরতির পর ১৯১০ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃত অনার্সসহ বিএ পাস করেন। বাঙালি মুসলমান ছেলেদের মধ্যে তিনি প্রথম অনার্স পাস করেন। অনার্স পাস করার পর সংস্কৃতে উচ্চতর ডিগ্রী নিতে চাইলে পন্ডিতরা তাঁকে পড়াতে চাইলেন না। বাধ্য হয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ব বিভাগে ভর্তি হলেন এবং কৃতিত্বের সাথে ১৯১২ সালে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ধ্বনিতত্ত্বে ও মৌলিক গবেষণার জন্য ঐ বছরই তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা লাভ করেন।
ভাষা বিজ্ঞানের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তিনি স্বাচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন। প্রায় বাইশটি ভাষা শহীদুল্লাহ আয়ও করেছিলেন। বাংলা, উর্দু, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, হিন্দি, সংস্কৃত, ল্যাটিন, জার্মান, তিব্বতি, মারাঠি, মৈথালি ইত্যাদি ভাষা জানলেও ভাষার ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলতেন, আমি বাংলা ভাষাই জানি। সবার সামনে নিজেকে তিনি এভাবে গুঁটিয়ে রাখতেন। ১৯১৪ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত শহীদুল্লাহ শিক্ষক হিসেবে সীতাকুন্ড উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। একই সময়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক নিযুক্ত হন বিনা বেতনে। ১৯২৫ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯২৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে তিনি দেশে ফিরে এসে পূর্বপদে যোগদান করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি বাংলা বিভাগের রিডার ও অধ্যক্ষ পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৪৪ সালের ৩০ জুন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে যোগদেন এবং একই সাথে উক্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ছয় বছর পর কলা অনুষদের ডিন এর দায়িত্ব পালন করেন। পরে মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি সেখানে যোগদান করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন শেষে এই বিভাগ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
এই শিক্ষাবিদ নিজে যেমন আজীবন জ্ঞান সাধনা করেছেন, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেছেন। ডা. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ইমেরিটাস নিযুক্ত হন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অবদান আছে। বাংলা লোকসাহিত্যের প্রতিও তিনি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। এক স্বতন্ত্রধর্মী গবেষক ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলার গঠন অনুসারে তিনিই প্রথম ১৯৪৩ বাংলা ব্যাকরণ রচনায় হাত দেন। আজকের ‘বাংলা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণেও তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
আজীবন ছাত্র ও আজীবন শিক্ষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সারাটি জীবন শুধু জ্ঞানের পিছু ছুটেছেনে এবং জ্ঞান বিলিয়ে দিয়েছেন সবার মাঝে। তারপরও তিনি সংসারী হয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম মরগুবা খাতুন। সাত পুত্র ও দুই কন্যার মধ্যে তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলে আজকের বিখ্যাত চিত্রশল্পী মুর্তজা বশীর। মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একজন শিক্ষক এবং একজন মনেপ্রাণে বাঙালি।
জীবনভর ভাষা ও সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘প্রাইড অব পারফরম্যান’ পদকে ভূষিত হন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন।
সদা কর্মচঞ্চল উদ্যমী মানুষ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস রোগে আক্রান্ত হন এবং ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই সুদীর্ঘ কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে চলে যান চিরদিনের জন্য দূর অজানায়। তাঁর প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT