ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জলপ্রপাতের নাম হামহাম

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৫-২০১৮ ইং ০০:২৯:৪৩ | সংবাদটি ১২০ বার পঠিত

কেউ বলেন আম আম, আবার কেউ বলেন হাম্মাম। আসলে কোনটি থেকে যে হাম হাম নামের সৃষ্টি তা বলা মুশকিল। তবে স্থানীয়রা ডাকেন চিতার ঝরনা নামে। এখানে প্রচুর চিতাবাঘের বসতি ছিলো বলে চিতা ঝরনাই তাদের কাছে পরিচিত। আবার স্থানীয়দের মধ্যে কেউ কেউ সিতাপ নামেও ডাকেন। দেশের উত্তর-পূর্বাংশের পাহাড়ি অরণ্যেঘেরা মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি এলাকার সুরক্ষিত বনাঞ্চল ঘিরে কুরমা বনবিট এলাকায় হাম হাম এর অবস্থান।
হাম হাম অবগাহনে আছে সুখ। আছে না ভুলা সময়ের এ্যাডভেঞ্চার। শুধু চাই অনুসন্ধানী মন আর ঝরনার আবগাহন। এই ঝরনা জুড়ে রয়েছে স্বচ্ছ পানির কলকোলাহল। সাথে সবুজ গাছ-গাছালির ছায়ায় ঘেরা, মায়ায় ভরা বৃক্ষরাজির ঝিম ধরা আবাহন। কাচের মতো স্বচ্ছ পানি যখন বুনো পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে গুড়ি গুড়ি জলকণায় রূপান্তরিত হয়, তখন প্রজাপতির মতো ডানা মেলে কুয়াশা-কুয়াশা আকাশ সৃষ্টি হয় আর ডেকে যায়-সে সময় দর্শনার্থীর অতি আবেশে চোখ বুজে আসে। দর্শনার্থীর মনে হয় গাছ, লতা, গুল্ম ঘেরা পাহাড়ের শরীর বেয়ে ঝরনার জল বুঝি পাথর কেটে কেটে পায়ের পাতা বয়ে নিয়ে যায় আপন ঠিকানায়। এর মাঝে যদি থাকে বর্ষার বর্ষণ তবে তো কথাই নেই। বর্ষণ জলে আরো যৌবনবতী হয়ে ওঠে হাম হাম এর শরীর। এ সময় ঝরনা ধারার ব্যাপ্তী বেড়ে যায় প্রায় ৫ থেকে ৬ মিটার। আর ঝর ঝর করে ঝরতে থাকে পাহাড়ের সুখদ কান্না। জলপ্রপাতের ঝরে পড়া জল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তৈরি করে দেয় বহমান ছড়া। আর বিভিন্ন ছোট-বড় এই ঝরনার ছড়াকে পেরিয়েই যেতে হয় কাক্সিক্ষত প্রপাতের কাছে। তখন আরো চল-চঞ্চল হয়ে ওঠে তার আশপাশের বন-বনানী আর পর্যটকের মনোমন্দির। আরো মনোরম হয়ে ওঠে সবুজাব প্রকৃতি। তখন বয়ে আসা পাহাড়ের কাচ জলে সন্তুরণ করে আরো আবেগি হয়ে ওঠেন দর্শনকারী। দু’চোখ আকাশের উদরে মেলে ধরে আপন কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার ক’ লাইনÑঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দর ঝর্ণা!/ তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন বর্ণা!/ অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে,/ গিরি মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে,/ তনু ভরি যৌবন, তাপসী অপর্ণা!/ ঝর্ণা!...
শুধু তাই নয়, পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে ঝিরি ঝিরি বাতাস দোলাবে মনপ্রাণ। পথের দু’ধারে বিছানো জারুল, চিকনারাশি আর কদম গাছের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন ডানা মেলে দেবে হাজারো প্রজাপতি। ডুমুর গাছের ডালে ডালে লাফিয়ে লাফিয়ে দর্শনকারীর মন জোগাবে চশমাপরা বানর। আমরা আজও আছি। তোমাদের কাছাকাছি বলে জানান দেবে বন মানুষের হাঁক ডাক। ঝাঁকে ঝাঁকে, ডালে ডালে পাখিরা শুনাবে সুুমধুর গান। দর্শনকারী তখন আপন সুখে গেয়ে যাবেন জীবনানন্দের রূপসী বাংলারÑ এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে শান্তি আসে মানুষের মনে/ এখানে সবুজ শাখা আঁকা বাঁকা হলুদ পাখিরে রাখে ঢেকে/জামের আড়ালে সেই বউ কথাকও টিয়ে যদি ফেল তুমি দেখে/একবার; একবার দুপ্রহর অপরাহ্নে যদি এই ঘুঘুর গুঞ্জনে/ ধরা দাও- তাহলে অনন্তকাল থাকিতে হবে যে এই বনে।
আবার ডলু-কালি-মির্থিঙ্গা ও মুলি নানা নামের বাঁশ বাগান পার হয়ে ডানে কিংবা বামে যে দিকে তাকাবেন চোখ ফেরানো হবে দায়। নিজেকে নিজের কাছে মনে হবে, কতো দিনের একজন তৃষ্ণাকাতর মানুষ। যে কি না আজ ঝরনা জঙ্গল দেখতে এসেছে। উপরে আকাশ। আকাশে ভিঞ্চির প্রিয় ডানামেলা ফড়িং। চারপাশে ঘন জঙ্গল। পাখির ডাক। পায়ের তলায় স্বচ্ছ পানির দৌড় ঝাঁপ।
ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন বা বাসে করে অনায়াসেই শ্রীমঙ্গলে আসা যায়। ঢাকা থেকে বনাঞ্চলের দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার। যা কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বদিকে অবস্থিত। কমলগঞ্জ থেকে ১ ঘণ্টায় লোকালবাস, জিপ বা প্রাইভেট কার নিয়ে আসা যায়। শ্রীমঙ্গল পৌঁছে কোনো আত্মীয়ের বাসা-বাড়ি কিংবা হোটেল নিয়ে নেওয়া ভালো। যদি রাতের গাড়িতে আসা হয় তবে শ্রীমঙ্গল থেকে নাস্তা সেরে ৯টার মধ্যে রওয়ানা দেওয়া ভালো। আর যদি দিনের গাড়িতে রওয়ানা হওয়া যায় তবে হোটেলে রাত্রি যাপন শেষে ভোর ৬টার মধ্যে রওয়ানা দিতে হবে হাম হাম এর পথে।
শ্রীমঙ্গল হোটেলের পাশে প্রচুর সিএনজি, অটোরিক্সা পাওয়া যায়। সেখান থেকে সিএনজি, অটোরিক্সা নিলে বা জিপ, কার নিলে চাম্পায়ার চা বাগানের কলাবন পাড়ায় পৌঁছা যায় ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে। তবে নব দর্শনার্থীরা কলাবন পাড়ায় নেমে একজন স্থানীয় গাইড নিয়ে নেওয়া ভালো। মনে রাখতে হবে কমলগঞ্জের একেবারে শেষ প্রান্তের গ্রামের ত্রিপুরা পল্লীর নামটিই কলাবন পাড়া বা তৈলংবাড়ি বলতে গেলে এখান থেকেই অত্র অঞ্চল জনবসতিহীন। এ পথ দিয়ে যেতে যেতে বনের ভেতর চোখে পড়বে পাশাপাশি দু’টি পথ। একটির পথ ডানমুখো অপরটির বামে। সহজ হবে ডান দিকের পথে গমন ও বাম দিকের পথে প্রস্থান। এবার খালি পায়ে বাংলাদেশ বনবিভাগের সংরক্ষিত এলাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হবে। প্রায় ৫ কিলোমিটারের এই পদযাত্রায় দেখা মিলবে গভীর জঙ্গল, পশু-পাখি আর পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকা বাঁকা কঠিন, পিচ্ছিল, ঝিরিপথের। কখনও হাঁটুজল, কখনও বা পাথুরে পিচ্ছিল পথ। আবার কখনও লতাপাতা ধরে পাড়ি দিলেই দূর থেকে শুনা যাবে প্রায় ১৬০ ফুট নিচে নাম জলপ্রপাতের শব্দ। যার ছোটে আসা ভারতের ত্রিপুরার কাছে থেকে। রূপান্তরিত বিশাল শিলাখন্ডের গা ঘেষে প্রতিনিয়ত পানির প্রবাহের ফলে জলপ্রপাতটির এলাকা হয়ে ওঠেছে পিচ্ছিল রোমাঞ্চকর পর্যটন কেন্দ্র। যে পর্যটন কেন্দ্রটির জলপ্রপাতে রয়েছে দু’টি ধাপ, সর্বোচ্চ ধাপটি থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে মাঝখানের ধাপে এবং সেখান থেকে আবার পানি গড়িয়ে পড়ছে নিচের অগভীর খাদে যা ৪০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত স্বচ্ছ পানির জলাশয়। ইচ্ছে করলে অন্য অনেকের মতো নেমে পড়ে গায়ের উষ্ণতা শীতল করা যায় হাম হাম এর জলে।
পর্যটন গাইড শ্যাম দেব বর্মার সাথে গিয়ে একদল পর্যটক ২০১০ সালের শেষের দিকে আবিষ্কার করেন এ ঝরনাটি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই সুউচ্চ প্রপাতটি দর্শনে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে ভুলে যাবেন কোন দূরাঞ্চল থেকে এসেছেন অভিযাত্রী। আর যদি সাহসি অভিযাত্রী, পর্যটক বা দর্শনার্থী হোন তাহলে লতাপাতা, আর গাছের শেকড় বাকড় ধরে ওঠে যেতে পারেন জলপ্রপাতের শীর্ষস্থানে। যেখানে আছে ঝুঁকি। আছে সাহসের পরীক্ষা। আর এ পরীক্ষা দিতে দিতে হয়তো গেয়ে ওঠতে হবে রবীঠাকুরের গান- ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু/ পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু...।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT