ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৫-২০১৮ ইং ০০:৩১:৫০ | সংবাদটি ৪০ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
যদি রাজনীতির লক্ষ্য হয় জনসাধারণ স্বজাতি ও স্বঅঞ্চলের সুখ-সুবিধা বৃদ্ধি ও কল্যাণ সাধন, তা হলে বলবো এই ভূমি নিয়ন্ত্রণ আইন সর্বনাশ করেছে। পাহাড়ি বাঙালি উভয় সমাজই সম্পত্তির অধিকার ও লেনদেনের ব্যাপারে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা। বিধি নিষেধ কর্তৃত্ব ও কর্তৃপক্ষ এতো ব্যাপক যে, তাতে জনসাধারণ ব্যাপকভাবে উত্যক্ত ও হয়রানীর শিকার। হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল সৃষ্টি করেছে তিন চীফ, তিনশত তেহাত্তর জন হেডম্যান ও শতাধিক বাজার চৌধুরীর এক সুবিধাবাদী শ্রেণি। তার পাশাপাশি বর্তমান পরিষদ ব্যবস্থা জন্ম দিয়েছে শতাধিক অভিজাত চেয়ারম্যান সদস্য মন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদাধিকারীদের ও যারা পতাকা গাড়ি বাড়ি উচ্চ বেতন ভাতা ও মর্যদায় অভিষিক্ত। এর বিপরীতে জনসাধারণকে টোল টেক্স চাঁদা ও সন্ত্রাস চেপে ধরেছে। সাধারণ কৃষিপণ্য, সে এক ছড়া কলা বা একটি মোরগ ছানা হোক, বিক্রির আগে পরে কয়েকবার টোল টেক্স ও চাঁদা দিতে হয়। এক খন্ড জমি বন্দোবস্তি খরিদ বিক্রি বা হস্তান্তরের প্রয়োজন হলেও চেয়ারম্যান, মেম্বার, হেডম্যান, কারবারী, বাজার চৌধুরী, আমিন কানুনগো রেভিনিউ কালেক্টর, পিওন, কেরানী, বড় কর্তা ইত্যাদির কাছে ধরণা হাটাহাটি পারিতোষিক দিতে দিতে জীবন কেটে যায়, তবু শেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পুরুষাধিক সময় লাগে। এখন পারিতোষিকের পরিমাণ শতের কোটা ছেড়ে, হাজারের কোটার উপরের দিকে উঠে গেছে। গরিবের পক্ষে এখন জমির মালিক হওয়া দুঃসাধ্য। অবস্থা দাঁড়িয়েছে এমন : ‘ঢালো কড়ি, মাখো তেল’।
জনগণের নামে সংগঠিত হয় রাজনীতি আন্দোলন সংগ্রাম আর প্রতিনিধিত্ব। রাষ্ট্রের পরিচয়টাও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। কিন্তু বাস্তবে জনসাধারণ পতিত নিঃস্ব অসহায়। তারা নামে স্বাধীন নাগরিক, কিন্তু বাস্তবে বিত্তবান ও ক্ষমতাবানদের দাস ও প্রজা। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই গণ দুর্ভোগ সীমাহীন। যদি জায়গা জমি শস্য উৎপাদনে কার্পণ্য করতো, আর আবহাওয়া বিরূপ হয়ে যেতো এবং প্রকৃতি ও চাওয়া পাওয়া খোশামোদ তোষামোদ পারিতোষিক আর কুর্নিশ লাভ শিখতো তা হলে এতদাঞ্চল হতো একটি দোযখ।
আসলে সরকার চাওয়ার চেয়ে বেশি দিয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু পাওয়ার বেলায় বাস্তবে ধরা দিয়েছে শূণ্য। এটি হলো এক হাতে দেয়া, আরেক হাতে নেয়া। তথা দেয়া না দেয়ার খেলা। খেলাই বটে। জনসংহতি সমিতি কথিত শান্তিচুক্তি যথাযথ বাস্তবায়িত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ, অথবা এ ক্ষোভ হলো তার ভক্ত সমর্থকদের প্রবোধ দানের কৌশল। সে তো জানেই, চুক্তি কী হয়েছে ও সরকার তাকে কী দিয়েছে। এখন সে কথা বলে দিলে তো, ব্যর্থ জনসংহতি সমিতির উপর লোকেরা ক্ষেপে যাবে। নিরাপদে পদ আর পতাকা ধরে রাখা যাবে না। তাই সরকারের সাথে সমঝোতায়ই বোধ হয় গরম বক্তৃতা ঝাড়া হয়। সাম্প্রদায়িক খলা গরম করতে বলা হচ্ছে : সেটেলার বাঙালিদের আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সুযোগ দেয়া যাবে না। তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বাতিল করতে হবে। ফিরিয়ে নিতে হবে তাদের ইত্যাদি।
সরকার কিন্তু এসব দাবি দাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চুপ। তাইতো মনে হয় এটা আপোষ রফার বাদানুবাদ। সরকার কৌশলে অধিকাংশ ভূমি যে নিজ দখলে রেখে দিয়েছেন তার প্রমাণ হলো, পরিষদ আইনের ৬৪ ধারার শেষ অংশটি তাতে জেলার খাস পাহাড় বন ও কর্ণফুলী হ্রদ এলাকাটি জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেয়া হয় নি। বলা হয়েছে : প্রয়োজনে তা মূল বাস্তুচ্যুত মালিকদের বন্দোবস্ত দেয়া হবে যথা :
(৩) কাপ্তাই হৃদের জলে ভাসা জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমির মূল মালিকদেরকে বন্দোবস্তি দেয়া হবে।
এখানে পেন্ডুরার বাক্সের শেষ খেলাটি হলো এই যে, পরিষদ নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার জায়গা জমিতে বন্দোবস্তির কর্তৃত্ব লাভ করে নি, কেবল পুনর্বানুমোদন দানের অধিকারই লাভ করেছে। এখানেও চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ সরকার। এটা আরেক হেডম্যানী ব্যবস্থা বা বাণিজ্য বেসাতি। জেলা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া বন্দোবস্তিও বেচা কেনা হবে না এ নিশ্চয়তা কি আছে? বাজার ফান্ডের এডমিনিষ্ট্রেটার হয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা স্বচ্ছতার সাথে বন্দোবস্তির দায়িত্ব পালন করছেন বলে তো শোনা যায় না। ভুক্তভোগীরা জানেন, পারিতোষিকের খেলায় অক্ষমদের মামলার কোনো সুরাহা হয় না, তবে লাভবান হয় ধনী ও ক্ষমতাবানরা।
৭। (তাং-মঙ্গলবার ৯ কার্তিক ১৫০৭ বাংলা ২৪ অক্টোবর ২০০০ খ্রিস্টাব্দ/ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙ্গামাটি)
একথা সঠিকভাবে কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে, পর্বতাঞ্চলের জরিপ ভিত্তিক আয়তন কতো। কেউ বলেন, ৫০৯৩ বর্গমাইল, আর কেউ বলেন ৫০৮৯ বর্গমাইল। তৃতীয় বা চতুর্থ কোন পরিমাণ নিয়ে কেউ যদি দাবি করেন, না এসবই ভুল, আসলে পরিমাপ আরো কম বা বেশি, তাহলেও চ্যালেঞ্জ করার উপায় নেই। অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশের যোগ বিয়োগ ও পূরণ ভাগই এখন পর্যন্ত পরিমাপের সূত্র। সীমান্তের বহুবর্গ কিলোমিটার এলাকা যে প্রতিবেশি রাষ্ট্রদ্বয়ের দখলে চলে যায় নি সে তো সৌভাগ্য। এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে সামগ্রিক কোন জরিপ কাজ সম্পাদিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। কেবল বিশেষ প্রয়োজনে কিছু খন্ডিত কাজ হয়েছে, যা সার্বিক ভূমি চিত্র প্রদর্শন ও প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম। এমতাবস্থায় পাহাড় নদী, বন, সমতল, আবাদী খাস আর বন্দোবস্তি ভুক্ত জমির সঠিক পরিমাণ ও বর্ণনা পাওয়া কঠিন। যা আছে তার সবই খসড়া ও অনুমান ভিত্তিক যোগ বিয়োগ সাধিত হিসাব। এই বিভ্রান্তিকে কাটিয়ে ওঠার একমাত্র উপায় সার্বিক ও সরেজমিন জরিপ সম্পাদন। একমাত্র তাতেই সঠিকভাবে বলা সম্ভব হবে, পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক আয়তন কতো, রাষ্ট্রীয় ভূমি প্রতিবেশিদের দ্বারা বেদখল হয়েছে কি না, বৈধ বন্দোবস্তি ভুক্ত জমি পরিমাণ কতো, কারো মালিকানাধীন জমিতে অপর কারো অনুপ্রবেশ বা জবর দখল ঘটেছে কি না, খাস জমির বেহাত হওয়ার পরিমাণ কতো, বন্দোবস্তি বহির্ভুত আবাদি জমির পরিমাণ কী, ভোগদখলকার কারা, দখল বহির্ভুত খাস জমি পাহাড় বন ও নদী নালার পরিমাণ ও হাল অবস্থা কী, সংরক্ষিত আর রাষ্ট্রীয় বন কোথায় কি পরিমাণে ব্যবহার যোগ্য, খাস জমি ও পাহাড়ের ব্যবহার উপযোগিতাই বা কী ইত্যাদি। এই সার্বিক জরিপ চিত্র ছাড়া ব্যক্তিগত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকার নির্ণয় অসম্ভব। এই জরিপ নির্ভর শূন্যতাকে ঘিরে অনেক মামলা মোকদ্দমা ও দাবির উদ্ভব ঘটেছে, যা পরিমাণে বিপুল ও রাজনৈতিক গুরুত্বে বিব্রতকর। এর সাথে যুক্ত আছে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক প্রতিযোগিতা ও বিবাদ। এই সমস্যাটি তাই শুধুই বৈষয়িক ঠেলাঠেলি নয়।
ভূমি কমিশন নিরপেক্ষ ও ন্যায্য ভূমিকা রাখতে তখনই সক্ষম হবেন, যখন তার হাতে ভূমি সংক্রান্ত পরিপূর্ণ জরিপী তথ্যাদি সন্নিবেসিত হবে এবং কমিশন প্রধান সহ অন্যান্য সদস্যরা, এতদাঞ্চলীয় ভূমি সংক্রান্ত স্বার্থ থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত হবেন। কিন্তু বাস্তব হলো : কমিশনের জন্য জরুরি জরিপী ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত নেই। কমিশনের উপজাতীয় সদস্যরা স্থানীয় ভূমি স্বার্থের সাথে জড়িত। তারা উপজাতীয় দাবিদার ও ফরিয়াদীদের সপক্ষও বটে এবং মোট কমিশন সদস্যদের ৫ জনের ৩ জনই অর্থাৎ গরিষ্ঠ সংখ্যক তারা। সুতরাং ভূমিগত সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের পক্ষে তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা হবে সন্দেহজনক। তাই কমিশনের কার্যক্রম যে নির্দোষ ও নিরপেক্ষ হবে, সে ভাবার অবকাশই নেই। অধিকন্তু কমিশন প্রধানের পক্ষে গরিষ্ঠ সংখ্যক সদস্যের অভিমত অগ্রাহ্য করার ও নিজ অভিমতে চূড়ান্ত রায় দানের ক্ষমতা থাকার বিয়য়টি অনিশ্চিত। প্রধানত : দুই সরকারি সদস্য উপজাতীয় সদস্যদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে নিজেদের চাকুরি স্বার্থ ও কমিশনকে বিতর্কিত আর বিপন্ন করবেন বলেও মনে হয় না। সুতরাং ভূমি কমিশনের হাতে বাঙালি স্বার্থ অরক্ষিত থাকার সন্দেহ একেবারে ফেলনা বলা যায় না। এটাও অসম্ভব নয় যে, স্বার্থের বিনিময়ে দু’একজন সদস্য প্রভাবিত হবেন না। তাদের দ্বারা গরিব ফরিয়াদিরা পারিতোষিক দানের অক্ষমতার কারণে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন, সে সম্ভাবনা ও আছে। কুলিন ক্ষমতাধর উপজাতীয় নেতারাই পারিতোষিক ও সরকারি আশীর্বাদ লাভের বিনিময়ে অতীতে পর্বতাঞ্চলে বাঙালিদের বসিয়েছেন। ১৯৭৮ সালের পরবর্তী বাঙালি বসতি স্থাপন সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে এর সূচনা হলেও উপজাতীয় উপদেষ্টা বাবু সুবিমল দেওয়ান তাতে মদদ যুগিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে এর গতি ধীর হলেও বন্ধ ছিলো না। বরং তার আমলে উপদেষ্টা ছিলেন শক্তিশান চাকমা নেতা উপেন্দ্র লাল চাকমা ও বিনয় কুমার দেওয়ান। সুতরাং বাঙালিরা হাওয়ায় ভর করে আপনাতেই উড়ে এসে জুড়ে বসে নি। সরকারও একক ক্ষমতা বলে বাঙালি বসতি স্থাপনের এক রোখা নীতি গ্রহণ করে নি। আগে পরে সব হেডম্যান, চীফ ও রাজনৈতিক নেতাই আর্থিক সুবিধা ও সরকারি আশীর্বাদের বিনিময়ে বাঙালিদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মদদ যুগিয়েছেন। তাতে আইনি প্রতিবন্ধকতা, বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আর্থিক সুবিধা ও আশীর্বাদের টোপ এক অব্যর্থ অস্ত্র, তাতে ভবিষ্যতেও বাঙালিরা বসবাস ও ভূমির মালিকানার সুযোগ জয় করে নিবে তা অবধারিত। তাই বাধাবাধি কোনো স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয় এটি পয়সা কড়ি কামানো আর আশীর্বাদ লাভের পসরা পাতা ব্যবস্থা। যদ্বারা নেতা ও অভিজাতেরা উপকৃত হবেন। সাধারণ উপজাতীয়দের তাতে কোনো লাভ ক্ষতি হবে না। তারা চিরকাল নিরীহ গরিব প্রজা হয়ে আছে এবং থাকবে। ভূমি আইনে তাদের কোন কল্যাণ নিহিত নেই। বাঙালিদের বঞ্চিত রেখে সাধারণ পাহাড়িদের সহজ ভূমি স্বত্ব লাভের কোনো পদ্ধতি, না হিলট্রাক্টস ম্যানুয়েলে আছে, না জেলা পরিষদ আইনে। জেলা প্রশাসকদের ভূমি দানের ক্ষমতা এখন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের হাতে বন্দি। এই আইনে পাহাড়ি বাঙালি সবাই ভেদাভেদহীনভাবে সমান ভুক্তভোগী। আগে জেলা প্রশাসকদের ভূমিদান ক্ষমতা ছিল বাধাহীন। তিনি বা তারা ইচ্ছা করলে যে কাউকে মুহূর্তে ভূমির মালিক করে দিতে পারতেন। এখনো মূল বন্দোবস্তি ও নামজারীর ক্ষমতা তার বা তাদের হাতেই নিহিত। তবে প্রতিবন্ধকতা হলো জেলা পরিষদ আইন নং ৬৪, যা পরিষদ চেয়ারম্যানের পূর্বানুমোদনকে জরুরি করে দিয়েছে। তাতে ভূমি বন্দোবস্তি ও হস্তান্তর দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠেছে। এই অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য চুক্তিভুক্ত দফা নং খ/৩ হলো একটি হাস্যস্পদ সিদ্ধান্ত। সরকার ভূমিহীন বা দু’একরের কম জমির মালিক উপজাতীয়দের পরিবার প্রতি অন্ততঃ দু’একর জমি বা টিলা জমির মালিকানা নিশ্চিত করবেন। জেলা পরিষদ আইন নং ৬৪ তে, জেলা প্রশাসকদের ভূমিদান ক্ষমতা অচল করার পর, এই ভূমি দানের আশ্বাস বা অঙ্গিকার কি পরিহাস্য নয়? চেয়ারম্যানেরা, স্বতস্ফূর্ত দয়ালু উদার ও পাহাড়ি দরদী হওয়ার কোনো নজির তো তাদের কর্মকান্ড ও বন্দোবস্তি খাত বাজার ফান্ডের বেলায় কখনো প্রদর্শন করেন নি। ভূমি অনুমোদনের বেলায়ও তারা স্বার্থে পরিচালিত হবেন, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT