ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জাফলং নামকরণের ইতিকথা

মুনশি আলিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৫-২০১৮ ইং ০০:৩৮:০৬ | সংবাদটি ১২০ বার পঠিত

সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন বঙ্গ প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় সামন্তরাজাদের বসবাস ছিল। প্রথম প্রথম তারা অল্পতেই তৃপ্ত হতো। আর এ কারণে তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল নিয়েই এই স্বাধীনতা ঘোষণা করত। গোয়াইনঘাটের বর্ডার সংলগ্ন এলাকাতে তখন ছিল খাসিয়াদের একচেটিয়া বসবাস। খাসিয়া বা খাসি বাংলাদেশে বসবাসরত একটি মাতৃতান্ত্রিক নৃগোষ্ঠি। প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীরই নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই সাধারণত মানুষ বেড়ে ওঠে। তবে জাতিভেদে সংস্কৃতির ভিন্নতা রয়েছে। যদিও সংস্কৃতির কাজই হচ্ছে মিথস্ক্রিয়া তবুও খাসিয়াদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং সে সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই তারা বেড়ে ওঠে।
খাসিয়ারা ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্য এবং বাংলাদেশের সিলেটের সীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চলে বসবাসকারী মোঙ্গলীয় মহাজাতির একটি ক্ষুদ্র নরগোষ্ঠী। এদের ভাষার নাম খাসিয়া বা খাসি। খাসিয়া ভাষার সঙ্গে বার্মার মোঁয়ে, পলং ভাষার এবং উপমহাদেশের তালাং, খেড়, সুক, আনাম, খামেন, চোয়েম, ক্ষং, লেমেত, ওয়া প্রভৃতি আদিবাসীদের ভাষার মিল আছে। এই ভাষার নিজস্ব কোন বর্ণমালা নেই। তবে ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে কৃষ্ণচন্দ্র পাল নামক একজন ধর্মযাজক সর্বপ্রথম বাংলা বর্ণমালায় ও খাসি ভাষায় বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট অনুবাদ করেন। ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দের পরে ওয়েলস মিশনারি দলের টমাস জোনস রোমান হরফে খাসিয়া ভাষা লেখার প্রচলন করেন। বর্তমানে খাসি ভাষা রোমান হরফেই লেখা হয়। তবে এ ভাষার বেশ কয়েকটি উপভাষাও রয়েছে।
খাসিয়ারা প্রায় পাঁচ শতাধিক বছর আগে আসাম থেকে সিলেট-মেঘালয়ের সীমান্তবর্তী এই এলাকাগুলোতে আসে। তারা আসামে এসেছিল সম্ভবত তিব্বত থেকে। অবশ্য তাদের আগমন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন—সুদূর অতীতে খাসিয়ারা ভারতের আসাম উপত্যকায় পাহাড় টিলার পাদদেশের গুহায় বসবাস করত। প্রায় ৬/৭ শ’বছর পূর্বে আসামের ভয়াল বন্যার স্রোতে খাসিয়ারা ভাসতে ভাসতে সিলেট চলে আসে। বানের পানিতে সভ্যতা-কৃষ্টির ভাষাগ্রন্থ, ধর্মগ্রন্থ সব কিছু হারিয়ে যায়।
জনশ্রুতি আছে যে, গোয়াইনঘাট ও মেঘালয়ের মাঝামাঝি সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় প্রথম দিকে একমাত্র খাসিয়াদেরই বসবাস ছিল। খাসিয়াদের প্রথম পুঞ্জি প্রধান বা হেডম্যানের নাম ছিল জাফরান লামিন। সাধারণ খাসিয়ারা তাকে জাফরান বাবু বলেই সম্বোধন করত। তখনও পুঞ্জি সংশ্লিষ্ট এলাকার কোন নাম ছিল না। ধারণা করা হয়, বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকে ভূমি জরিপের সময় বিভিন্ন এলাকার যখন নামকরণ ও মৌজায় বিভক্তি শুরু হলো তখন জনৈক ইংরেজ ভূমিকর্মকর্তা পুলিশসহ গোঁসাইঘাট তথা গোয়াইনঘাট ও মেঘালয়ের সীমান্তবর্তী খাসিয়া অঞ্চল সরেজমিনে পরিদর্শন করতে আসেন। বৃটিশ পুলিশদের সদলবলে দেখে উপস্থিত সাধারণ খাসিয়ারা একটু ভয় পেয়ে যায়। তাদের অঞ্চলের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা অনেকটা বোকা বনে যায়। তার অবশ্য কারণও আছে; কেননা দীর্ঘদিন থেকে তারা কেবল নিজেদের এলাকাকে পুঞ্জি বলেই জেনে আসছে। কিন্তু এটার যে লিখিত নাম রয়েছে সে স¤পর্কে উপস্থিত খাসিয়ারা জানে না বলে বিনয়ের সঙ্গে অপারগতা প্রকাশ করল।
শেষে ভ্রুকুঞ্চিত করে ভূমিকর্মকর্তা জিজ্ঞেস করেন—তোমাদের পুঞ্জি প্রধানের নাম কী? তারা উত্তরে বলে—জাফরান। খাসিয়াদের ‘ন’ উচ্চারণ প্রাক্কালে ‘নং’ বা ‘লং’ উচ্চারিত হয়। ইংরেজ ভূমিকর্মকর্তা মনে হয় একটু ভুলই শুনলেন। কিংবা যে হেডম্যানের নাম বলেছে সে কিছুটা ভয়েই বিকৃত করেছে। ইংরেজ ভূমিকর্মকর্তার কানে শব্দ পৌঁছল ‘জাফলং’ হিসেবে। ভূমিকর্মকর্তা কিন্তু এলাকার নাম ‘জাফলং’ লিখেই জরিপের কাজ শেষ করেছিলেন। সেই থেকে খাসিয়াদের প্রথম হেডম্যান জাফরান লামিন বাবুর নাম অনুসারেই পরবর্তীতে এই এলাকার নামকরণ হয়ে গেল জাফলং।
অপর জনশ্রুতিমোতাবেক, একসময় বৃহত্তর জৈন্তিয়ারাজ্য জুড়ে ছিল খাসিয়াদের অবাধ বিচরণ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে তখন তারাই ছিল সংখ্যাগুরু। মঙ্গোলয়েড খাসিয়া বা খাসি জাতির ভাষার নাম খাসি ভাষা। এই ভাষার স্থানীয় নাম খাসিয়া। খাসিয়া নৃগোষ্ঠী মঙ্গোলয়েড হলেও খাসি ভাষা অস্ট্রিক মোন-খেমর গোত্রের অন্তর্গত। ইংরেজি Khasis পারিভাষিক শব্দ থেকে বাংলা খাসিয়া শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। Khasis শব্দের অর্থ হলো born of the mother অর্থাৎ মায়ের জন্ম। এখানে Kha মানে হলো born বা জন্ম এবং sis মানে হলো ancient mother বা প্রাচীন মা। খাসিয়াদের বহুল ব্যবহৃত দুটি শব্দ Za-phlang। Za অর্থ পেছনে এবং phlang অর্থ খাস ভূমি। সুতরাং Za-phlang>Zaphlang শব্দের অর্থ হচ্ছে খাসিয়াদের নিজ ভূমি থেকে পেছনের জমি।
বিভিন্ন ভাষায় যেমন সমোচ্চারিত শব্দ রয়েছে তেমনই তাদের ভাষাতেও এমন বহু শব্দাবলি রয়েছে। Zaphlang এর মতো প্রায় সমোচ্চারিত দুটি শব্দ হলো Ja-phlang। খাসি ভাষায় Ja অর্থ হ্যাঁ আর ঢ়যষধহম অর্থ হচ্ছে হ্যাঁ বোধক নিজ ভূমি। খাসিয়ারা যে এ অঞ্চলের আদিবাসিন্দা এ শব্দদ্বয়ই সে ঐতিহাসিক বুৎপত্তি নিদের্শ করে। সুতরাং বলা যায়, জৈন্তিয়ারাজ্যের অন্তর্ভুক্ত জাফলং অঞ্চলটি একসময়ে খাসিয়াদের বসতি ছিল।
সময়ের পালাবদলে অনেক কিছুই বদলে যায়। পরিবর্তন হয় শাসকের, শাসনব্যবস্থার। খাসিয়াদের ক্ষেত্রেও তাই হলো। নিজেদের শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে একসময় জৈন্তিয়া ও জাফলং অঞ্চল তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ঐতিহাসিক পি আর টি গর্ডনের দি খাসি গ্রন্থে বর্ণনা রয়েছে এ রকম—The slop of the hills of the southern side is very steep until a table land is meet with at an elevation of about 4000 feet at charapunjee higher up there is another plates at Mawphlang (15 miles east of shilling). Phalang স¤পর্কে অক্সফোর্ড ডিকশনারি থেকে জানা যায় যে, Phalanger—Any of various arboreal mansupials of the family phalangaridac, including brush trailed possums. (From greek phalanggion, spider web from webbd tools of there hing fact.) (উল্লাহ, ২০১৭ : ১৫৯)
সুতরাং শাব্দিক ঐতিহাসিক বুৎপত্তিমোতাবেক বলা যায়, খাসিয়ারাই এ অঞ্চলের নামকরণ করেছে Ja-phlang (জা-ফ্লাং)। যা ইংরেজি ই¤িপরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে Ja-phlang (জা-ফ্লাং) শব্দটিতে এর স্থলে f দিয়ে জাফলং শব্দ লেখা হয়েছে)। এ শব্দটি বর্তমানে Jaflang , Jaflong এ দুভাবেই লেখা হচ্ছে। সামগ্রিক বুৎপত্তিটা এরকম—Za-phlang>Zaphlang> Japhlang>Japhlang> Jaflang> Jaflong। কালের প্রবহমানতায় ভাষার রূপান্তরের কারণে মানুষের মুখে মুখে কিছুটা বিকৃত হয়ে এ শব্দটি পরবর্তীতে হয়ে গেল জাফলং।

 

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মৃৎশিল্পের চিরকালীন মহিমা
  • পাক মিলিটারির ৭ ঘণ্টা ইন্টারগেশন
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ঐতিহ্যবাহী গাজীর মোকাম
  • ইসলাম ও ইতিহাসে মুদ্রা ব্যবস্থা
  • একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম সুলতানপুর
  • জাফলং নামকরণের ইতিকথা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • জলপ্রপাতের নাম হামহাম
  • কেমুসাসের কাচঘেরা বাক্সে মোগল স¤্রাটের হাতে লেখা কুরআন
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বরইতলা গণহত্যা সম্পর্কে আজিজুল হক
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম জলঢুপ
  • বাংলাদেশের বয়ন ঐতিহ্য
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ইতিহাস গবেষক দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী
  • লৌকিক শিল্প নকশি পিঠা
  • জেনারেলের বাড়িতে গণহত্যা
  • Developed by: Sparkle IT