শিশু মেলা

দুষ্টুদেরও বুদ্ধি আছে

মোহাম্মদ অংকন প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:৩২:৫৯ | সংবাদটি ৫২ বার পঠিত

সপ্তম শ্রেণির সবচেয়ে দুষ্টু ছাত্র শিশির। শুধুমাত্র তার দুষ্টামির জন্য বছর বছর স্কুল পাল্টাতে হয়। শিশিরের বাবা একজন সরকারি চাকুরীজীবী। তিনি খুব ভদ্র লোক। কিন্তু তার ছেলে যে এত দুষ্টু, তা কারও মাথায় আসে না। শিশির যখন ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণিতে উঠল, তখন কোনো মতে পাশ করেছিল। তাই ফলাফলের দিনই স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলেন, ‘আমরা আর শিশিরকে আমাদের বিদ্যালয়ে রাখতে চাচ্ছিনা। ও খুবই দুষ্টু ছাত্র, একদমই পড়ালেখা করে না।’ শিশিরের খারাপ ফলাফলের কারণে এমন একটি নিষেধাজ্ঞার জন্য সেদিন শতশত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সামনে তার বাবা-মাকে অপমানিত হতে হয়েছিল।
শিশিরের বাবা-মা একে অপরকে বললেন, ‘যাইহোক, ছেলে যতই দুষ্টু আর ফাঁকিবাজ হোক তাকে তো পড়ালেখা করাতেই হবে। কেননা, পড়াশোনা বন্ধ করে দিলে শিশির আরও বেশি দুষ্টু হবে।’ এমনটি ভেবে শিশিরের বাবা তাকে নতুন স্কুল নূরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সে বিদ্যালয়ের সবচেয়ে রাগি এবং ক্ষীপ্ত স্যার ছিলেন জনাব আরিফুল ইসলাম। শিশিরকে যেদিন ভর্তি করানো হল, সেদিনই ঐ রাগি স্যারের কাছে নিয়ে ওয়াদা করানো হল। স্যারের ভয়ে সে গড়গড়িয়ে শপথ করল, ‘আমি আর কোনো দিন দুষ্টামি করব না। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন করব। নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসব। শিক্ষক, বাবা-মা ও গুরুজনদেরকে শ্রদ্ধা করব। বন্ধুদের সাথে কখনও ঝগড়া করব না..।’ সেদিন ওয়াদা করার সময় স্পষ্টই বোঝা গেল, শিশির আজ হতে সত্যিই সত্যিই ভাল হয়ে যাবে।
দেখতে দেখতে ইতোমধ্যে সপ্তম শ্রেণির দুইটি মাস পেড়িয়ে যায়। শ্রেণির আরেক দুষ্টু ছাত্র তারিফের সাথে শিশিরের বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে। তারিফও এ বছরই অন্য একটি বিদ্যালয় থেকে বদলী হয়ে এসেছে। তার ফলাফলও তেমন ভাল না। তার এক শিক্ষিকার সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। তারিফের বাবা ও মা দুইজনই ডাক্তার। ব্যস্ততার জন্য ছেলের খুব একটা খোঁজখবর রাখতে পারেন না। তাই তার ছেলেটি এমন দুষ্টু হয়েছে। বাসায় একদমই পড়ালেখা করে না। তার বাবা-মা এখন কোনো কিছুতেই ওর দুষ্টামি থামাতে পারছেন না। লেখাপড়াতেও ভালো করাতে পারছেন না। বরং তারিফের কারণে সমাজে তাদের মুখ দেখানো মুশকিল হয়ে গিয়েছে এরকম অবস্থা এখন।
একই শ্রেণির দুই দুষ্টু শিশির ও তারিফ ধীরে ধীরে খুব ভাল বন্ধু হয়ে যায়। শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা নিয়ে বুদ্ধি পরামর্শ করে আর অন্যদিকে ওরা দুইজন দুষ্টু দুষ্টু বুদ্ধি তৈরি করে। কেমনে কাকে স্যারের কাছে মার খাওয়ানো যায়, কিভাবে স্কুল ড্রেস নোংরা করে দেওয়া যায় ইত্যাদি নানা দুষ্টু দুষ্টু বুদ্ধি তৈরি করে। হঠাৎ একদিন তাদের মাথায় শুভ বুদ্ধির উদয় হল। তাদের শ্রেণিতে বিজ্ঞান শিক্ষিক রোবট বানানো সম্পর্কে পড়িয়ে ছিলেন। তাই তারা দুইজন রোবট বানানোর পরামর্শ করল। শিশির বলল, ‘তারিফ, আমরা তো রোবট বানানো সম্পর্কে অনেক কিছু শিখলাম। চল না আমরা রোবট বানানোর চেষ্টা করি।’ তারিফ যেন ওর কথায় সহজেই একমত পোষণ করল এবং বলল, ‘খারাপ বলিস নাই তো রে! এবারের বিজ্ঞান মেলায় সবাইকে চমক দেখিয়ে দিব।’
সত্যিই দুইজনের পরামর্শ অনুযায়ী তারা রোবট বানানোর কাজ শুরু করল। বিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি ও বাজার থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করল। বিভিন্ন বই ও ইন্টারনেটের সহায়তাও নিল। রোবট বানানোর কাজের জন্য তারা কয়েকদিন শ্রেণিতে উপস্থিতির মাত্রা কমিয়ে দিলো। এতে সবার সন্দেহ হতে লাগল। অনেকে বলতে থাকল, ‘দুষ্টু দুইজন বোধহয় আর লেখাপড়া করবে না। স্কুলে আসাতো ছেড়েই দিয়েছে।’ একদিন স্যার তাদেরকে শ্রেণিতে দাঁড় করালেন। ‘কি ব্যাপার, তোমরা এমনিতেই অনেক দুষ্টু, তারপর শ্রেণিতে ঠিকমত আসছ না! এবার কি পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে?’ ওরা স্যারের কথায় চুপ থাকল। আর শ্রেণির সকলেই জোরে জোরে হাসল। এসব দেখে ওদের একটু লজ্জা হল। মনে মনে ভাবল, ‘এ লজ্জার প্রতিশোধ আমরা নিব।’
এভাবেই প্রায় বছরের ছয় মাস পেরিয়ে গেল। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শেষ হল। শ্রেণিতে খাতা দেখানোও শেষ হল। সবাই বেশি বেশি নাম্বার পেল। কিন্তু শিশির ও তারিফ যেন ৩৩ এর ঘর অতিক্রম করতে পারল না। তাদের বাবা-মা লজ্জায় পড়ে তাদেরকে শাসন করতে লাগলেন। কিন্তু তারা ব্যর্থ হলেন। বিপরীতে দেখলেন, ওরা দুইজন বিকালে মাঠে খেলা করে না। পরিবারের লোকজনের সন্দেহ হল। তারা ভাবলেন, ‘ওরা হয়তো কোনো মন্দ কাজে লিপ্ত হচ্ছে।’ আসলে ওরা নিয়মিত রোবট তৈরির কাজ করছে। ওরা পণ করেছে, ‘আমরা যদি সফলভাবে রোবট বানাতে পারি, তাহলে সবাইকে জানাবো। তার আগে নয়।’ তারিফ শিশিরকে বলল, ‘বন্ধু, শ্রেণিতে সবাই আমাদেরকে দুষ্টু বলে। এবার আমরা সবাইকে চমকে দিব। দেখিয়ে দিব, আমাদেরও বুদ্ধি আছে।’ ওর সাথে সুর মিলিয়ে শিশির বলল, ‘এবার বিজ্ঞান মেলায় শ্রেণির ভালো ভালো শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো কিছু করে প্রথম পুরষ্কার ছিনিয়ে নিবই আমরা।’
অল্প কিছুদিনের মধ্যে তাদের বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হল। শ্রেণিতে গিয়ে মেলায় স্টল নেওয়ার জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থীদের আহ্বান করা হল। শিশির দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমরা দুই বন্ধু একটি স্টল নিতে চাই।’ শ্রেণির সবাই একটু অবাক হল। অনেকেই বলল, ‘ওরা তো লেখাপড়াই করে না, তবে স্টল দিয়ে খাবার, চা, বিস্কুট বিক্রি করবে নাকি? হা! হা!’ এমন মন্তব্যে শ্রেণির অনেকেই হাসল। শিশির ও তারিফের ভীষণ রাগ হলো। কিন্তু স্যার থাকার কারণে ওদেরকে আঘাত করল না। নতুবা তারিফ ও শিশির দেখিয়ে দিত দুষ্টামি কাকে বলে! শ্রেণির সবার হাসাহাসি থামিয়ে বিজ্ঞান শিক্ষক রফিক স্যার ওদের নাম খাতায় লিখে নিলেন। এবং ওরা মেলায় একটি স্টল পেল। স্টলের নাম দেওয়া হল- ‘রহস্য’।
দিনব্যাপী শুরু হয়ে গেল বিজ্ঞান মেলা। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবাই সবার তৈরি জিনিসপত্র প্রদর্শনী শুরু করল। অনেকেই প্রযুক্তি নিয়ে অনেক কিছু বানিয়েছে। তাই আয়োজনটা বেশ জমজমাট হল। তাদের এ মেলা দেখতে প্রতিবারের মত এবারও প্রধান অতিথি হিসাবে জেলা শিক্ষা অফিসার আসলেন। তিনি ঘুরে ঘুরে সকল স্টল দেখছিলেন এবং কারা কেমন নতুন নতুন জিনিস প্রদর্শন করেছে তা দেখছিলেন ও নোটবুকে লিখছিলেন। যখন শিশির ও তারিফদের স্টলে আসলেন, তার চোখ যেন আটকে গেল। তিনি দেখতে পেলেন- ‘রহস্য’ স্টলে মানুষের মতই একটি রোবট দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন সামনে আসলে সেই রোবটটি সালাম দিচ্ছে। কুশলাদী জিজ্ঞেস করছে। শিক্ষা অফিসার তাদেরকে বাহ্ বা দিয়ে বললেন, ‘তোমরা এই মেলায় সবচেয়ে আর্কষণীয় কিছু তুলে ধরেছ যা তোমাদের বয়সীরা এখনও করতে পারে নাই। তোমরা রোবট তৈরির জন্য প্রথম পুরষ্কার পাবে। এগিয়ে চল খোকারা।’
পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সত্যিই সত্যিই শিশির ও তারিফের নাম প্রথমে ঘোষণা করা হল। তারা দু’জন আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বন্ধু, আমরা পেরেছি।’ তারা মঞ্চে উঠে পুরষ্কার গ্রহণ করল। বিদ্যালয়ের সবাই যেন হতবাক হল। ভালো ভালো শিক্ষার্থীরা যেখানে কিছু করতে পারল না, সেখানে দুই জন দুষ্টু ছেলে রোবট বানিয়ে অবাক করে দিল। তাদের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন সমাপনী বক্তব্য দিলেন। ‘প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, তোমাদের মত কিশোর-কিশোরীর মাথা জ্ঞান-বুদ্ধিতে ভরপুর। তার প্রমাণ আমাদের প্রিয় শিক্ষার্থী শিশির ও তারিফ। তারা যথেষ্ট দুষ্টু হওয়া সত্ত্বেও সবার থেকে আলাদা ও উন্নত চিন্তাধারার কিছু করেছে। তার মানে তোমরা চেষ্টা করলে সব পারবে। আর শিশির ও তারিফের প্রতি আমার উপদেশ, তোমরা যদি দুষ্টামি ছেড়ে দিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা কর, তাহলে তোমরা প্রতিবারই ভালো ফলাফল করতে পারবে। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। অতএব এবার বার্ষিক পরীক্ষায় তোমাদের ফলাফল যেন ভালো হয় সে আশা করছি।’ সেদিন শিশির ও তারিফ স্যারের জ্ঞানগর্ভমূলক কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল।
সময়ের গতিতে বছর ফুরিয়ে আসল। তারপর বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হল। ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে ফলাফলও প্রকাশ করা হল। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, শিশির প্রথম স্থান ও তারিফ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হল এবং প্রধান শিক্ষকের নিকট থেকে পুরষ্কার গ্রহণ করল। স্যার বললেন, ‘তোমরা দুষ্টু হলেও বুদ্ধিমান। আমরা চাই তোমরা প্রতিবারই এমন ফলাফল কর।’ শিশির ও তারিফের এমন সুন্দর ফলাফলে তাদের বাবা-মা খুব খুশি হলেন। সবাইকে গর্ব করে ছেলের কথা বলতে পারলেন। তারপর থেকে তারা সকল প্রকার দুষ্টামি ছেড়ে দিয়ে ভালো করে লেখাপড়া শুরু করে দিলো। বিদ্যালয়ের সকলেই তাদের বন্ধু হল। অনেকেই পড়াশোনায় সহযোগিতা নিতে লাগল। কেউ আর তাদের দুষ্টু বলে ডাকল না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT