শিশু মেলা

ছুটির ঘন্টা

মো ইব্রাহীম খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:৩৪:২০ | সংবাদটি ৩৩ বার পঠিত

টিফিন পিরিয়ডের সময় শামীম স্কুল মাঠের এক কোনে বসা। তার সাথে আরও কয়েকজন ক্লাসমেট বসে আছে। সবাই টিফিন খাচ্ছে। তারা মায়ের হাতে তৈরি খাবার খাচ্ছে। হাতে হাতে টিউবওয়েলের ফিল্টার করা বিশুদ্ধ পানির বোতল। শামীম সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, আমাদের মত অন্যরাও যদি টিফিন বক্সে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসত তাহলে স্কুলের দৃশ্য অন্যরকম হতো। কোন শিক্ষার্থীকে পেটের পীড়ায় ভোগতে হত না। বাজারের খোলা ভেজাল পুষ্টিহীন খাবার খাওয়া লাগত না। এসব খাবার মেধা বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করে। অনেক রোগ বালাইয়ের জন্ম দেয়। শামীমের কথাকে মাথা ঝাঁকিয়ে তার শ্রেণি বন্ধুরা সমর্থন করল। শামীম আবার বলল, তোরা যদি আমার সাথে থাকিস তাহলে আমি আমাদের নবম শ্রেণিকে মা বোনের হাতে রান্না করা টিফিন খাওয়ার মডেল হিসেবে দেখাতে চাই।
তুই তা কেমন করে পারবি? জিজ্ঞেস করে জুনু।
আমাদের ক্লাসের সব ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে মিটিং করব। বাজারের খোলা খাবারে কি কি ক্ষতি করে মানুষের দেহমনে। ঘরোয়া পরিবেশে তৈরি করা খাবার খেলে কি উপকার হয়। এসব তাদের বুঝাব।
তোর কথা কেউ শুনবে না। শুনলেও মানবে না। তাছাড়া এমন গ্রামীণ পরিবেশে টিফিন বক্স পানির বোতল ক্যারি করতে অনেকেই লজ্জাবোধ করবে।
আমাদের ক্লাসের সবাই মিলে সমাবেশ করে সিদ্ধান্ত নিলে ধীরে ধীরে একটা পরিবেশ সৃষ্টি হবে। আমাদেরকে অনুসরণ করে অন্য ক্লাসগুলোও অভ্যস্ত হয়ে ওঠবে। শামীম রুটির টুকরায় কামড় দিয়ে জুনুর কথার জবাব দিল।
চেষ্টা করে দেখতে পারিস। তোর সস্তা বয়ান কেউ কেউ আমল করতেও পারে। সত্যি যদি তোর এ উদ্যোগ সফল হয় তবে কিন্তু স্কুলের পরিবেশ খুব সুন্দর হয়ে ওঠবে। টিফিন পিরিয়ডে বাজারে যাওয়ার ঝামেলা নেই। স্কুল ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আমরা সবাই টিফিন বক্স খোলে নাস্তা খাচ্ছি। একে অন্যের সাথে অদল বদল করছি। এটা একটা অসাধারণ দৃশ্য। ভাবতেই ভাল লাগছে। বলে জুনু স্কুল ক্যাম্পাসের চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল।
শামীম খুব সহজেই নবম শ্রেণির সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হয়। সে ঘরে তৈরি রান্না করা খাদ্যের উপকারিতা বর্ণনা করে। বাজারে মানহীন ভেজাল খাবারের অপকারিতার ব্যাখ্যা দেয়। এখন সবাই বাড়ি থেকে টিফিন বক্স নিয়ে আসে। স্কুলের অন্যান্য শ্রেণিতেও তার এ উদ্যোগ সাড়া ফেলে। বাড়ির টিফিন খেয়ে অনেকের রোগ বালাই দূর হয়ে গেছে। বাথরুম সমস্যায় এখন কেউ আর অস্থির হয় না। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা এখন ছুটির দরখাস্ত নিয়ে তেমন ছুটাছুটি করে না। সবাই ছুটির ঘন্টার জন্যে অপেক্ষায় থাকে।
ছুটির ঘন্টা বাজার পরও অতিরিক্ত দশ পনের মিনিট পড়ানো ওমর স্যারের অনেক পুরানো অভ্যাস। তার এ অভ্যাসের জন্যে হেড স্যার ওমর স্যারের সাথে রাগারাগি করেছেন। ওমর স্যার সব সময় হেসে বলেন অংক বিজ্ঞানের ক্লাস স্যার। একটু বেশি সময় না দিলে ওরা অংক বিজ্ঞানে কাঁচা থাকবে। এতে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়। নিয়ম শৃঙ্খলা ভাঙ্গার কারণে যে কোন সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে। তাছাড়া ছুটির ঘন্টা বাজার পর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। ছুটির ঘন্টা বাজার সাথে সাথে পাঠদান শেষ করে শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করা উচিত। এ কথা হেডস্যার সবসময় বলে থাকেন। সকল শিক্ষকগণ এ কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে থাকেন। শুধু ওমরস্যার ব্যতিক্রম। তিনি হেড স্যারের এসব কথা না শুনার ভান করে আপন মনেই কাজ করেন। তিনি হেডস্যারের সব পরামর্শ মানেন। কিন্তু শেষ ঘন্টায় একটু অতিরিক্ত পড়াতে তিনি অতি আগ্রহী।
ছাত্র-ছাত্রীদের বেশি পড়ানোর ব্যাপারে ওমর স্যারের কোন ক্লান্তি নেই। তিনি নিজ বাড়িতেও বেঞ্চ ডেক্স চেয়ার সাজিয়ে রেখেছেন। সকাল বিকেল কিছু শিক্ষার্থীরা আসা যাওয়া করে। ওমর স্যারের প্রাইভেটের চার্জ কম। কমের ভেতর আরও কম দিলে স্যার হাসি মুখে টাকা গ্রহণ করেন। না দিলেও কড়াকড়ি করেন না।
আজ বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবার শান্তিপুর হাইস্কুলের সব শিক্ষক শিক্ষার্থীর মাঝে একটা তাড়া থাকে। কখন ছুটির ঘন্টা বাজবে। কে কার আগে বাড়ি ফিরে যাবে। কোন কোন স্যারের শেষ পিরিয়ড না থাকলে ছুটির ঘন্টা বাজার আগেই স্কুল ছাড়েন। শুধু ওমর স্যারের তাড়া নেই। তিনি নির্বিকার চিত্তে ক্লাস চালিয়ে যান। ছুটির ঘন্টা বাজা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই। বৃহস্পতিবারে শেষ ঘন্টা নবম শ্রেণিতে। তিনি নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন। ছুটির ঘন্টা বাজার সাথে সাথে স্কুল ক্যাম্পাস ফাঁকা। তাড়াহুড়া করে সবাই গেইটের বাইরে বের হয়ে যায়। কোথাও কেউ নেই। সব শ্রেণি কক্ষে তালা লাগানো হয়েছে। শুধু নবম শ্রেণি খোলা। ওমর স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। পিয়ন দুইবার জানালা দিয়ে উঁকি মেরে স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়। বেচারা বয়স্ক মানুষ। সারাদিন দৌড়ঝাপ খাটুনি। ওমর স্যারের বাড়াবাড়ি সময় ব্যয়ে পিয়নও খুব বিরক্তিবোধ করে। শামীম বুঝতে পেরে তাকে ইশারায় চলে যেতে বলে। পিয়ন তালা খোলা রেখে চলে যায়। শামীম প্রায় সময় স্কুলের বিভিন্ন কাজে পিয়নকে সহযোগিতা করে থাকে। ওমর স্যার শান্তি মনে ক্লাস শেষ করেন। তিনি ক্লাস হতে বের হন। সাথে সাথে সবাই হুড়াহুড়ি করে বাড়ির দিকে ছুটে। শামীম দরজা জানালা লাগাতে শুরু করে। আজ জুনু শামীমকে সাহায্য করছে। একটি জানালা লাগাতে গিয়ে জুনুর বাম হাতের আঙুলে আঘাত লাগে। সে মাগো বলে চিৎকার করে ওঠে। শামীম ছুটে আসে জুনুর কাছে। সে জুনুর হাত ধরে। ফিনকি দিয়ে টকটকে লাল রক্ত বের হচ্ছে। উদ্বিগ্ন শামীম এখন কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। সে শ্রেণিকক্ষ হতে বের হয়। চারদিকে তাকিয়ে দেখল স্কুল ক্যাম্পাসে কোথাও কেউ নেই। জুনুর আঙুল দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরছে। সে দৌড়ে যায় সিএনজি স্ট্যান্ডে। একটি সিএনজি ভাড়া করে। জুনুকে সিএনজিতে উঠিয়ে ছুটে যায় থানা সদরের হাসপাতালে।
জুনুর আঙুল হতে রক্তঝরা বন্ধ হচ্ছে না। শামীম স্কুল ড্রেসের সাদা শার্ট তার শরীর হতে খোলে জুনুর আঙুল চেপে ধরে আছে। জুনু খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। সে গা এলিয়ে দেয় শামীমের কাঁধে। সিএনজি থানা সদর হাসপাতাল গেইটে পৌঁছে। চালকের সাহায্য নিয়ে শামীম জুনুকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করায়। ডাক্তার জুনুকে দ্রুত চিকিৎসা দেন। ডাক্তার শামীমকে বলেন, জুনুকে বাঁচাতে হলে তার শরীরে রক্ত দিতে হবে। ব্লাড ব্যাংকে জুনুর গ্রুপের রক্ত নেই। শামীম কাঁদু কাঁদু সুরে বলে, যত রক্ত লাগে আমার শরীর হতে নেন। আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও ওকে বাঁচান স্যার। ডাক্তার তাকে একনজর দেখে বলেন, তুমি কিশোর। তোমার বয়স কম। তোমার শরীর হতে রক্ত নেয়া যাবে না। শামীম মহাসংকটে পড়ে যায়। সে চট করে চালকের হাত চেপে ধরে। তাকে অনুরোধ করে রক্ত দেয়ার জন্যে। চালক রাজী হয়। জুনুর শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। তার রক্তপড়া বন্ধ হলেও শরীর খুব দুর্বল। সে নিস্তেজ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। শামীমের মন খুব অস্থির। সে জুনুর শিয়রে মন খারাপ করে বসা। জুনুর দেহে ধীরে ধীরে রক্ত ঢোকছে।
বিকেলবেলা হেড স্যারের মোবাইলে ফোন আসে। জুনু হাসপাতালে। স্কুলের জানালা লাগাতে গিয়ে আঙুলে আঘাত পেয়েছে। রক্তক্ষরণে তার শরীর ফাংসা হয়ে গেছে। সে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। সংবাদটা শুনে হেড স্যার খুব বিচলিত হন। তিনি ওমর স্যারকে ফোন দেন। জুনু হাসপাতালে জেনে ওমর স্যারও উদ্বিগ্ন। দু’জন মিলে হাসপাতালে ছুটে যান। শামীমের মুখে পুরো ঘটনা শুনে ওমরস্যার খুব লজ্জিত হন। হাসপাতাল না হলে হেড স্যার ওমর স্যারকে দায়ী করে কিছু কথা শুনাতেন। হেড স্যার চোখ বড় বড় করে ওমর স্যারের দিকে তাকান। হেড স্যার চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন দেখেছেন তো কাঙালের কথা বাসি হলে ফলে।
ডাক্তার শামীমের প্রশংসা করে বললেন, সময় মত শামীম জুনুকে হাসপাতালে নিয়ে আসায় শেষ রক্ষা হয়েছে। বিলম্ব হলে জুনু রক্তশূন্যতায় মারা যেত। সমস্যা নেই। এখন সে নিরাপদ। বিপদমুক্ত। কাল সকালে তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন। ক্লাস টিচার রফিক স্যার রোলকল শেষ করে শামীমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কেমন আছ শামীম? চমকে ওঠে শামীম। সে ডানে বামে সামনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। অন্য কাউকে নয়। স্যার তার দিকেই জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছেন। তাছাড়া শামীম নামে এ ক্লাসে একজনই। শামীম বুঝতে পারছে না স্যার তাকে হঠাৎ কেন কুশলাদি এমন নরম গলায় জিজ্ঞেস করছেন। সে ভাল ছাত্র না। সে মধ্যম মানের চেয়েও নি¤œমানের ছাত্র। পড়া না শেখার জন্যে স্যার তাকে অনেক বকাঝকা করেছেন। কয়েকদিন সে হালকা শাস্তিও পেয়েছে। কোন কোন দিন রাগে গলার সুর বড় করে বলেছেন, তুকে দিয়ে কিচ্ছু হবে।
আজ এমন নরম গলায় তার ভালমন্দের খুঁজ খবর নেয়ায় শামীম অনেকটা অবাক হয়। পেছনের বেঞ্চে বসা শামীম। সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বিনয়ী গলায় বলে, জি স্যার ভাল আছি। ক্লাসের সব ছাত্র ছাত্রীরা স্যারকে বাড়ির কাজ দেখানোর জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। স্যার গৎবাঁধা কাজ রেখে শামীমের প্রতি এমন মনোযোগের কারণ খুঁজছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু কোন কারণ তারা খুঁজে পাচ্ছে না। অফ পিরিয়ডে তুমি আমার সাথে দেখা করো বলে রফিক স্যার শামীমকে বসতে বললেন।
স্যার সবার খাতা চেক করে বাড়ির কাজ দেখছেন। ক্লাস স্বাভাবিক গতিতে চলছে। রফিক স্যারের মত প্রবীণ জাদরেল শিক্ষক শামীমের মতো এমন দুর্বল ছাত্রকে গুরুত্ব দেয়ায় সব ছাত্র-ছাত্রীর মনে একটা অচেনা অজানা সংশয় অনুভূতিতে নাড়া দিচ্ছে। তারা একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ কেউ মাথা বাঁকা তেড়া করে শামীমকে নতুন করে একনজর দেখার চেষ্টা করছে। কয়েক জনের সাথে তার চোখাচোখি হয়।
সেও লজ্জায় লাল নীল হচ্ছে। স্যারের ক্লাসে ফিসফিস করার সাহস কারো নেই। সবাই মনে মনে অপেক্ষা করছে কখন স্যারের ক্লাস শেষ হবে। কখন ঘন্টা বাজবে। স্যার অবশ্য ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে ক্লাস ছেড়ে দেন। ঘন্টা বাজার পরপরই রফিক স্যার শামীমের দিকে আর একবার তাকিয়ে ক্লাস ত্যাগ করেন। ক্লাসের প্রায় সব ছেলে-মেয়েরা শামীমকে ঘিরে ধরে। রফিক স্যার কেন তাকে দেখা করতে বললেন। শামীম পড়েছে মহাবিপাকে। সে নিজেও জানে না রফিক স্যার তাকে কেন দেখা করতে বলেছেন। শামীমের মনের ভেতরেও এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করছে। কখন অফ পিরিয়ড আসবে। কখন স্যারের সাথে দেখা হবে। স্যার তাকে কি বলবেন?
রফিক স্যারের কাছে দুর্বল মানের ছাত্ররা যাওয়ার কল্পনা করতে পারে না। স্যারের সব সম্পর্ক শ্যুধুমাত্র ভাল ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে। শামীমের মত মানের ছাত্র স্যারের একান্ত সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য বলতে হয়। শামীম ভয়ে ভয়ে রফিক স্যারের কাছে যায়। তার বুক ধপধপ করে কাঁপছে। শামীম কাছে যেতেই রফিক স্যার হাসি হাসি মুখে বললেন, শামীম আগামী সোমবার উপজেলা অডিটোরিয়ামে তোমাকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। কথাটা শুনে শামীম তার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। রফিক স্যার একগাল হেসে আবার বললেন, আমার এক প্রবাসী ব্যবসায়ী বন্ধু একজন টিনএজার স্যোসাল ওয়ার্কারকে পুরস্কৃত করতে চায়। আমি তাকে তোমার দু’টি সামাজিক প্রশংসনীয় কাজের কথা বলেছি। সে শুনে খুব খুশি হয়েছে। সে তোমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্যে আনুষ্ঠানিকভাবে একটা ক্রেস্ট ও এক লক্ষ টাকার চেক দিবে।
রফিক স্যারের কথা শুনে শামীম খাবি খায়। তার মনে হচ্ছে সে স্যারের সামনে ঢলে পড়ে যাবে। দাঁত কিড়মিড় করে সে নিজেকে শক্ত করে। মাথা নীচু করে সে বিনয়ের সুরে স্যারকে জিজ্ঞাসা করল, স্যার আমাকে এখন কি করতে হবে।
তোমাকে কিছুই করতে হবে না। আয়োজকরাই সব ব্যবস্থা করছে। তুমি শুধু অনুষ্ঠানের দিন উপস্থিত হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করবে। বলে রফিক স্যার হো-হো করে হাসলেন। স্যার আপনি। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল শামীম।
হে-হে। আমি অবশ্যই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকব। আমার বাল্যকালের বন্ধু। দেশে এলে আমাকে ছাড়া সে কিছুই বুঝে না। তুমি কোন দুশ্চিন্তা করো না শামীম। এখন ক্লাসে যাও। বলেই রফিক স্যার মুখ কঠিন করে গম্ভীর হয়ে পড়লেন।
উপজেলা মিলনায়তন আজ বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সমাজসেবক সাইফুল ইসলাম প্রধান অতিথি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সভাপতি ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত। সাইফুল ইসলামের পক্ষ থেকে উপজেলার ত্রিশটি পরিবারকে একটি করে টিউবওয়েল দেয়া হবে। গৃহহীন বিশটি পরিবারকে গৃহনির্মাণ সামগ্রী দেয়া হবে। শামীম একটি ক্রেস্ট ও এক লক্ষ টাকার চেক পাবে। দানের তালিকায় আরও অনেক ছোট খাট ব্যাপার স্যাপার আছে। মিলনায়তন লোকে কানায় কানায় ভরা। শুরু হয় বক্তৃতাদানের পালা। সব বক্তাগণই সাইফুল ইসলামের প্রশংসা ও গুনগান গেয়ে যাচ্ছেন।
রফিক স্যার মাইকের সামনে দাঁড়াতেই শামীমের মনটা ধড়াস করে কেঁপে ওঠে। স্যার তার বন্ধুর বাল্যকালের কয়েকটি পরোপকারের ঘটনা বক্তব্যে তুলে ধরেন। একটি পাড়া গাঁয়ের হাইস্কুলে শামীমের আন্তরিক প্রচেষ্টায় টিফিন বক্স প্রথা চালু হয়েছে। আহত জুনুকে হাসপাতালে নিয়ে সুস্থ করেছে। ঘটনা দুটো বর্ণনা করেন স্যার। অদূর ভবিষ্যতে শামীম একজন সমাজকর্মী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়বে এমন প্রত্যাশা করেন তিনি। রফিক স্যারের মুখে এসব কথা শুনে শামীমের চোখে পানি এসে পড়ে। সে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না। তার চোখ হতে ফোটা ফোটা হয়ে পানি ঝরে পড়ছে। বিশেষ অতিথি, প্রধান অতিথি ও সভাপতি শামীমের কাজের প্রশংসা করেন। তখন অবশ্য শামীমের চোখের পানি টলমল করেনি। সে স্বাভাবিকভাবে বসে থেকে তাদের কথা শুনেছে।
পরের দিন শামীম স্কুলে এলো। তাকে ঘিরে শান্তিপুর হাইস্কুলের মাঝে অন্যরকম এক উত্তেজনা। স্কুলের ভাব এমন যেন কোন বিজয়ী বীর যুদ্ধ শেষে গ্রামে ফিরে এসেছেন। তাকে এক নজর দেখার জন্যে সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। শামীমের ক্লাসের বন্ধু-বান্ধবী উপরের ও নীচের শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। কেউ কেউ মিষ্টি খাওয়ার বায়না ধরছে। কয়েকজন শিক্ষকও শামীমের পক্ষ থেকে ভারি ভুড়ি ভোজন হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করছেন। শামীম নিজেও বুঝতে পারছে না এক লক্ষ টাকা দিয়ে সে কি করবে। কিছু কেনাকাটা আর শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আপ্যায়ন করলে টাকা প্রায় শেষ হয়ে যাবে। স্কুলের কোলাহলের মাঝেও শামীম গভীর ভাবনায় বিভোর। টিফিন পিরিয়ডের সময় শামীমকে টিচার্স কমন রুমে ডাকা হয়। হেড স্যারসহ সবাই বসা। দু’জন অচেনা লোক বসা। তাদের গলায় ক্যামেরা ঝুলানো। হেডস্যার তাদের সাথে শামীমকে পরিচয় করিয়ে দেন। তারা শামীমের ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হেড স্যারের পাশে এবং রফিক স্যারসহ অন্যান্য স্যারদের পাশে রেখে তারা শামীমের অনেকগুলো ছবি তুলে নেন।
সবশেষে একজন সাংবাদিক শামীমকে প্রশ্ন করেন, তুমি এক লক্ষ টাকা দিয়ে কি করবে? শামীম রফিক স্যারের দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি মেলে তাকায়। তারপর পকেটে হাত দেয়। চেকটি বের করে। সে চেকটা হেড স্যারের হাতে দিয়ে বলে, আমি আমার স্কুলের দরিদ্র তহবিলে এক লক্ষ টাকা দান করে দিলাম। শামীমের এমন ত্যাগ ও বদান্যতা দেখে উপস্থিত সবাই বিস্মিত হন। একজন সাংবাদিক হেডস্যারের হাতে চেক প্রদানের দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT