শিশু মেলা

মাইশার বাংলা স্কুল

জায়ান সরদার রাসেল প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:৩৪:৫০ | সংবাদটি ৬২ বার পঠিত

অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় থাকেন মি. আদনান। জাতীয়তা বাঙালি হলেও দীর্ঘদিন ক্যানবেরায় থাকায় অস্ট্রেলিয়ান সরকার সেদেশের নাগরিকত্ব দিয়েছে। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতা। কিছু বন্ধু মিলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার স্কুল করেছেন।
এই স্কুলের শিক্ষার্থীর তালিকা দেখে মাঝে মাঝে মি. আদনান নিজেই অবাক হয়ে যান। প্রবাসী বাঙালিদের সন্তানের চেয়ে বেশির ভাগই বিদেশীরা প্রাধান্য দিচ্ছে। বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতি তাদের কাছে অন্যরকম মনে হয়। এটা বাস্তব যে বাঙালিয়ানার ছিটে-ফোটাও চোখে পড়ে না অস্ট্রেলিয়াতে। কিন্তু তাদের এই প্রতিষ্ঠানটি মনে হবে এক টুকরো বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রথম দিকে পরিচিত অনেক বাঙালিকে তাদের বাচ্চাদের এখানে ভর্তি করার জন্য আদনান সাহেব অনুরোধ করেছিলেন। কেউ কেউ সাড়া দিয়েছেন। আবার অনেকেই ভীনদেশী সংস্কৃতির টানে নিজের দেশের সংস্কৃতিকে ভুলে গেছেন। হতাশ হলেও থেমে থাকেন নি আদনান। প্রচেষ্টা সফল করার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ চালিয়ে গেছেন এবং সফল হয়েছেন।
তার মূল লক্ষ্য বাংলাকে বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দেয়া। স্বল্প পরিসরে তার স্কুল তৈরি হলেও বেশ সুন্দর আর গোছালো। আদনান সাহেব যখন ক্লাস নিতেন শিক্ষার্থীরা হা করে তাকিয়ে থাকতো। এত সুন্দর করে গুছিয়ে বোঝাতেন এবং শেখাতেন যা শিক্ষার্থীদের আনন্দ আর উৎসাহ দুটোই বাড়িয়ে দিতো।
একদিন ক্লাস শেষ করে ঘরে ফিরছিলেন। হঠাৎ তার বাঙালি এক বন্ধুর পরিবারের সাথে দেখা। আদনান সাহেব তার বন্ধুকে তার স্কুলের ব্যাপারে বললেন এবং তার মেয়ে মাইশাকে ভর্তি করানোর অনুরোধ জানালেন। নাক সিটকে বন্ধুটি তার সাথে যোগাযোগই বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু তার বন্ধুর স্ত্রী চাইতো মাইশা যেন বাংলাকে ভুলে না যায়। প্রথম দফায় অনেক বার তার স্বামীকে বুঝাতে চাইলেও সায় দেন নি তিনি। মাইশার মা ঠিক করলেন বাবার অজান্তেই মাইশাকে ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাবেন। তিনি যোগাযোগ করলেন আদনানের সাথে। আদনান সাহেব মাইশার আগ্রহ দেখে রাজি না হয়ে পারলেন না।
মাইশা আট বছরের ছোট ফুটফুটে মেয়ে। ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাও বেশ বলতে পারে। অবশ্য মায়ের বদৌলতে এসব শেখা। মাইশার বাবার অগোচরেই চলছে তার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখা।
এরই মধ্যে স্কুলে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। মাইশা ইতোমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থীর মধ্যমণি হয়ে উঠল। মাইশার ও তার মায়ের ইচ্ছা, প্রতিযোগিতায় যেন মাইশা প্রথম হয়।
মাইশার বাবা সকাল সকাল অফিসে চলে গেলেন। প্রোগ্রাম আজকেই। তাই মাইশার মা তাকে সাজাতে ব্যস্ত। মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,
- বলতো আম্মু আজকে তোমাদের কম্পিটিশনের প্রাইম গেস্ট কে?
- আদনান আংকেল!
- না, তিনি তো অবশ্যই থাকবেন। কিন্তু প্রাইম গেস্ট এসেছেন যেখানে তোমার নানু বাড়ি!
- বাংলাদেশ?
- হুম। বাংলাদেশের কালচারাল মিনিস্টার।
- আচ্ছা আম্মু আমরা নানু বাড়ি কবে যাবো?
- যাবো মা। তোমার বাবা ছুটি পেলেই যাবো।
সকাল দশটায় অনুষ্ঠান শুরু হলো। একে একে প্রতিযোগিরা পারফর্ম করছে। সেখানকার অনেকেই ফেইসবুক লাইভে গিয়ে অনুষ্ঠান দেখাচ্ছেন সবাইকে। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলেও প্রচার হচ্ছে। মাইশার বাবা ওইদিকে অফিসের কাজে ব্যস্ত। আর এদিকে তার মেয়ে মঞ্চে পারফর্ম করার জন্য প্রস্তুত।
ছোট্ট ফুটফুটে মাইশা নাচ শুরু করে দিয়েছে বাংলা লোকগানের তালে। মাইশার মা তার বাবাকে ফেইসবুক লাইভ দেখার অনুরোধ করলেন।
ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হতবাক মাইশার বাবা। এ কি আমার মেয়ে?
মাইশার বাবার চোখে কান্নার ছাপ আর অপরাধবোধ কাজ করছে।
পারফর্ম শেষে মাইশা ভাসছে শুভেচ্ছায়। আর তার বাবা তার ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় ভুগছে...!
এদিকে আদনান সাহেব মাইশার এমন সাফল্যে অভিভূত। একজন আদনানের বদৌলতে মাইশার মত প্রতিভা তার নিজের মত করে মেলে ধরতে পেরেছে। এটাই আদনান সাহেবের সাফল্য। আর সাথে বাঙালি ললনার লুকায়িত শক্তি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT