সম্পাদকীয়

প্রাইভেট টিউশনে ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী

প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:৩৫:২৭ | সংবাদটি ৫৪ বার পঠিত

শিক্ষার্থীদের ৯২ শতাংশই প্রাইভেট টিউশনের পেছনে ছুটছে। এই তথ্যটি বেরিয়ে এসেছে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়-প্রাইভেট টিউশন একটা বৈশ্বিক বিষয়। এতে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও গার্হস্থ্য অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্ববাজারে এর অর্থমূল্য দাঁড়াবে দু’শ ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশী টাকায় যার মূল্য ১৯ লাখ ছয় হাজার একশ’ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়-চীন, স্পেন ও আজারবাইজানসহ বিশ্বের বহু দেশে মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী জরিপে দেখা গেছে এদের অন্তত অর্ধেকের ক্ষেত্রে প্রাইভেট টিউশন একটা বাস্তবতা। কোরিয়া প্রজাতন্ত্রে প্রাথমিক স্তরে ৮১ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরে ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবেশী দেশ ভারতে টিউশনের পেছনে ছুটছে ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী।
আমাদের দেশে রীতিমতো বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে এই টিউশন বা কোচিং। অভিভাবকগণ ছেলে-মেয়েদের পেছনে শিক্ষা ব্যয়ের ৩০ শতাংশই ব্যয় করছেন টিউশন এর পেছনে। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত জরিপে পাওয়া গেছে, এই ভয়াবহ তথ্য। এতে আরও বলা হয়, শিক্ষা ব্যয়ের ১৮ শতাংশ ব্যয় হয় বই খাতাসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ কেনার পেছনে। যাতায়াত ও টিফিন বাবদ ব্যয় হয় ১৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে আমাদের লেখাপড়া হয়ে ওঠেছে টিউশন নির্ভর। বিশেষ করে শহর অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ছে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য তারা সাহায্য নিচ্ছে কোচিং বা টিউশনের। এতে অভিভাবকদের গুণতে হচ্ছে মোটা অংকের ফি। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত লেখাপড়া হলে, শিক্ষকেরা পাঠদানে মনোযোগী হলে শিক্ষার্থীদের টিউশনের প্রতি ঝুঁকতে হবে না।
দেশে এখন ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে সেখানে গড়ে ওঠেছে কোচিং সেন্টার। রঙিন পোস্টার, বেনার, ফেস্টুন, হ্যান্ডবিল আর মিডিয়ায় রংছটা বিজ্ঞাপন দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে এই সব কোচিং সেন্টার। প্রচারের এই চটকদারীতে আকৃষ্ট হচ্ছেন শিক্ষার্থী-অভিভাবকেরা। মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত লেখাপড়া না হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকে পড়ছে টিউশন বা কোচিং সেন্টারের দিকে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাংখিত লেখাপড়া হয় না। হাতে গোনা কিছু বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে বিরাজ করছে শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যা। তাছাড়া, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ক্লাসে পাঠদানে অমনযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। দেখা গেছে, অনেক শিক্ষক ক্লাসে যথাযথ মনোযোগ না দিয়ে টিউশনের প্রতি আকৃষ্ট করছেন শিক্ষার্থীদের।
টিউশন বাণিজ্য এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় শিক্ষার্থী টিউশনের দিকে ঝুঁকে আছে। ইউনিসেফ-এর পরিসংখ্যান মতে, এখানে মাত্র আট শতাংশ শিক্ষার্থী রয়েছে টিউশনের বাইরে। বিশিষ্টজনদের মতে, দেশে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে একটা অশুভ ও দুষ্ট চক্র তৈরি হয়েছে। এরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। গত প্রায় ছয় বছর আগে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। তখন কোচিং বাণিজ্য বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছিলো। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সর্বপ্রথম জরুরি হচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে শতভাগ মনোনিবেশ করা। আর এই ব্যাপারে শিক্ষকদের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। সর্বোপরি দরকার সরকারের কঠোর পদক্ষেপ।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT