উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফারুক আহমদ

ফখরুল ইসলাম মাসরূর প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:৩৬:০০ | সংবাদটি ৭৬ বার পঠিত

মরহুম ফারুক আহমদ চেয়ারম্যান ছিলেন সমাজসেবার বিস্তৃত ময়দানে এক পরিচিত নাম। সফলতা ও প্রশংসা যার অনুগামী হতো। এই কৃতি পুরুষের স্মৃতি ও অবদান আজো মানুষকে কাঁদায়। যখন কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর ইউনিয়ন হালের চেয়ে দ্বিগুণ বিস্তৃত ছিল, বর্তমানে যেটা পূর্ব ও পশ্চিম ইসলামপুর নামে দু’টি ইউনিয়ন হয়েছে, সেই বিস্তৃত ইউনিয়নের গণমানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে টানা দুইবারের (১৯৮৪-১৯৯২) নন্দিত চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। দুই টার্মে পূর্ব ও পশ্চিম সমন্বয়ে চার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। আজো তার নামের সাথে একীভূত হয়ে আছে ‘চেয়ারম্যান’ উপাধি।
১৯৪৬ সালে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফারুক আহমদ। ৫৪ বছরের জীবনাবসান ঘটিয়ে ২০০০ সালের ২৪ মে ইন্তিকাল করেন তিনি। রেখে যান স্ত্রী, ৩ ছেলে ৪ মেয়ে ও আত্মীয়স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী। ১৯৫৯ সালের ২২ মে পিতা ইদ্রিস আলী মাস্টারের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে নিজের লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে ভাইবোনদের লেখাপড়া ও পিতার ত্যাজ্য সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে ছাতক শহরের বাঘবাড়ী নিবাসী নুরুল ইসলাম কমান্ডারের কন্যা আনোয়ারা বেগমের সাথে পরিণয়ে আবদ্ধ হন। সংসার পরিচালনার পাশাপাশি সমাজের উন্নয়নমূলক কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রাখতেন।
১৯৭১ সালে যখন মহান মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে, তখন তিনি এলাকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে নিজের বাড়ীতেই আলোচনা-পর্যালোচনা ও মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করতে সর্বপ্রকার পরামর্শ করতেন। তার তৎপরতায় মহান মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ হয়ে শত শত যুবক, শ্রমিক ও ছাত্রজনতা মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫নং সেক্টরের অধীনস্থ ভোলাগঞ্জ সাব-সেক্টরে প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতে গিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে দখলদার পাকবাহিনীর বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই কারণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে পরিচিত।
মরহুম ফারুক আহমদ ব্যবসার তাগিদে ছাতকে সপরিবারে অবস্থান করতেন। তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও এলাকার মানুষের প্রচেষ্টায় ১৯৮৪ সালে তিনি বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে ইউনিয়নবাসীর খেদমতের ফলে ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় দফা চেয়াম্যান নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। লেখাপড়ার প্রতি, আলোকিত মানুষ গড়ার প্রতি তার ছিল বিশেষ অনুরাগ। তার কঠোর পরিশ্রম ও নিরলস সাধনার ফলে আজ কোম্পনীগঞ্জের পাড়–য়া আনোয়ারা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার দীপ্তি ছড়াচ্ছে দেশ ও জাতির কল্যাণে। তিনি ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আজীবন ছিলেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। ছিলেন পাড়–য়া নোয়াগাঁও ইসলামিয়ার দাখিল মাদরাসার সহসভাপতি। ভোলাগঞ্জ আরাবিয়া হাফিজিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা তারই ভূমির উপর দাঁড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে। সমাজে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ন বিচারক। গ্রাম-সমাজ-এলাকা, সর্বব্যাপী ছিল তার প্রভাব। পক্ষ-বিপক্ষ তাকে আপনজন বলে জানতো। ন্যায়ের কথা বলতেন নির্ভীক চিত্তে। সত্য প্রকাশে ছিলেন উচ্চকন্ঠ। সাহসী, সদালাপী, প্রতিবাদী ও দরদী ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন সুপরিচিত। আলেম-ওলামাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ¯েœহ করতেন। তাদের ভালবাসতেন নিঃস্বার্থ।
ফারুক আহমদ চেয়ারম্যান ১৯৯৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সিলেট শহরের লাইফ কেয়ার ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। এখানে ক্যান্সার ধরা পড়লে উন্নত চিকিৎসার্থে ভারতের কলকাতায় ডাক্তার এসএম ঘোষের তত্ত্বাবধানে এক সপ্তাহ নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর ঢাকা ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে ভর্তি কর হয়। অতঃপর অবস্থার অবনতি ঘটতেই থাকে। পরিশেষে ২৪ মে ২০০০ ইংরেজি দিবাগত রাত ১২ টা ১৪ মিনিটে নিজ বাড়ীতে ইন্তিকাল করেন। ২৫ মে ২০০০ ইংরেজি বাদ আসর বর্তমান ভোলাগঞ্জ মাদরাসা মাঠে তার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় বিভিন্ন এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি তার প্রতি তাদের আস্থা-বিশ্বাস ও ভালবাসার অনন্য নজির ফুটে ওঠে। তার স্মৃতি রক্ষার্থে ২০০০ সালেই গঠন করা হয় ‘মরহুম ফারুক আহমদ স্মৃতি পরিষদ’। আজ অবধি অব্যাহত আছে এর ধারাবাহিক কার্যক্রম। প্রতিবছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় মেধাবৃত্তি। মরহুম ফারুক আহমদ স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে তার মৃত্যুর এক যুগ পুর্তি উপলক্ষে প্রকাশ করা হয় বিশেষ স্মারকগ্রন্থ। যেখানে তার জীবনের বিভিন্ন দিক উঠে আসে বিজ্ঞজনের কলম থেকে। আল্লাহপাক মরহুমকে জান্নাতের উঁচু মাকামে স্থান দান করুন, আজ তার মৃত্যুদিবসে এই কামনা।
লেখক : শিক্ষাসচিব, ভোলাগঞ্জ আরাবিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • পানিশূন্য তিস্তা
  • বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?
  • পরিবহন ধর্মঘট এবং জনদুর্ভোগ
  • পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি
  • শব্দসন্ত্রাস
  • মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ
  • Developed by: Sparkle IT