উপ সম্পাদকীয়

বিশুদ্ধ প্রেমের কবি নজরুল

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৫-২০১৮ ইং ০১:৪৬:০৪ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

বিদ্যাসাগর-মধুসূদন-বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যের রাত্রির অন্ধকারে স্তব্ধ সবকিছু ভেঙে দিয়ে নতুন আলোর বন্যা এনেছিলো। সেই আলোর ঝরনা ধারায় কাজী নজরুল ‘একতারা যন্ত্রের একটানা’ সুরের পরিবর্তন করে নতুন তার যোজনা করে বীণা যন্ত্রে তুলেছেন দীপক রাগিনীর ঝংকার। তাঁর প্রেম ও বিদ্রোহের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। প্রেম ও বিদ্রোহ আপাত দৃষ্টিতে দুই মেরুর বিষয়। একটি চায় সৃষ্টি, চায় সমন্বয়। অন্যটি চায় ধ্বংস এবং স্বাতন্ত্র্য। প্রেম মহত্ব দেয় বিদ্রোহকে আর বিদ্রোহ ভাষা দেয় প্রেমকে। কাজী নজরুল মূলত রোমান্টিক কবি। তাই তিনি উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন অসামান্য চরণÑ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী/আর এক হাতে রণ তূর্য।’
২.
বিশুদ্ধ প্রেমের কবি নজরুল। তাঁর ভিতরে তারুণ্য ছিল চমৎকার। নানা দিক দিয়ে তিনি একজন সহজ মানুষ ছিলেন। আবার তিনি জ্ঞানী ও প্রেমিক ছিলেন। তবে প্রেমের সাধনাই মূলত নজরুলের সাধনা হয়েছে। লেখকদের জীবনে প্রেম আসে, প্রেম যায়। এ যেনো নিয়তির খেলা। সে-ই খেলায় আমাদের বিদ্রোহের কবি, সাম্যের কবি, বুলবুলের কবি হিসেবে পরিচিত কাজী নজরুল ইসলাম-এর জীবনেও প্রেম এসেছে, প্রেম ভেঙে গেছে। এসব প্রেমের মধ্য থেকে নজরুল গবেষকরা দুই জন প্রেমিকার নাম খনন করে এনেছেন। আর এই দুই ভাগ্যবতী রমণী হলেন নার্গিস এবং প্রমিলা দেবী। প্রথমে নার্গিস সম্বন্ধে একটু জানার চেষ্টা করি-
৩.
নজরুলের জীবনে প্রথম প্রেম হয়ে এসেছিলেন নার্গিস। যার প্রকৃত নাম সৈয়দা খানম। কবি নজরুল ১৯২১ সালের মার্চ মাসে কুমিল্লা বেড়াতে যাওয়ার সুবাদে নার্গিসের সঙ্গে পরিচয় ও প্রণয় হয়। এক রাতে কবি নজরুল দীঘির ঘাটে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। আর সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হন তরুণী নার্গিস। এরপর নজরুলের এই বাঁশি বাজানো নিয়ে একদিন নার্গিস কবির সঙ্গে আলাপ করেন। এই আলাপ-পরিচয়ের পরই নজরুল নার্গিসের প্রেমে পড়ে যান। এক পর্যায়ে কবি নার্গিসকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন। তারপর নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের বিয়ের আক্্দ হয়। কিন্তু কাবিননামা সম্পাদনের সময় কবিকে ঘরজামাই হয়ে থাকতে হবে-এমন শর্ত জুড়ে দেওয়ায় খেপে গিয়ে নজরুল বিয়ের রাতেই নার্গিসকে ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। দীর্ঘ ১৬ বছর নজরুলের সঙ্গে নার্গিসের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। এখনকার মতো কথা বলার এতো নেটওয়ার্কও তখনকার সময় ছিল না। তাই রিলেশন সজীব রাখার কোনো পথ নার্গিসের কাছে ছিলো না। বিরহ কাতর নার্গিস নিরুপায় হয়ে ১৯৩৭ সালে নজরুলকে এক চিঠি লিখেন। চিঠিটা নজরুলের হাতে যেভাবেই হোক পৌঁছায় এবং পত্র পাঠ করে নজরুল একটি গান লিখে নার্গিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। গানটি হলোÑ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই/কেন মনে রাখ তারে/ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে/আমি গান গাহি আপনার দুখে/তুমি কেন আসি দাঁড়াও সমুখে/আলেয়ার মতো ডাকিও না আর নিশীথ অন্ধকারে.....। ১৯৩৭ সালে নজরুল নার্গিসকে আর একটি চিঠি লেখেন। তবে এর বছর খানেক আগেই নাকি নজরুল এবং নার্গিসের ডিভোর্স হয়ে যায়।
৪.
দ্রোহের কবি নজরুলের জীবনে দ্বিতীয় যে নারী এসেছিলেন এবং যাকে নজরুল লাইফ পার্টনার করেছিলেন, সেই সৌভাগ্যবতী নারী হলেন প্রমিলা দেবী। কে এই প্রমিলা দেবী? একটু চেষ্টা করি খোঁজে বের করতেÑখোঁজে ফিরি এই ক্ষণে স্মৃতির লগনে! নার্গিসের বিয়ে বাসর থেকে পালিয়ে নজরুল কুমিল্লারই এক বাড়িতে উঠেন। সেই বাড়ির কর্ত্রী ছিলেন বিরজা সুন্দরী দেবী। নজরুল তাঁকে মা বলে ডাকতেন। কুমিল্লা’র মেয়ে নার্গিসের সাথে প্রেমের অসমাপ্ত কাহিনী বিরজা’র কাছে গোপন রেখে নজরুল বিরজা দেবীর বিধবা জা গিরিবালা দেবী’র কন্যা আশালতা সেন গুপ্তা’র সঙ্গে পরিচিত হন এবং প্রেমের জোয়ারে হাবুডুবু খেতে থাকেন। তিন বছর পর নজরুল এই আশালতাকে বিয়ে করেন। প্রমিলা নামে নজরুল তাঁকে ডাকতেন। ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল নজরুল-প্রমিলা’র বিয়েতে এক মাত্র বাধা ছিল ধর্ম। তবে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল স্ব-স্ব ধর্ম পরিচয় বহাল রেখেই। বিয়ের সময় নজরুলের বয়স ছিল ২৩ আর প্রমিলার বয়স ১৪ বছর। এই ধৈর্যশীল নারী প্রমিলা আমৃত্যু সুখ-দুঃখের পর্ব অতিক্রম করে নজরুলের সফল লাইফ পার্টনার হিসেবে সংসার করে গেছেন। ‘বিজয়িনী’ কবিতায় নজরুল প্রমিলাকে নিয়ে রোমান্টিক কিছু কথার ঢালি সাজিয়েছেন।
৫.
এভাবে দোলন চাপা, বিদ্রোহী, চক্রবাক, ছায়ানট, পূবের হাওয়া, সিন্ধু হিন্দোল প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে নজরুল মনোরম ভাষায় প্রেমের চাপল্য ও অস্থিরতা অভিব্যক্ত করেছেন। কিন্তু চিরজনমের প্রিয়া নার্গিসকে কবি কখনো ভুলতে পারেন নি। আর পারেন নি বলেই নান্দনিক এই সব কাব্যগ্রন্থের কিছু কিছু জায়গায় নার্গিসকে স্মরণ করে নজরুল অসাধারণ সব পঙ্ক্তিমালা রচনা করে গেছেন। যেমনÑ
‘ব্যর্থ মোদের গোধূলীÑলগন/এই সে জনম নহে/বাসর শয়নে হারায়ে তোমায়/পেয়েছি চির-বিরহে---
আরও বেদনা-বিধুর ভাষায় ‘চক্রবাক’ কাব্যগ্রন্থের ‘চক্রবাক’Ñকবিতায় নজরুল নার্গিসকে মনে করেই রচনা করে গেছেন মর্মস্পর্শী এই কথার মালাÑ‘এপার-ওপার জুড়িয়া অন্ধকার/মধ্যে অকুল রহস্য পারাবার/তাঁরি এই কূলে নিশি কাঁদে জাগি/চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি---
৬.
কবি নজরুল দৃপ্তকন্ঠে নারী সমাজকে সচেতন হবার জন্যে তাঁর কাব্যে বলেছিলেনÑ
‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা/জাগো স্বাহা সীমান্ত রক্ত টিকা/দিকে দিকে ফেলি তব লেলিহান রসনা/নেবে চল উন্মাদিনী দিগ্বসনা--- --- ---/চির বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা।’ সে-ই নজরুল ইসলাম নার্গিসের প্রেমের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন নি বলে মর্মাহত হয়ে গভীর অপরাধী মনে করেছিলেন নিজেকে। অবসাদের কারণেই নাকি নজরুলের মস্তিষ্কের ¯œায়ুগুলো চিরদিনের জন্যে বিকল হয়ে গিয়েছিলো এবং প্রেমের কবি নজরুল আমাদের সকলের ‘দুখু মিয়া’ নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন, নজরুল গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ সেটা মনে করেন। কারণ নজরুলের একটি সঙ্গীতের চমৎকার কিছু কথায় নাকি নজরুল গবেষকরা সেটা অনুমান করতে পেরেছেন। সকরুণ সে-ই সঙ্গীতের বাণীÑবুলবুলি নীরব নার্গিস বনে/ঝরা বন গোলাপের বিলাপ শুনে/বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে-----
৮.
যাহোক, কবি নজরুলের নীরবতা নিয়ে নজরুল গবেষকরা ভিন্ন ভিন্ন মতামত এবং তথ্য দিয়েছেন। তবে সকল তত্ত্ব, তথ্য ও সমালোচনার দুয়ারে অর্গল দিয়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, দ্রোহ ও প্রেমের কবি নজরুল একটা সময় সরব ছিলেন, হাসি-খুশি ছিলেন। সে-ই দূরন্ত-দুর্বার সময়ে তাঁর জীবনে কুমিল্লার বন্ধু আলি আকবর সাহেবের ভাগিনী নার্গিস এসেছিলেন প্রেমের বেহালা নিয়ে। সেই বেহালায় নজরুল হয়তো ভুল করে সুর তোলার চেষ্টা করেন নি। তবে প্রমিলা দেবীর প্রেমকে তিনি মর্যাদা দিয়েছিলেন। এটাই সত্য, সুন্দর হয়ে কবির জীবনকে সামগ্রিকভাবে সহজ করে দিয়েছিল। আরও অনেক প্রেয়সী নজরুলের জীবনে উদ্যাম প্রেমের সু-বাতাস বইয়ে দিয়েছিলেন বলে নজরুল গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে তাঁরা তাঁদের নামসহ পুরো ইতিহাস খুঁড়ে বের করে আনতে পারেন নি। ভবিষ্যতের নজরুল গবেষকরা হয়তো সেটা পারবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
৯.
সর্বকালে বিশুদ্ধ প্রেমের রোমান্টিক কবি হিসেবে নজরুল তাঁর অগ্নিবীণায় সুর তোলে সকল নবীন লেখককে প্রেরণা দিয়ে যাবেন। প্রিয় এই কবির জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে অজ¯্র শ্রদ্ধাঞ্জলী। বাংলা সাহিত্য বাগিচার বুলবুল আমাদের কবি নজরুল তন্দ্রাতে তুমি ব্যাকুল হয়ে থাকো, আমরা তোমায় জাগাবো না। কারণ, ঘুমিয়ে গেছো তুমি শান্ত হয়ে বাংলা সাহিত্যের বুলবুলি। আর তোমার জন্যে সজল জলে ভিজে গেছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি! ঘুমিয়ে গেছো শান্ত হয়ে----।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • পানিশূন্য তিস্তা
  • বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?
  • পরিবহন ধর্মঘট এবং জনদুর্ভোগ
  • পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি
  • শব্দসন্ত্রাস
  • মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ
  • Developed by: Sparkle IT