উপ সম্পাদকীয়

ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ কাম্য

মো. মাঈন উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৫-২০১৮ ইং ০১:৪৮:৩৬ | সংবাদটি ৬৪ বার পঠিত

সারা দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন। আমার মতে, ভিক্ষুক বাড়ার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেশে ধনবৈষম্য বাড়ছে। ধনী শ্রেণি আরও ধনী হচ্ছে, গরিব হচ্ছে আরও গরিব। নানা পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে মানুষ ভূমিহীন, কপর্দকহীন হয়ে পড়ছে। সহায়সম্বলহীন মানুষের স্বাভাবিক আয়ের উৎস সংকুচিত হয়ে আসছে। এ অবস্থায় ভিক্ষার মতো অসম্মানজনক বৃত্তি অনেকে বেছে নিচ্ছে। ভিক্ষা আসলে স্বীকৃত কোনো পেশা নয়। ভিক্ষা হলো মানুষের দান ও করুণার ওপর বেঁচে থাকার একটা চেষ্টা মাত্র। দ্বিতীয়ত, ভিক্ষায় তেমন কোনো শ্রমের শিকার হতে হয় না। অথচ টাকার অঙ্কে দৈনিক প্রাপ্তি কারখানায় শ্রমিক-মজুর, রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালার চেয়ে অনেক বেশি। অনেকে তাই ভিক্ষাকেই বেছে নিচ্ছে রুজি-রোজগারের মাধ্যম হিসেবে। ভিক্ষা এখন লাভজনক ব্যবসাও বটে। ভিক্ষুক নয়; কিন্তু ভিক্ষুকদের জড়ো করে কিংবা বাধ্য করে তাদের দিয়ে ভিক্ষা করিয়ে লাভবান হচ্ছে অনেকেই। এটা তাদের কাছে ব্যবসামাত্র। শিশুদের চুরি বা অপহরণ করে, অঙ্গহানি করে তাদের দিয়ে কিছু অসাধু লোক ব্যবসা করে খাচ্ছেÑ এমন খবরও বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আসলে ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে দারিদ্র্য যেমন দায়ী, তেমনি ‘লাভজনক বৃত্তি’ ও দুর্বৃত্তদের নিষ্ঠুর ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি বা কুকর্মও দায়ী।
দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা কতÑএ প্রশ্নের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের হিসাবে সারা দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা সাড়ে ৭ লাখ। তার মধ্যে ৫০ হাজারই রয়েছে ঢাকা শহরে। রোজা, ঈদ ও কোরবানির সময় এ সংখ্যার সঙ্গে আরও ৫০ হাজার মৌসুমি ভিক্ষুক যুক্ত হয়। বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা অন্তত ১২ লাখ। ঢাকা শহরে ভিক্ষুকের সংখ্যা সম্পর্কে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, অনেকের মতে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভিক্ষুক এখানে রয়েছে এবং মৌসুমি ভিক্ষুকের সংখ্যাও ৫০ হাজারের অনেক বেশি।
রাজধানী শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করার নানা উদ্যোগ এবং কিছু এলাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও ভিক্ষুকের সংখ্যা মোটেই কমেনি; বরং বেড়েছে। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের তরফে যে স্বল্পসংখ্যক ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের আওতায় এনে গ্রামে বা বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছিল, তা কোনো সুফল বয়ে আনেনি। পুনর্বাসিত এবং আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কোনোভাবে ছুটে বা পালিয়ে আসা ভিক্ষুকদের অনেকে ফের ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে গেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও আর এখন দৃশ্যমান নয়। ফলে নিষিদ্ধ এলাকাসহ ঢাকা শহরের সর্বত্র ভিক্ষুকের ভিড়। রেলস্টেশন, এয়ারপোর্ট, লঞ্চ টার্মিনাল, বাস টার্মিনাল থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, মসজিদ, মাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল, হাসপাতাল ইত্যাদি স্থানে নারী-পুরুষ-শিশু ভিক্ষুক অবাধে ভিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজধানী প্রতিটি দেশের কেবল প্রধান শহরই নয়, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। সেই শহরে যদি ভিক্ষুকদের অবাধ অবস্থান ও বিচরণ দেখা যায়, তাহলে তা বিদেশিদের চোখে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে জাতীয় আত্মশ্লাঘাবোধ অবনমিত হয়। পরিবেশ দূষণ, শব্দদূষণ, রায়ুদূষণ প্রভৃতি দিক দিয়ে বিশ্বে ঢাকার দুর্নাম রয়েছে। ঢাকাকে বাসযোগ্য, সুশৃঙ্খল, সুন্দর, মনোরম, উপদ্রবহীন ও নিরাপদ শহরে পরিণত করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা ও প্রয়াস যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিক সাধারণের সচেতনতা ও উদ্যোগও আবশ্যক।
ঢাকা শহরে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বহু ফুট ওভারব্রিজ এবং কোথাও কোথাও আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এগুলোর যথাযথ ব্যবহার হয় না। এসব ব্যবহার না করে পথচারীদের ব্যস্ত রাস্তার মাঝ দিয়ে রাস্তা পার হতে দেখা যায় এবং এটা নিত্যদিনের সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। এ কারণে মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেকেই আহত, এমনকি নিহতও হচ্ছেন। নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার অভাবেই যে এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো ঘটছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কর্তৃপক্ষীয় দায়ও মোটেই কম নয়। নাগরিকদের নির্দেশনা ও আইন মান্য করতে বাধ্য করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে তাদের যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে। আরও একটি দিক এই যে, বিশেষ করে ফুট ওভারব্রিজে হকার, বখাটে ও ভিক্ষুকদের উপদ্রব সবসময় লেগেই থাকে। এ বিষয়টিও দেখার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের।
ঢাকাসহ সারা দেশ ভিক্ষুকমুক্ত করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন কাজ। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। দেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে বসে থাকলে চলবে না, দরকার কঠোরহস্তে সব নির্দেশনা কার্যকর করা। ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রমকে জোরদার করতে হবে এবং ভিক্ষুক তৈরির পথ বন্ধ করতে হবে। দেশ উন্নয়নশীল হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। আমাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশে উন্নীত করা। এদিকে খেয়াল রেখেই ঢাকাসহ সারা দেশ নিরাপদ বসবাসের উপযোগী, সুশৃঙ্খল, সৌন্দর্যময় করে গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন। গোটা দেশকে সুষম উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে দেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ ও ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • পানিশূন্য তিস্তা
  • বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?
  • পরিবহন ধর্মঘট এবং জনদুর্ভোগ
  • পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি
  • শব্দসন্ত্রাস
  • মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ
  • Developed by: Sparkle IT