ধর্ম ও জীবন

কাকে দেবেন, কাকে দেবেন না

ডা: আব্দুর রহমান (মানিক) প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫২:১৭ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে এসেছে মাহে রমযান। এ মাসে যে কোন নেক আমলে অন্য সময়ের সত্তর গুণের চেয়েও বেশি ফজিলত পাওয়া যায়। তাই দ্বীনদার বিত্তবান গণ যাকাত দেয়ার জন্য ও মাসকেই বেছে নেন।
যাকাত হচ্ছে বিত্তবানদের জন্য একটি ফরয ইবাদত। নফল ইবাদতে তেমন কোন শর্ত না থাকলেও ফরয ইবাদতে কিছু শর্ত থাকে। এ শর্ত পূরণ না করলে তা কবুল হয় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- নিষিদ্ধ সময় ব্যতিত যেকোন সময় নফল নামায পড়া যায়। কিন্তু ফরয নামায ওয়াক্ত মত পড়তে হবে। জামাতে পড়তে হবে। নির্দিষ্ট রাকাত পড়তে হবে ইত্যাদি।
তেমনি ভাবে নফল ছদক্কা, দান খয়রাত যে কোন পরিমাণ দেয়া এবং যাকে ইচ্ছে, তাকে দেয়া যায়। কিন্তু ফরয যাকাত নির্দিষ্ট পরিমাণ দিতে হবে, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দিতে হবে ইত্যাদি। পবিত্র কোরআন মজীদে যাকাত সম্পর্কে যে সকল আয়াত বা মহানবী সা:-এর হাদীছ রয়েছে, তাতে কোথাও যাকাত আর কোথাও সদক্বাই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। (দেখুন-সূরা তাওবাহ্ আয়াত-১০৩) যাকাত কাকে দিতে হবে- সে সম্পর্কে একটি হাদীছে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। হাদীছ খানা হলো- হযরত নবী করীম সা. বলেছেন, “হে উম্মতে মুহাম্মদী। কছম ঐ খোদার, যিনি আমাকে হক্বের সাথে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা ঐ ব্যক্তির সদক্বাহ কবুল করেন না, যার আত্মীয় তার দানে র মুখাপেক্ষী, অথচ সে (তাহাদিগকে না দিয়ে) অন্যদেরকে দিয়ে দেয়। ঐ খোদার কছম, যার কুদরতী হাতে আমার জান, আল্লাহ তা আ’লা তার দিকে কিয়ামতের দিন নজর করবেন না।“রাদ্দুল মোহতার।
(সূত্র : বিষয়ভিত্তিক মাসয়ালা-মাসায়েল, মূল-হাকীমূল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. অনুবাদ- মাও: শামছুল হক, প্রকাশনায়- সোলেমানিয়া বুক হাউস, বাংলাবাজার, ঢাকা: পৃষ্ঠা-২৮৪-২৮৫)
কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, যাকাতদাতা তার নিজের গরীব আত্মীয়-স্বজনকে না দিয়ে মসজিদ বা মাজারের সামনে বসে থাকা ফকিরকে দিয়ে দেন। অথচ পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়-এদের মধ্যে কারো কারো ব্যাংকে লক্ষ লক্ষ টাকা জমা আছে।
কারো বাড়িতে বিরাট অবস্থা। কেউ কেউ আবার পেশাদার ভিক্ষুক চক্র দলের সদস্য। এ ভিক্ষুক চক্রদলের হোতারা শিশু চুরি করে নিয়ে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষুক সাজিয়ে পথে বসায়। সুতরাং এদেরকে যাকাত দিয়ে শিশু চুরিতে উৎসাহিত করা ঠিক নয়। যাকাত দেবার বেলায় মহানবী (সা.)-এর হাদীছ অনুসরণ না করলে সমাজে এ রকম সমস্যা তো সৃষ্টি হবেই।
আবার বলা যায়- যাকাত দাতাগণ যাকাত দিচ্ছেন, অথছ তার গরীব আত্মীয়-স্বজন বিভিন্ন সূদী সংস্থা থেকে দুই হাজার / পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিচ্ছে। তাও দিতে না পারায় স্ত্রীর পরণের কাপড় বা ঘরের চালের টিন হারাচ্ছে।
আবার এ দেশের কোন কোন স্থানে দরিদ্র মুসলমানের সামান্য সাহায্যের প্রলোভনে পড়ে ইসলাম ধর্ম ছেড়ে অন্য ধর্ম গ্রহণ করছে। (সূত্র: দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা-১৮/৮/১৯৯৮ইং)
মহানবী সা. বলেছেন, “দরিদ্রতা মানুষকে কুফরীর দিকে নিয়ে যায়।” (মিশকাত শরীফ)
ইমাম সায়াখসী (রহ.) বলেন, “নিশ্চয়ই যাকাত ফিতরা দানের উদ্দেশ্য হল অভাব ও দারিদ্র্য দূরীভূত করা।”
(সূত্র- ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, এপ্রিল-জুন ২০১৪ সংখ্যা পৃষ্ঠা-৭৪)
সুষ্ঠুভাবে ইসলামী বিধি বিধান মোতাবেক যাকাত প্রদান করায় দেশ দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে এবং দেশে যাকাত গ্রহণের মত লোক খুঁজে পাওয়া যায় নি- এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে অনেক আছে। কিন্তু বর্তমান যুগে সঠিকভাবে যাকাত দেয়া হচ্ছে না বলেই প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা যাকাত দিয়েও দেশে দরিদ্রের সংখ্যা কমছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে।
বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা যাকাত দেয়া হয়। অথচ এ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আলেম শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মদ ত্বাকী উসমানী লিখেছেন, “যাকাতের খাত হলো সরাসরি গরীব মানুষ। এ কারণে শরীয়তে যাকাতের অর্থ বড় বড় জনহিতকর ও সেবামূলক কাজে ব্যয় করার অনুমতি দেয় নি। কিন্তু মানুষ এ মাসয়ালার পরোয়া করে না। বিভিন্ন খাতে তারা যাকাত ব্যয় করে। যার ফলে যাকাত দ্বারা গরীবদের যে উপকার হওয়ার কথা ছিল, তা হয় না। সঠিকভাবে হিসাব করে সঠিক খাতে যদি যাকাতের অর্থ ব্যয় করা হয়, তাহলে কয়েক বছরেই দেশের চেহারা বদলে যাবে।”
(সূত্র: ইসলাম ও আমাদের জীবন-২ (ইবাদত-বন্দেগী), মূল-শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মদ ত্বাকী ওসমানী, অনুবাদ-মাওলানা মো: জালালুদ্দিন, মুহাদ্দিস টঙ্গি দারুল উলুম মাদরাসা, প্রকাশনায় মাকতা বাতুল আশরাফ, ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা, পৃষ্ঠা: ৩১০-৩১১)
তাই সঠিকভাবে হিসাব করে সঠিক প্রাপককে যাকাতের টাকা দিতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT