পাঁচ মিশালী

কৃষি ও প্রকৃতিপ্রেমী এক ব্যক্তিত্ব

আব্দুর রশীদ লুলু প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫০:৫৮ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিশ্বনাথ উপজেলার তাঁতীকোণা (ইসলামপুর) নিবাসী মো. আব্দুল গফফার উমরা মিয়া কৃষি ও প্রকৃতিপ্রেমী অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। বৃক্ষ ও প্রকৃতিকে ভালোবেসে তিনি ১৯৭৬ ইং সালে নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন পল্লীশ্রী নার্সারি। ধারণা করা হয়, বৃহত্তর সিলেটে বেসরকারী প্রথম নার্সারি এই পল্লীশ্রী নার্সারি। এই নার্সারিতে উৎপাদিত বিভিন্ন ফলদ, বনজ, ভেষজ ও ফুলের চারা তিনি বিনামুল্যে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গোরস্তান, রাস্তা-ঘাট ও বাসা-বাড়িতে লাগিয়ে প্রকৃতি প্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এই অবদান ও অনুরাগের কথা ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সযতœ পরিচর্যায় ১৯৯৯ ইং সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সিলেট শহরের অভিজাত হোটেল নূরজাহানের চতুর্থ তলার ছাদে ফুটে বিরল প্রজাতির নাইট কুইন। পরের দিনের স্থানীয় সব ক’টি পত্রিকায় এর সচিত্র সংবাদ/প্রতিবেদন ছাপা হয়। ফুল প্রীতির জন্য ওই সময় সিলেট পৌরসভার পক্ষ থেকে তাঁকে সম্বর্ধনা দেয়া হয়। উল্লেখ্য, কৃষি ও প্রকৃতি প্রীতির সাথে সাথে ফুলের প্রতিও রয়েছে তাঁর বিশেষ অনুরাগ। তাঁর ঘরে-বাইরে-ছাদে নাম জানা না জানা বিভিন্ন জাতের দেশি-বিদেশি ফুলের ছড়াছড়ি। মজার ব্যাপার হলো, কৃষি, প্রকৃতি ও ফুলের প্রতি তাঁর প্রচুর ব্যয় হলেও এসবের সাথে বাণিজ্যের কোন সম্পর্ক নেই। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ১৯৭৬ ইং সাল থেকে তিনি তাঁর এই প্রিয় বিষয়ে অদ্যাবধি অকাতরে ব্যয় করে যাচ্ছেন, করে যেতে চান আজীবন। তিনি দু’দুবার সিলেট শহরের হোটেল নূরজাহানের ছাদে অবাক ফুল প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। অন্যান্যদের সাথে সেই ফুল প্রদর্শনীতে এসেছিলেন তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার হাবিবুর রহমান্ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানের প্রধান ড. আব্দুল আউয়াল বিশ্বাস। এ ছাড়া তাঁর প্রকৃতি প্রেমের কার্যকলাপ দেখতে বিভিন্ন সময় তাঁতীকোণায় এসেছেন আমেরিকান মেডিক্যালের ডাইরেক্টর রায়মন্ড ফিলিপ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রতিনিধি ড. এন্টন ডালহুজ, বৃটিশ সংসদীয় দলের নেতা নরম্যান, বৃটেনের রাণী এলিজাবেথ হতে এমবি (শিক্ষা) খেতাব প্রাপ্ত মিসেস এলিজা এবং তার স্বামী এলেন্ড, তৎকালীন সিলেটের ফরেস্ট রেঞ্জার হাবিব উস সামাদ, সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক আব্দুল মালিক চৌধুরী, বন কর্মকর্তা সমিতির চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন চৌধুরী, লেখক- গবেষক মরহুম সৈয়দ মোস্তফা কামাল, ভাষা সৈনিক অধ্যক্ষ মাসউদ খান, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন ইন্টারন্যাশনালের এ্যামেরিটার্স প্রেসিডেন্ট হাসান শাহ্রিয়ার, সিলেট বিভাগীয় গণ গ্রন্থাগার এর কর্মকর্তা দিলীপ সাহা, কৃষি বিষয়ক ছোট কাগজ ‘চাষাবাদ’-এর সম্পাদক আনিসুল আলম নাহিদ প্রমুখ।
এলাকায় সাদা মনের মানুষ, বৃক্ষ প্রেমিক, প্রকৃতি প্রেমিক, সংগঠক-সংগ্রাহক প্রভৃতি অভিধায় অভিষিক্ত আব্দুল গফফার উমরা মিয়ার মূলত ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির সাথে সখ্যতা। মরে যাওয়া ও অযতেœ-অবহেলায় পড়ে থাকা এবং লতা-পাতায় জড়ানো গাছ দেখলেই তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই ব্যথিত হতেন, লেগে যেতেন পরিচর্যায়। সুযোগ পেলেই রাস্তার ধারে ও পতিত জায়গায় রোপণ করতেন নতুন চারা। ক্রমে সেটা নেশায় পরিণত হয়। গাছ গাছালির সাথে তিনি ধান, ফল-মূল এবং শাক-সবজির চাষ করেন আন্তরিকভাবে। জানা-শোনাদের উৎসাহিত করেন কৃষি ক্ষেত্রে। পশু-পাখির প্রতিও তাঁর আলাদা টান। দামী ফল স্ট্রবেরির টব ও অন্যান্য ফলমূল তিনি নির্দ্বিধায় উন্মুক্ত করে দেন পাখ-পাখালির জন্য। তালগাছ সম্পর্কে প্রচলিত ‘বাপে (পিতা) রোয়, পুতে (ছেলে) চায়, নাতি (ছেলের ঘরের ছেলে)-এ খায় কি না খায়’ এ প্রবাদকে তিনি অস্বীকার করেন। কেননা, তাঁর হাতে রোপণ করা অনেক তালগাছে ১২/১৪ বছরে ইতোমধ্যে ফলন দিয়েছে। এছাড়া তাঁর নিজ হাতে লাগানো অনেক গাছ ইতোমধ্যে পরিণত গাছ হয়ে উঠছে। উল্লেখ্য, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও রাস্তা ধারে ইতিমধ্যে তিনি অসংখ্য তাল এবং অন্যান্য গাছ লাগিয়েছেন, যা প্রকৃতির সুরক্ষা ও শোভাবর্ধন করছে।
কৃষি ও প্রকৃতির প্রতি নিবেদিত প্রাণ আব্দুল গফফার উমরা মিয়া, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নির্মল ও সুন্দর প্রকৃতি এবং সমাজ রেখে গিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির মাধ্যমে অমর হয়ে থাকতে চান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সুন্দর ও জ্ঞান নির্ভর সমাজের প্রত্যাশায় তিনি নিজ গ্রামে ২০১২ ইং সালে গড়ে তুলেছেন আজিজ-বারী-নূর পাঠাগার। গরিব-দু:খীর প্রতিও আছে তাঁর ভালোবাসা আর অবদান। তাঁর সুযোগ্য স্ত্রী সাবিহা গফফার এবং দু’ছেলে সালমান ফারসী জাবের ও সাফওয়ান মেহদী এবং তাঁর (উমরা মিয়ার) ছোট ভাই আলহাজ্ব ফজলুল হক আবুল এর ছেলে এহসানুল হক সব সময়ই তাঁর সমাজ কর্মে অনুপ্রেরণা ও সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন। আশা করা যাচ্ছে, তাঁর পরিবার পরিজনের অকৃত্রিম সহযোগিতায় তিনি নিরলসভাবে আমৃত্যু তাঁর কর্ম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন। ১৯৫২ ইং সালের ১১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণকারী হাল্কা-পাতলা, ছোটখাট গড়নের মানুষ আব্দুল গফফার উমরা মিয়ার পোষাক-আশাক, চাল-চলন ও জীবন ধারণ পদ্ধতি একেবারে সাধারণ। কিন্তু তাঁর চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা এবং কাজ-কর্ম অসাধারণ। এমন নিভৃতচারী-কর্মপাগল মানুষের জাতীয়ভাবে মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ। আমরা তাঁর অব্যাহত কর্মপ্রচেষ্টা ও সুস্থ শতায়ু কামনা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT