পাঁচ মিশালী

বই মেলায় একদিন

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫১:৫৩ | সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান চলছে। দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রথমবারের মতো কেমুসাস এর পক্ষ থেকে এই সম্মানটুকু দেয়া হচ্ছে। সেই অনুষ্ঠানে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে নাট্যকার পপিও উপস্থিত। পপির পেছনেই বসেছিল আপন চৌধুরী। আর আমি পপির বাম পাশে। আমরা সবাই শ্রেুাতা। বক্তারা বিশেষ ভঙ্গিমায় কথামালা বলে যাচ্ছেন। আমরা তন্ময় হয়ে শুনার চেষ্টা করছি। দীর্ঘ দু’ঘণ্টা বসার পর এমনিতেই এপাশ ওপাশ করছিলাম। এদিকে রাত ন’টার পর গাড়ি পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই উঠব উঠব ভাবছি। আপন চৌধুরীর দিকে তাকালাম। ও এক দৃষ্টে বক্তার দিকে চেয়ে আছে। উঠবে বলে মনে হচ্ছে না। অনেক কষ্টে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠল। প্রথমে আমি বের হলাম। এরপরই বেরোয় আপন চৌধুরী। একটা কাগজ আর কলম তার খুবই প্রয়োজন। তোমার কাছে কলম আছে নাকি? আমি বললাম না। আমাকে পাশ কেটে দৌড়ে একটা বুকস্টল থেকে কাগজ কলম সংগ্রহ করল সে। বলল- ভাই আমার ঠিকানাটা এই কাগজে লিখে দাও। আমি বললাম কেন?
-আমার চশমা আনি নি। ঠিকানাটা একজনকে দিব।
-সে কে?
-পপি, নাট্যকার।
-আরে ধ্যাৎ। এখন এই অনুষ্ঠানের মধ্যে ঠিকানা দিতে চাও? উনি মাইন্ড করবে।
অনেক কষ্টে আবেগ সম্বরণ করলাম। বললাম ওতো ফোন নং দিয়েছে ফোনেই যোগাযোগ হবে। এই পরিবেশে ওকে অতি আগ্রহ দেখানো ঠিক হবে না। তুমি একজন লেখক মানুষ। তোমার একটা ওয়েট আছে না? কী ভেবে আপন চৌধুরী থামল। হ্যাঁ, তাইতো। এ রকম করা ঠিক হবে না। জোর করে হাত ধরে টেনে নিয়ে চললাম বাসার উদ্দেশ্যে। মাঝে মধ্যে ও পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল। ওর ধড় টেনে নিলেও মনটা যেন ওখানেই পড়েছিল।
কেমুসাস বই মেলায় ক’দিন ধরে যাচ্ছি। আর বই মেলায় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছি। আমার প্রথম গল্প গ্রন্থ বের হবে। অদ্ভুত আলো এর নাম দিয়েছি। বইয়ের জন্য একটা মন্তব্য লাগবে। খুবই জরুরি ভিত্তিতে। কারণ এর জন্য বই ছাপানো আটকে রয়েছে। আমার প্রথম পছন্দ সুসাহিত্যিক সেলিম আউয়াল। লেখালেখিতে পরিচয় হলেও কোনো দিন সাক্ষাৎ হয় নি। মেলায় তাঁকে খুঁজছি। উদ্দেশ্য সাক্ষাতও হলো আর মন্তব্য বিষয়ে উনাকে অনুরোধ করব। রাজী থাকলে পান্ডুলিপি দিব। ২৬ মার্চ ২০১৮। সেলিম আউয়ালকে পেলাম তাঁর প্রকাশনীর স্টলে। কৈতর প্রকাশনী। পরিচিত হলাম। ঠিকানা জিজ্ঞেস করতেই থমকে গেলাম। আমারই বাড়ির পাশের লোক। ব্যবহারে অত্যন্ত অমায়িক। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আমার কথা শুনলেন এবং প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হলেন। সিলেটের যে ক’জন প্রতিষ্ঠিত লেখক, তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক সেলিম আউয়ালের ব্যবহারে আমি খুবই প্রীত হলাম। কয়েক মিনিটেই আমি তাঁর ঘনিষ্ট একজন হয়ে গেলাম। পান্ডুলিপি হাতে দিয়ে সময় বেঁধে দিলাম। কাল বিকেলের মধ্যে অবশ্য অবশ্যই মন্তব্য দিতে হবে। আমার এই ভূতোড়ে আব্দারও তিনি সহ্য করে নিলেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি তার কথা রাখলেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তিনি ভুললেন না। পরদিন বিকেলেই আমার প্রকাশকের ই-মেইলে পাঠিয়ে দিলেন। মনের অজান্তেই অজ¯্র অজ¯্র ধন্যবাদ মোবারকবাদ হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলাম। জানি না তাঁর কাছে পৌঁছল কি না!
মীম প্রকাশনীর স্টলে লেখিকা রেবেকা জাহান রোজীর সাথে দেখা। পরিচয় পর্ব শেষে জানলাম আমার বাড়ি থেকে তাঁর বাড়িও বেশি দূরে নয়। মোগলাবাজার থানা। সিলেট শহরেই থাকেন। ভবিষ্যতে মহিলা কমিশনার হবেন। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। তবে লাল টকটকে চেহারায় এখনও যৌবনের ছটা। মোটেই মনে হচ্ছে না বিয়ে হয়েছে তাঁর। ওর মেয়ের সাথে পরিচিত হয়ে ভুল ভাঙলো। আমাকে ওরা মামা ডাকল। ওদের মামা ডাক আমার হৃদয়ে গেঁথে রইল। রেবেকা জাহান রোজীর লেখা বই ‘তুমি রবে নিরবে’ কিনে আনলাম। মীম প্রকাশনীর আড্ডা বেশ জমজমাট। সম্ভবত এবারকার বই মেলায় বেস্ট সেলার হবে। লেখিকার জন্ম তারিখ ২৬ শে মার্চ। আমি তাকে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানালাম। উনি ধন্যবাদ দিতে ভুললেন না। পাশেই প্রাকৃত প্রকাশনীর স্টল। দেখি মামুন সুলতান। একাই বসা। জিজ্ঞেস করতেই বললেন, হ্যাঁ তারই প্রকাশন এটি। আমার এক কালের কলিগ বন্ধুটি লেখালেখিতে বেশ ওস্তাদ। কাব্য সাধনাই যে জীবনের ব্রত। লেখালেখির সুবাদে বড় বড় কবি সাহিত্যিকদের সাথে অবাধে মেলামেশা। তাই আমার মতো ছোট্ট লেখকের দাওয়াত পছন্দ হলো না। আমার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েও এড়িয়ে গেলেন। হয়তো বিড়ালের কাছে ছিঁছকে ইঁদুরই মনে হলো আমাকে।
বিকেলে কেমুসাসের উঠোনে চার খন্ডের টেবিল একত্র করে পাতা গোল টেবিলে ক’জন বসা। দূর থেকে দেখলাম আপন চৌধুরী, কবি আব্দুল হক, নাট্যকার পপি সহ আরও অনেকে আড্ডায় মেতেছে। আমাকে আপন চৌধুরী ইশারায় ডাকলে ওর পাশে এসে বসলাম আমি। পপি কবি হকের সাথে আড্ডায় মেতেছেন। হক সাহেবের স্ত্রীকে এনে পপি সেলফি তুলছেন। আমাদের নিয়ে সেলফি তুলতে ভুললেন না। নাট্যকার পপি খুবই স্মার্ট। তার ভাষাগত জ্ঞান প্রচুর। সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন। আমাদের প্রাণ খোলা হাসিতে বরণ করে নিলেন। ওর বড় একটি গুণ-গুণীদের কদর করা। উনি প্রথম সাক্ষাতেই অকপটে বললেন। ‘এখানে আমার সামনে যারা বসেছেন সবাই-ই বড় মাপের মানুষ। আমাকে নাম ও ফোন নং দিন।’ আপন চৌধুরী তড়িৎ নাম ফোন নং দিলেন। অন্যান্যরা দিলেও আমি আর সুযোগ পেলাম না। আড্ডার লোকেরা অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। গান-নাচ ইত্যাদি বিষয় উঠে এলো আলোচনায়। আপন চৌধুরী বললেন দেখুন সুর কারো একক সম্পত্তি নয়। দূরবীন শাহ’র সুরে গেয়েছেন আব্দুল করিম, আমির উদ্দিন সহ আরও অনেকে। কাজেই সুর নেয়া যায় যে কোন গান থেকে। পপি একটা ভূবন মোহিনী হাসি দিয়ে বললেন ঠিকই বলেছেন আপনি। সুর নেয়া যায় তবে কার সুর সেটা স্বীকার করতে হবে। অন্যের সুর আপনি নিতে পারেন তবে কে সুরারোপ করেছেন তার কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে। অন্যের সুর আপনি নিজের সুর বলে চালিয়ে দিলে সেটা অন্যায় হবে। এ বিষয়ে সুরকার আপনার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা চাইলে নিতে পারেন। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাবার জন্য মি. চৌধুরী এসে তাড়া দিলেন। আমরা সবাই উঠে গিয়ে সেই অনুষ্ঠানে যোগদান করলাম।
কথা বলতে বলতে আমরা চলে এলাম বন্দরবাজার। অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে এতোক্ষণ ধরে আলাপ করছিল আপন চৌধুরী আর আমি শুনে যাচ্ছিলাম। মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বললাম ‘এই মিটিংয়ের মধ্যে যদি এভাবে কাগজে ঠিকানা লিখে দিতে তাহলে কি অঘটনটাই না ঘটতো বলতো? একজন নামকরা নাট্যকার উনি। অন্য মেহমানরা সেখানে কী ভাবতো? আর এর প্রতিক্রিয়ায় পপি’ই বা কী বলত? আপন চৌধুরী বলল হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছ এবং আমাকে থামিয়ে দিয়ে ঠিক কাজটি করেছ। এত আবেগ প্রবণ হওয়া উচিত হয় নি। তবে কেন জানি মনে হচ্ছে পপির সাথে আবারও দেখা হবে। দেখা হলে খুব ভালো লাগবে আমার।
দু’দিন পর। কেমুসাস মেলা শেষ হয়েছে। আপন চৌধুরীর সাথে দেখা হলে সে বলল ‘ফোনে আলাপ হয়ে ছিল এর সাথে।’ আমি বুঝেও না বুঝার ভান করে বললাম কার সাথে? ঐ যে নাট্যকার পপি? প্রশ্নবোধক চোখে তাকালো আমার দিকে। আমি বললাম-‘আচ্ছা, তারপর কি বলল ও?
না-উনি ভালোই বলেছেন। ফোন করার জন্য ধন্যবাদও দিয়েছেন। আর বলেছেন অবসর হয়ে নিজেই ফোন দিবেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT