সাহিত্য

সোনার ময়না

সঞ্জয় কর প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫১:১৩ | সংবাদটি ১৮৫ বার পঠিত

চোখ কচলাতে কচলাতে জানালার পাশে দাঁড়ায় আরফা। জানালা খোলে বাহিরে তাকায় সে।
ফুর-ফুরে হাওয়া বইছে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা তবে মাঝেমধ্যে পাখিদের গুঞ্জন শুনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মহল্লার সকল মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আরফা এই পরিবেশটি খুব মন দিয়ে উপভোগ করছে। পবিত্র রমজান মাসের ভোর বেলা এরকমই হয়। এটা আরফার জানা। সারা রাত জুড়ে মহল্লায় চলে নানা হই হুল্লোড়। কেউবা খেলাধুলা করেন। কেউবা কোরআন তেলাওয়াত করেন। কেউবা তজবিহ্ নিয়ে রাস্তায় হাঁটা হাঁটি করেন। মহিলারা সেহরির জন্য বাহারী খাবার তৈরীতে রাত কাটিয়ে দেন। সেহরির পর রাত জাগা মানুষগুলো ক্লান্ত দেহে হেলে পড়ে ভোরের শরীরে।
আরফার দীর্ঘদিনের অভ্যাস ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। সারা রাত জাগলেও ভোর বেলা দু’চোখের পাতা এক হবেনা তার। হঠাৎ আরফার চোখ পড়ে শশী আপাদের বাসার দিকে। জানালার গ্রীল ধরে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একে তো আর কোনদিন দেখেনি সে! মুখ তুলে মেয়েটির দিকে তাকায় আরফা। মেয়েটিও হাসি মুখে তার দিকে তাকায়। আরফা ও শশী আপাদের বাসা পাশাপাশি। আরফার শুবার ঘরের জানালা বরাবর একটু দূরেই শশী আপাদের ঘরের একটি জানালায় দাঁড়িয়ে আছে শ্যামল বরণ মেয়েটি। গায়ে আকাশী রঙের জামা। মাথার এলোমেলো চুলগুলো ব্যান্ড দিয়ে আটকানো। আরফা বলে তোমার নাম কী?
-সোনা
-এটা আবার কেমন নাম!
-আসলে আমার নাম সোনালী। বাবা-মা আদর করে ডাকতেন সোনা।
আরফা এবার কৌতুহলী দৃষ্টিতে সোনার দিকে তাকিয়ে বলে, বেড়াতে এসেছ বুঝি?
সোনা আট দশটা মেয়েদের চেয়ে একটু ভিন্ন। খুব বুদ্ধিমতি তবে শান্ত স্বভাবের। কারও চোখে মুখে কৌতুহলের একটু রেশ পেলেই হলো। সে তাকে আরও কৌতুহলী করে তোলবে। কৌতুহলের মূল রহস্য জানা থাকলে সহজে তা প্রকাশ করবে না। সেই ছোট্ট বেলা থেকেই সে এরকম। সুবোধ বালিকা সোনার এই একটাই দোষ। ঘি এর মধ্যে এই একটাই কাঁটা। এর জন্য বাবা-মা তাকে কত্তো গালমন্দ করতেন। তা এখনও মনে পড়ে সোনার।
রহস্যময় হাসি হেসে সোনা বলে কী মনে হয় তোমার?
-মেহমান।
-না।
-তাহলে বলো কে তুমি?
-না, বলব না।
সোনা জানালার গ্রীল ছেড়ে ঘুরে দাঁড়ায়। আরফা ডাকে কিন্তু সে শুনে না। আরফা মনে মনে হিসেব কষে মেহমান না হলে আর কি হবে? নিশ্চয় শশী আপাদের কাজের মেয়ে। এ বাড়িতে কাজের মেয়েরা বেশি দিন থাকে না। কিছু দিন থেকেই কোন একটা অঘটন ঘটিয়ে চলে যায়। কিন্তু সোনার মুখের দিকে তাকিয়ে কেন জানি আরফার মনে হয়, এই মেয়েটি দীর্ঘদিন থাকবে এ বাড়ীতে। এই নিষ্পাপ চেহারার মেয়েটি কোন অঘটন ঘটাতে পারেই না।
আজ আরফা রোজা রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। সূর্যটা সবে মাত্র মাথার উপর উঠেছে। ইফতারের এখনও আরো অনেক সময় বাকী। প্রচন্ড রোদ। পানি পিপাসায় বুকের ছাতি যেন ফেটে যাচ্ছে তার। ধীরে ধীরে জানালার পাশে যায় সে। গ্রীলের উপর মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সোনার কাশির শব্দে মাথা তুলে আরফা। সোনাকে দেখেই সে এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে, ‘আমি জানি তুমি এ বাড়িতে কাজ করতে এসেছো আর এটাও জানি তুমি দীর্ঘদিন এখানে থাকবে, তুমি খুব ভালো মেয়ে।’
সোনার মুখে এখন আর রহস্যময় হাসি নেই। মূহুর্তেই তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। সারাদিন কাজ আর কাজ, তার ভালো লাগে না। গাঁয়ের কথা খুব মনে পড়ে। কিন্তু কিছুই করার নেই। এ বাড়ীতেই থাকতে হবে তাকে। মা মারা গেলেন অসুস্থ হয়ে আর বাবা বার্ধক্য জনিত কারণে। কে তাকে খাবার দেবে? কে তাকে কাপড় দেবে? গ্রাম সম্পর্কিত এক চাচার হাত ধরেই তার এ বাড়িতে আসা।
আরফা বলে ‘কি হলো সোনা কথা বলছো না যে?’
-এমনি
-তোমার মা-বাবা নিশ্চই বাড়িতে আছেন।
-না। এই পৃথিবীতে আমার আপন বলতে কেউ নেই শুধু ময়না ছাড়া। ময়নাকে ছাড়া আমি একদিনও থাকতে পারিনা। তাকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।
-ময়না কে?
-আমার বোন।
-তোমার বোনকে তো দেখলাম না !
এতক্ষণে মনের সকল দুঃখ ঝেড়ে ফেলে দেয় সোনা। আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে। সোনা বলে ‘আমার বোনতো আর কাঠের পুতুল না যে, বললেই তোমাকে এনে দেখাবো।’ কথাটি বলেই ঘোরে দাঁড়ায় সে।
প্রতিদিনই আরফা ও সোনার কথাবার্তা হয়। ইতিমধ্যেই তারা একে অপরের সম্বন্ধে অনেক কিছুই জেনেছে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কিন্তু সোনার বোন ময়নার রহস্যের জট এখনও খোলেনি। ময়নার কথা আসলেই এড়িয়ে যায় সোনা। সোনাকে বেশ ভালো করেই চিনে ফেলেছে আরফা। সে জানে এই মেয়েটি তার বোনকে দেখাবেনা। নিজেই দেখে নিতে হবে। আরফা সবসময় দৃষ্টি রাখে শশী আপাদের বাসার দিকে। ছাদে উঠলে আপাদের বেলকনি স্পষ্ট দেখা যায়। মাঝেমধ্যে ছাদে উঠে আরফা। কিন্তু আর কোন নতুন মানুষকে দেখতে পায়না সে।
আরফার বাবা-মা সরকারি চাকরি করেন। দু’জনেই সকাল বেলা বাসা থেকে বের হন আর বিকেল বেলা বাড়ি ফিরেন। দাদীমার সাথেই সারাদিন কাটে আরফার। দাদীমা কিছুটা অসুস্থ। আরফা সিদ্ধান্ত নেয় দাদীমা সুস্থ হলেই শশী আপাদের বাসায় তাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে সে। তখন সোনা আর কোথায় লুকাবে ময়নাকে। একথা ভাবতেই আরফার মনে আনন্দ দোলা দিয়ে যায়। নিজের অজান্তেই হেসে ওঠে সে।
দেখতে দেখতে রমজান মাস চলে গেল। আজ ঈদ। চারিদিকে উৎসবমুখর ভাব। পাড়ার ছেলেরা রাস্তায় ‘ঈদ মোবারক’ লিখে গেইট দিয়েছে। সামনের মাঠে বিকেল বেলা কনসার্ট হবে। দেশের নামি দামী শিল্পীরা গান গাইবেন। এর জন্য স্টেইজ সাজানোর কাজ চলছে। আরফা গোসল সেরে নতুন জামা কাপড় পরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিল। হঠাৎ সোনার ডাক শুনে চমকে ওঠে সে। সোনা হাসি মুখে বলে এই দেখ আমার ঈদের জামা। বেগম সাহেবা দিয়েছেন। খুব সুন্দর না জামাটা?
আরফার মুখ থেকে গুলির মতো একটি কথা বেরিয়ে আসছিল, কিন্তু তা হতে দিল না সে। দুই ঠোঁট চেপে ধরলো আরফা। কথাটি বলে সোনার আনন্দ নষ্ট করতে চায় না সে। আরফা ভালো করে জানে, সোনা যে জামাটি নতুন ঈদের জামা মনে করছে, এটি শশী আপার বেশ পুরনো একটি জামা। নিজেকে সামলে নিয়ে আরফা বলে, হ্যাঁ, খুব সুন্দর জামা।
আরফা দাদীমার সাথে উক্ত বিষয়টি আলোচনা করে। দাদীমা বলেন, ‘আনন্দটা নির্ভর করে সন্তুষ্টির উপর, পুরাতন জামাটিকে নতুন মনে করে সোনা সন্তুষ্ট হয়েছে তাই সে আনন্দ পাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন ‘পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা আমাদের যখন যে অবস্থায়ই রাখেন, আমরা যদি তা মেনে নেই, এতে যদি আমরা সন্তুষ্ট থাকতে পারি তাহলে কোন দুঃখ কষ্টই আমাদের স্পর্শ করতে পারবেনা।’ দাদীমার কথাগুলো মনে গেঁথে রাখে আরফা। দাদীমা সুস্থ হয়ে উঠেছেন বিকাল বেলা আরফা সোনাকে না জানিয়েই দাদীমাকে নিয়ে শশী আপাদের বাসায় হাজির হল। বারান্দায় পা রাখতেই উপরে ঝুলানো খাঁচায় বন্দী ময়না পাখিটা বলল ‘বড় আপা, বড় আপা মেহমান এসেছেন।’ ময়নার কন্ঠ শুনে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে সোনা। আরফা বুঝতে পারলো এই কালো ময়না পাখিটাকেই সোনা বোনের মতো ভালোবাসে। আরফার মুখে সফলতার হাসি ফোটে ওঠে। সোনার কানে কানে আরফা বলে, ‘এই ময়না পাখিটাই বুঝি তোমার বোন।’ সোনা কোন কথা বলে না, নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT