সাহিত্য

পাখির মতো মেলব ডানা

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫১:৩০ | সংবাদটি ২৮৪ বার পঠিত

সিলেটের ছড়া সাহিত্য ভুবনের অত্যন্ত শক্তিশালী জনপ্রিয় ও সুপরিচিত ছড়াকার অজিত রায় ভজন। অজিত রায় ভজন একজন সমাজসচেতন, বাস্তববাদী, মননশীল এবং সৃজনশীল তুখোড় ছড়াকার। ছড়ায় তার শব্দ চয়ন, বিষয় সমূহ, ছন্দের ঝঙ্কার ও মাধুর্য, সর্বোপরি তার চিন্তা চেতনায় ফুট ওঠে বাংলাদেশের নিসর্গ, আকাশ, ফুল-পাখি, মা-মাটি-মানুষ, কৃষক-শ্রমিক আপামর মেহনতি খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠী। তীক্ষè চিন্তার অধিকারী ছড়াকার অজিত রায় ভজন চটজলদি যে কোন বিষয়ে ছড়া লেখায় পারদর্শী। তার লেখায় সমকালের ঘটনা-প্রবাহ সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। অজিত রায় ভজনের লেখা-লেখির শুরু আশি দশকের দিকে ঐতিহ্যবাহী ছড়া সংগঠন ছড়া পরিষদের তিনি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। বর্তমানে সহসভাপতির গুরুদায়িত্ব শত ব্যস্ততার মাঝেও নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছেন। তার লেখা ছড়া-কবিতাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্র-পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে প্রকাশ হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এছাড়া দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিলেত, আমেরিকা-ভারতসহ নানা দেশের বাংলা ভাষাভাষী পত্র-পত্রিকা-ম্যাগাজিনে তার ছড়া-কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তার সম্পাদনায় ‘ছন্দ কথা’ নামে সাহিত্য পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। বর্তমানে তা বন্ধ।
১৯৬৭ সালের ৩০ এপ্রিল অজিত রায় ভজন সিলেট শহরের রায়নগরে এক সম্ভ্রান্ত রায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম- শ্রীমতি দুলু রাণী রায় (প্রয়াত), বাবার নাম শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র কুমার রায় (প্রয়াত)। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী, বন্ধুবৎসল, সহজ-সরল একজন সুন্দর মনের মানুষ ছড়াকার অজিত রায় ভজন। স্ত্রী লাকী রায়, কন্যা দুর্বা রায়, পুত্র অর্ঘ্য রায় নিয়ে সুখী সংসার। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি সকলের ছোট। একজন ব্যবসায়ী হয়েও তার দীপ্ত পদচারণা রয়েছে সিলেটের সংস্কৃতি অঙ্গনে। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কলম যেমন চলে, তেমনি আবার প্রতিবাদী মিটিং মিছিলেও তার অবস্থান থাকে সামনের কাতারে। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক সভা-সমাবেশে তার উপস্থিতি লক্ষণীয়।
ছড়াকার অজিত রায় ভজন শিশুদের জন্য যেমন লিখেছেন, তেমনি আবার বড়দের জন্যও লিখেছেন। তার ছড়ায় ফুটে উঠে স্বদেশ প্রেম, মানবতা, প্রকৃতি। ছড়ার মাধ্যমে তিনি সমাজের বাস্তবচিত্র, নানা অসঙ্গতি, ছড়া লেখার মাধ্যমে দক্ষতার সাথে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় ছড়াকার অজিত রায় ভজনের প্রথম ছড়ার বই ‘পাখির মতো মেলব ডানা’ এ বছর একুশে বই মেলা ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক, মঈন মুরসালিন, প্রতিভা প্রকাশ। সেঞ্চুরি আর্কের (২য় তলা, রুম নং-১৪) ১২০ আউটার সার্কুলার রোড, সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা-১২১৭। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সোহাগ পারভেজ, অলংকরণ করেছেন শেখ সাদী। ইতোমধ্যে বইটি সুধী পাঠক সমাজে সমাদৃত হয়েছে। বইটি বের হওয়ার সাথে সাথে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। বইটি উৎসর্গ করেছেন তার মা-বাবাকে। বইটির নামকরণেও রয়েছে শিশুমনের স্বপ্ন জগতের রঙ্গিন চিন্তা ভাবনার ছবি।
এখন পাঠকের কাছে তুলে ধরছি তাঁর ‘পাখির মতো মেলব ডানা’ থেকে কিছু ছড়া। প্রথম ছড়া শিশুপণে তিনি বলছেন- পাখির মতো মেলব ডানা/মুক্ত আকাশে উড়ব/জগৎজয়ীর তাজটা পরে/ বিশ্বভুবন ঘুরব/ মানুষ হব আমরা সবে/ আজকে করি পণ যে। ছড়াকার এখানে বিদ্যা অর্জন করে জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষা নিয়ে পাখির মতো ডানা মেলে বিশ্বভুবন জয় করার আহ্বান করেছেন শিশুদের। পরের ছড়া রেলগাড়ি। রেল চড়তে সব শিশুদের পছন্দ তাই তো তিনি লিখেছেন- ঝুমঝুম রেলগাড়ি/ছুটে চলে পাহাড়ে/সবুজের গালিচায়/কি যে মায়া আহা-রে। আমরা প্রায়ই দেখি যে এই সমাজের কিছু মানুষ নিজে যা- নয় তা করতে গিয়ে শেষে হাসির পাত্রে পরিণত হয়। তারই চমৎকার বহিপ্রকাশ ‘বিড়াল যখন বাঘ’ ছড়ায় তুলে ধরেছেন- যেমন- ‘এই ঘটনা খুব যে মজার/ ঘটল সুদূর চায়নায়/ বিড়াল মামা হঠাৎ এসে/দাঁড়ায় বড় আয়নাতে/ হালুম বলে জোরসে ডাকে/ মিউ মিউ মিষ্টি ডাক মিষ্টি সুরে/ সবার নজর কাড়ে। মা এই মধুর ধ্বনি পৃথিবীর সকল মানুষের মনে ঝঙ্কার দিয়ে উঠে। মমতাময়ী মাকে তাই লিখেছেন সুঁই ফুটলে আমার হাতে/ লাগে তোমার গায়/ মাগো তুমি এমন কেন/ কিসের এত দায়? সন্তানের আঘাতে মা ব্যথা অনুভব করেন তাইতো তিনি ¯েœহময়ী মা জননী। শিশু যখন দুষ্টুমি করে মা তখন শাসন করেন। দিল মা ছড়াতে তাই ফুটে উঠেছে, যেমন- বললো এসে হঠাৎ করে/ ছোট্টমণি দিল মা/ দুষ্টুমি আর করবো নাতো/ মারিস নে তুই কিল মা। এই ছড়ায় ছন্দের কারু কাজ অপূর্ব। সবুজে ঘেরা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। তাই তো প্রকৃতির এই শোভা দেখে মন আনন্দে নেচে ওঠে। তিনি বলছেন- চলো ছুটে যাই সবুজে। মনটা কি ভরে আছে অবুঝে/ আশাহীন নয় মন কবু যে/ প্রকৃতি ভালো লাগে তুব যে/ উৎসব মুখর বাঙালি জাতি। তার মধ্যে অন্যতম উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ। উৎসব ছড়াতে তাই লিখেছেন- ‘পিঠে আর পায়েসে/ খানা হবে আয়েসে। ইদানিং আমাদের দেশে শিশু হত্যাকান্ড, শিশু নিপীড়ন, শিশু ধর্ষণ, শিশু শ্রম মারাত্মকভাবে বেড়ে চলেছে ‘শিশু’ নামের ছড়াতে তাই ফুটে উঠেছে- যেমন- ফুলের মত ছোট্ট শিশু/ হচ্ছে দেখ বলি/ মানবতা দুই পায়েতে/যাচ্ছো যারা দলি/ তোমরা পশু এই সমাজে/মানুষরূপী হায়না। তোদেরও আছে এমন শিশু/ ভাবনা মনে যায় না। চমৎকারভাবে মানুষরূপী পশুদের এই ছড়াতে তুলে ধরেছেন। ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই চাঁদ দেখা আরও কত কি? ছড়াকার এবার লিখেছেন ঈদকে নিয়ে ছড়া- নাম দিয়েছেন ‘ঈদ’ খুশির ঈদে সবার হৃদে/ঢেউ লেগেছে ঢেউ/ নতুন জামা আনবে মামা/রঙিন ফিতা দু-এক কুড়ি রঙিন চুড়ি হাতেই ভরে নেবো। এইভাবে আরও মজাদার ছড়া বইর পাতায় ছড়িয়ে আছে। মোট ৬৪টি ছড়া দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘পাখির মতো মেলব ডানা’ বইটি। ঝকঝকে নির্ভুল ছাপা- আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ- এবং প্রতিটি ছড়ার সাথে দৃষ্টিনন্দন অলংকরণ গ্রন্থটিকে করেছে উন্নত মান সম্পন্ন। গ্রন্থটির মুখবন্ধ লিখেছেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক রহিম শাহ। আমি গন্তটির বহুল পাঠক প্রিয়তা লাভ এবং ছড়াকারের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT