সম্পাদকীয়

আদালতে মামলাজট

প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫১:৫৮ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

খুলছে না মামলাজট। বরং দিনে দিনে বাড়ছে মামলার সংখ্যা। সারাদেশে ২০১৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিলো প্রায় ৩২ লাখ ১৮ হাজার। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ লাখ ৫৫ হাজার। যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। আট মাসে মামলা বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ। সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও অর্থ সংকটে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে মামলা নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। আর এই অযথা ও দীর্ঘ কালক্ষেপণের পর বিচার হলেও তখন ন্যায়বিচারের কোন প্রয়োজন বা প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। তাই আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতিতে বিচার কাজ সম্পন্ন করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগণ। তা না হলে বিচার প্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়তে থাকবে এবং বাড়তে থাকবে মামলা পরিচালনা ব্যয়।
বিচারাধীন মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে জমি সংক্রান্ত মামলা। ঝুলে থাকা মামলার মধ্যে অর্ধেকের বেশি হচ্ছে জমি নিয়ে। বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে এসব মামলায় দেশের লাখ লাখ পরিবার চরম ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। ভূমি বিবাদ সংক্রান্ত মামলা নি¤œ আদালত থেকে গড়াচ্ছে উচ্চ আদালতে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিরাজিত দু’শ বছরের পুরনো আইন ও পদ্ধতি। জটিল এবং ত্রুটিপূর্ণ এই আইন চালু থাকায় ভূমি সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের গ্রামাঞ্চলে ভূমি নিয়ে বিরোধ নেই, এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে খুব কমই। এইসব মামলায় ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ- এভাবে সর্বত্র সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে।
বিচারাধীন মামলাগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েক কোটি মানুষ নানাভাবে হয়রানী ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে মামলার বাদী ও আসামীদের ভোগান্তি হচ্ছে বেশি। তাছাড়া, তাদের আত্মীয়-স্বজনকেও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে মামলা পরিচালনার নানা পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের হয়রানী করা হয় বিভিন্নভাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে পুলিশের হয়রানী। মামলা দায়ের, আসামী আটক, অভিযোগপত্র তৈরি প্রভৃতি নানা ধাপে হয়রানীর শিকার হতে হয় বিশেষ করে বাদীপক্ষকে সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া, আদালতে হাজিরা দিতে হয় নিয়মিত। এসব করতে করতে অনেক বাদী ও আসামীর জীবনই চলে যায়; কিন্তু মামলা শেষ হয় না। জমি সংক্রান্ত অনেক মামলা ২০/৩০ বছরেও শেষ না হওয়ার নজির রয়েছে অসংখ্য। আর এই ধারাবাহিকতা চলে আসছে সুদূর অতীত থেকেই।
জনসংখ্যার অনুপাতে বিচারকদের সংখ্যা আমাদের দেশে আনুপাতিক হারে খুবই কম। আমেরিকার প্রতি দশ লাখ মানুষের জন্য বিচারক রয়েছেন একশ সাতজন। আর বাংলাদেশে দশ লাখ মানুষের জন্য বিচারক মাত্র দশ জন। এতো স্বল্পসংখ্যক বিচারক দিয়ে মামলার জট কমানো সম্ভব নয় বলেই বিশেষজ্ঞগণ অভিমত দিয়েছেন। তাছাড়া, দু’শ বছরের পুরনো আইন ও পদ্ধতিতে চলছে আমাদের ভূমি ব্যবস্থাপনা। এমন নজির নেই বিশ্বের কোথাও। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে বিশ্বের সকল জাতি। সময়ের তাগিদেই সবদেশেই প্রচলিত আইনের সংস্কার হচ্ছে, সংশোধন হচ্ছে। কিন্তু আমরা রয়েছি এর বাইরে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত আইনের সংস্কার করলে ভোগান্তি কমবে মানুষের। এতে কমে আসবে মামলার সংখ্যাও। সর্বোপরি আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি নিয়েও ভাবতে হবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT