উপ সম্পাদকীয়

স্বামীদের পাপের ভাগ স্ত্রীরা কেন নেন

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫৩:৩৫ | সংবাদটি ২৪ বার পঠিত

ছোট্টবেলা গুরুজনদের মুখে রামায়ন মহাভারতের গল্প শুনতাম। এর মধ্যে এক দস্যুর গল্পটি আজো ভুলতে পারিনি। ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেই ডাকাত বা দস্যুর গল্পটি অনেক সময়ই প্রাসঙ্গিক বলেই মনে হয়। সেই দুর্ধর্ষ ডাকাত বা দস্যুর নাম ছিল রতœাকর দস্যু। সে পথে ঘাটে পথচারীদের ধনসম্পদ টাকাকড়ি-অলঙ্কারসহ সর্বস্ব লুট করে সেই লুণ্ঠিত সম্পদ দিয়েই তার সংসার চালাতো।
পিতা-মাতা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা সবার ভরণপোষণ করতো। এমনিভাবে সংসার চালিয়ে রতœাকর দস্যু মনে করতো সে সুন্দর সুষ্ঠুভাবেই সংসার ধর্ম পালন করছে এবং তার দস্যুবৃত্তির কোন প্রকার পাপ বা অপরাধবোধ নেই। কিন্তু একদিন তার পরিবারের সবাই তার এইসব দস্যুবৃত্তির খবর জেনে স্ত্রীসহ সবাই তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে পরিবারের সবার ভরণপোষণের দায়িত্ব তার কিন্তু সেটা হতে হবে সৎপথে। কোন অবস্থাতেই তার লুটপাট, ডাকাতির মতো অবৈধ এবং অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে নয়। এটা পাপ। রতœাকরের পাপের ভাগী তারা হবে না। সব পাপ তার। দস্যু রতœাকর ভীষণ চিন্তায় পড়লেন। এমনি অবস্থায় কি করা যায় ভেবে পাচ্ছিলেন না। স্ত্রী-সন্তান, মাতা-পিতা তথা সংসারের জন্য এতো করলেন কিন্তু পাপের ভাগী আজ কেউ নয়। তার মনে এক আমূল পরিবর্তন এসে গেলো। জীবনের এতো পাপকর্ম থেকে মুক্তির জন্য সাধনা করতে লাগলেন। ডাকাতি-দস্যুবৃত্তি ছেড়ে দিলেন। দস্যু এমন সাধু হলেন যে, সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে জগৎ বিখ্যাত মুনিবরের আসনে অধিষ্ঠিত হলেন। রচনা করলেন ধর্মীয় মহাকাব্য-মহাগ্রন্থ রামায়ন।
আজ দস্যু রতœাকর বা রামায়নের যুগ নয়। ঘোর কলিকাল অনেকেই বলেন। অন্য কথায় বলা যায় চরম পর্যায়ের আধুনিক কাল। অনেকেই হয়তো বলবেন এখন আর ডাকাত সর্দার রতœাকরের ডাকাতি-লুটপাট, দস্যুপনার দিন নেই। সভ্যতার চরম শিখরে আমরা আসীন হয়তো বা তা-ই। কিন্তু সব কি থেমে গেছে? সমাজে, দেশে, পরিবারে কি অন্য আদলে চোর-ডাকাত, দস্যুর সরব-নীরব, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, বিচরণ আমরা দেখতে পাইনা। চুরি-ডাকাতি-দস্যুপনার অন্যরূপ ঘুষ-দুর্নীতি, অবৈধ আয় বা সম্পদ অর্জনের নবরূপ দেখতে পাইনা। যারা আজ এ কুকর্মে লিপ্ত তাদের পরিবারও রতœাকর দস্যুর পরিবারের মতোই। স্ত্রী আছে, পুত্র-কন্যা আছে। আছে পিতা-মাতা। কখনো বা ভাই-বোন। অর্থাৎ শুধু একটাই বোধ হয় এবং সেটা হলো আধুনিক ঘুষঘোর-দুর্নীতিবাজ, অবৈধ অর্থ-সম্পদ আহরণকারী আধুনিক দস্যুদের পাপের ভাগীদার হতে অনেকেই অস্বীকার করছেন না। অবশ্য এর মধ্যে ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। আর এমন ব্যতিক্রম ধর্মী স্ত্রী, পিতা-মাতা,পুত্র-কন্যাদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
সম্প্রতি ‘দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত আয় ও সম্পদের পারিবারিক দায়, নারীর ভূমিকা, ঝুঁকি ও করণীয়’Ñশীর্ষক একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন দুদক চেয়ারম্যান। এতে বিভিন্ন বক্তা বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেন। এ নিয়ে একেক পত্রিকা একেক ধরণের শিরোনাম করে। জনকণ্ঠ লিখে ‘নারীরা সচেতন থাকলেই দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে’ দৈনিক সংবাদ এর শিরোনাম ‘স্বামীর দুর্নীতির কথা না জানলেও ফেঁসে যান নির্দোষ স্ত্রী।’ অনুষ্ঠানে স্ত্রীদের প্রতি দুদক চেয়ারম্যান ৫টি পরামর্শ মেনে চলার অনুরোধ করেন। সেগুলো হলো- (এক) স্বামী অর্থ কিভাবে উপার্জন করলেন তা জিজ্ঞেস করতে হবে, (দুই) নিজেকে সচেতন হতে হবে, (তিন) অনাহূত ভিকটিম হবেন না (চার) ব্যাংক এ্যাকাউন্ট ফরমে কিসের এ্যাকাউন্ট না জেনে স্বাক্ষর করবেন না, (পাঁচ) ব্যাংকে কোন প্রকার অর্থ লেনদেন বা ব্ল্যাংক চেক বা চেকের পাতায় না জেনে স্বাক্ষর করবেন না। দুদক চেয়ারম্যান মহোদয় কর্তৃক প্রদত্ত পরামর্শগুলো অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু তারপরও অনেক কথা থেকে যায়। অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্য থেকেই এর প্রতিফলন ঘটে। অনুষ্ঠানে জনাব আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমার মা ফাইভ পাস ছিলেন। কিন্তু তার কারণে আমার বাবার সাহস ছিল না দুর্নীতি করার।’ আসিফ নজরুলের বক্তব্য থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে তার বাবা দুর্নীতি করার যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার স্ত্রীর ভয়ে তা পারেননি। এখন প্রশ্ন হলো এমন সৎ এবং সাহসী স্ত্রীর দেখা কি আজকের সমাজে খুব একটা মেলে।
উক্ত অনুষ্ঠানে নারী নেত্রী খুশি কবিরের বক্তব্যটি অনেকাংশে বাস্তবধর্মী বলেই মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন ‘সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নেই। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নারীদের দাম দেয়া হচ্ছে না। সমান অধিকার তো দূরের কথা অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত চাপিয়েও নির্যাতন করা হচ্ছে নারীদের। যে কারণে দুর্নীতি বাড়ছে। স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে নারীর নামও দুর্নীতি মামলায় ঢুকে যাওয়ায় নারীর সচেতনতা অনেকাংশে দায়ী।’ এখন প্রশ্ন হলো নারীদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা যেহেতু একেবারেই সীমিত, সেখানে স্বামীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলাও সীমিতই থেকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আর স্বামীদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের প্রতি সমাজের কতজন স্ত্রী অন্তর থেকে ঘৃণা প্রকাশ করতে পারেন সেটাও বিবেচ্য। স্বামীরা যখন লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি টাকা স্ত্রীদের নামে রাখেন তখন অবশ্যই স্ত্রীগণের কাছে অজানা থাকার কথা নয়। কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অনেকেই যে আন্তরিকভাবে খুশী হন না তা কি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন। চাকুরীজীবী স্বামীদের বেতনের খবর শিক্ষিত মহিলাদের না জানার কথা নয়। বিশ হাজার যার মাসিক বেতন তিনি যদি ঘরে বিশ লাখ টাকা নিয়ে আসেন তখন ক’জন স্ত্রী অখুশী হন? কোন কোন স্ত্রীদের নামে যখন কোটি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব খোলা হয় তখন এ সমাজের ক’জন স্ত্রী ব্যাংকের কাগজে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন? মনে হয় অনেকেই খুশী মনে গর্বভরে সই করে থাকেন। আইনকে ফাঁকি দিতে অনেক ঘুষখোর স্বামী জমিজমা, দালান কোটা, বাড়ী, গাড়ী স্ত্রীদের নামে রাখেন। কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্য যে কোন স্ত্রীই এতে প্রতিবাদ করেন বলে বা করেছেন বলে কোন সংবাদপত্রে খবর আসে না। এমন খবর যদি আসতো তাহলে দুর্নীতির পরিমাণ অবশ্যই কমে যেতো।
তবে সব কথার শেষ কথা হলো দুর্নীতির বেড়াজালে বন্দী এই ভোগবাহী সমাজের অংশ এদেশের স্ত্রীরাও। তারা সমাজের বাইরের কেউ নন। তাই এক্ষেত্রে তাদের কাছে খুব বেশী প্রত্যাশা করাও বাস্তব সম্মত নয়। শুধু চাকরীজীবী কেন, রাজনীতিবিদসহ সমাজের অন্যান্যদেরকে বিবেচনায় আনা দরকার। এক্ষেত্রে কঠোর আইনই দুর্নীতি রোধ করতে পারে। কোন এক মণীষী দুঃখ করে বলেছেন-লিখিত আইনগুলো মাকড়সার জালের মতো, এর দ্বারা গরীব ও কমজোরকে ধরে রাখা যায় কিন্তু ধনী ও শক্তিমান সহজেই তা ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারে। এমনটি না হলেই দুর্নীতি কমবে। রতœাকর দস্যু তার স্ত্রী তথা পরিবারের সদস্যদের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার জীবনাচার বদলে দিয়েছিলেন কিন্তু আজকের ঘুষখোর সব সেক্টরের দুর্নীতিবাজরা স্ত্রীদের মতামতকে থুরাই কেয়ার করে। তাই ঐসব দস্যুরা দস্যুই থেকে যাচ্ছে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • তামাক : খাদ্যনিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে বাধা
  • প্রশাসনের দৃষ্টি চাই : শব্দদূষণ চাই না
  • যাতনার অবসান হোক
  • রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন জরুরি
  • যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার
  • বিশ্বকাপে অসহনীয় বিদ্যুৎ বিভ্রাট
  • মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই
  • মাদক থেকে দেশ উদ্ধারের অঙ্গীকার
  • পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগান
  • তোমাকে শ্রদ্ধা লেবুয়াত শেখ
  • সামাজিক অবক্ষয় এবং এর প্রতিকার
  • সোশ্যাল মিডিয়ার ভয়ঙ্কর রূপ
  • শিশুর জন্য চার সুরক্ষা
  • বিশ্ব ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের সংকট ও প্রতিক্রিয়া
  • সম্ভাবনার অঞ্চল সিলেট
  • স্বপ্নের বাজেট : বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ
  • বাচ্চাটা একটা খেলনা ফোন চেয়েছিল
  • স্থানীয় সরকার প্রসঙ্গে কিছু প্রস্তাবনা
  • চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ
  • সিরিয়ার আকাশে শকুনের ভীড়-সামাল দিবে কে!
  • Developed by: Sparkle IT