উপ সম্পাদকীয়

আতœসংশোধন ও আতœগঠনের মাস মাহে রমজান

ওলীউর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫৯:১২ | সংবাদটি ৭০ বার পঠিত

রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির সওগাত নিয়ে প্রতি বছরই আমাদের মাঝে হাজির হয় মাহে রমজান। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তাক্বওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করার জন্য মহান রাব্বুলআলামীন আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই সিয়াম সাধনার মূল লক্ষ্য ও দাবি হচ্ছে মানব জীবনে তাক্বওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা। কেবল পানাহার বর্জনের নাম রোজা নয় বরং সিয়াম সাধনার দাবি হলো নিজেকে সংশোধন করা, আতœগঠন করা এবং রমজানের শিক্ষা সমাজে বাস্তবায়ন করে সকল প্রকার অন্যায়-অনাচার, পাপ-পঙ্কিলতা ও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি অর্জন করা। তাক্বওয়া বা খোদাভীতিই সকল শান্তি, নিরাপত্তা ও সুখের মূল উৎস। আল্লাহ ভীতিই মানুষকে সকল প্রকার অপরাধকর্ম থেকে বিরত রাখতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যাতে তোমরা মুত্তাক্বি হতে পার।’ সূরা আল- বাকারা- ১৮৩
তাক্বওয়ার শাব্দিক অর্থ বেঁচে থাকা। পবিত্র কোরআনে তাক্বওয়া শব্দটি তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম অর্থ ভীতি দ্বিতীয় অর্থ আনুগত্য এবং তৃতীয় অর্থ গুনাহ বর্জন। তিনটি অর্থ একত্র করলে তাক্বওয়ার অর্থ হয় ‘ আল্লাহর উপর ভয় রেখে তার পূর্ণ আনুগত্য সহকারে সমস্ত গুনাহ বর্জন করা। ’ তাক্বওয়ার দাবি হল জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মেনে চলা। মন অন্তর সহ শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কে না জায়েয কাজ থেকে বিরত রাখা। ইমাম গাজ্জালী তার মিনহাজুল আবেদীন গ্রন্থে তাক্বওয়া কে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রথমত: শিরক থেকে বিরত থাকা বা একত্ববাদের বিশ্বাসী হওয়া। দ্বিতীয়ত: বিদআত থেকে বেঁচে থাকা বা রাসূল (সা.) এর আদর্শ অনুসরণ করা এবং তৃতীয়ত: সকল প্রকার গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকা। এসব গুণাবলী অর্জনের জন্য সাধনার প্রয়োজন। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সহজে এসব গুণাবলী অর্জন করা যায়। যারা তাকওয়া অর্জন করে তাদের কে বলা হয় মুত্তাকি। আর এই মুত্তাকী হওয়ার জন্যই প্রতি এগারমাস পরে একমাস সিয়ামসাধনার ব্যবস্থা। অর্থাৎ প্রতি ১১ মাস পর এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ কর্ েএকজন মুমিন যাতে নিজেকে মানবীয় গুণাবলীর উঁচ্চ শিখড়ে নিয়ে যেতে পারে, এজন্য এই মাসব্যাপী সিয়াম পালনের ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা কি আমাদের ব্যক্তি জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সিয়ামের শিক্ষার বান্তবায়ন করতে পারি? রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাস হলো, ধৈর্য ও সহানুভূতির মাস। এ মাসে যদি কেউ কোন রোজাদারকে ইফতার করায় তাহলে তা তার পাপমোচন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হয়।’ এ মাস মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন ও পারস্পরিক কলহ বিবাদ ও শত্রুতা পরিত্যাগ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদার-সহিষ্ণুতা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি স্থাপনের শিক্ষা দেয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যদি এ মাসে তোমাকে কেউ গালি দিয়ে দেয় তদুপরি তুমি তাকে বল যে, আমি রোজাদার।’ মোট কথা হলো, মাহে রামজানের আহবান এবং দাবি হচ্ছে, ব্যক্তি জীবনের পরিশুদ্ধি এবং সমাজও রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে সততা, সৌন্দর্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা এবং জুলুম, অত্যাচার, –অনাচরের অবসার ঘটানো। কিন্তু আমরা কি তা করতে পারছি? কিছু পোশাকী কথা, আচার-অনুষ্ঠান এবং কিছু কর্মসূচী বাদ দিলে সিয়াম সাধনা ও রোজা আমাদের মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারেনা, মাহে রমজানও সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনে পরিবর্তন সাধন করতে পারিনা।
রমজান মাসে আমাদের দেশের রাজনৈতিক কার্যক্রম অনেকটা পরিচালিত হয় ইফতার মাহফিলকে কেন্দ্র করে। প্রায় প্রতিদিনই ইফতার মাহফিলে যোগ দেন রাজনীতিবিদরা। বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষদের নিয়েও আয়োজন করা হয় ইফতার পার্টি। তবে জাঁক-জমকপূর্ণ এসব ইফতার পার্টিতে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণীর মানুষকে উপেক্ষা করা হয়। অথচ এদেরকে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ ছিল। কারণ রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেউ কোন রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে আহার করায়, তাহলে আল্লাহ তাকে আমার হাউজে কাউসার থেকে এমন পানি পান করাবেন যে, জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে তার আর পিপাসা লাগবে না।’ এসব কথা কে শুনে? কারণ যারাই ইফতারের আলীশান পার্টি দেন তারা অনেকে জানেনই না যে, ইফতার কোন রাজনৈতিক কর্মসূচীর নাম নয় বরং ইফতার মাহফিল বা পার্টি হলো একটা সুন্নত এবং ছওয়াবের কাজ। যাই হোক এগুলো হলো রাজনৈতিক ইফতার মাহফিল বা রাজনীতির ইফতার পার্টি। পবিত্র মাহে রমজান এবং সিয়াম সাধনার মধ্যে যে ইফতারের ব্যবস্থা রয়েছে এই ইফতারের সাথে রাজনৈতিক ইফতার পার্টির বহুগুণ দূরত্ব রয়েছে। কারণ এখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চর্চা করা হয়, প্রতিপক্ষকে হেয় করা হয়, গীবত-পরনিন্দা, মিথ্যা ইত্যাদির চর্চা করা হয়, ইসলামের অনেক ফরজ বিধানকেও এসব ইফতারপার্টিতে জলাঞ্জলি দেয়া হয়। এসব হচ্ছে সিয়াম সাধনা এবং পবিত্র মাহে রমজানের শিক্ষা ও দাবির সম্পূর্ণ পরিপন্থী কাজ। মহান রাব্বুল আলামীন ইফতারের সময় রোজাদারের পাপ মোচন করেন, তার দোয়া কবুল করেন, আল্লাহ বান্দার উপর বিশেষ রহমত বর্ষন করেন। অথচ এসময় আমরা অন্যের দোষ চর্চায় লিপ্ত থাকি। এসব সিয়াম সাধনা তথা ইসলামী আদর্শের সম্পূর্ণ নীতি বিরুদ্ধ কাজ। একারণে ইফতার পার্টিগুলোকে ইসলামের অনুপম আদর্শের ভিত্তিতে সাজানো দরকার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, পরনিন্দা এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত করার পরিবর্তে এখান থেকে সাম্য-মুক্তি, সহমর্মিতা, সমবেদনা, সহানুভূতি, সহাবস্থান, সম্প্রীতি, উদারতা, মানবিকতা, ক্ষমা এবং মানুষকে ভালবাসার বাণী প্রচার করা দরকার। মূলত ইফতার মাহফিল থেকে মন্ত্রী এমপিদের দরাজ কন্ঠে এরূপ বক্তব্য আসার দরকার ছিল যে, ‘আমাদের সম্মানিত বিরোধী দল সহ সকল রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিবর্গ আমাদের বন্ধু, কারো প্রতি আমাদের কোন আক্রুশ নেই, আমরা সবাই পরস্পরে ভাই ভাই। পবিত্র মাহে রমজনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আমরা আমাদের সম্মানিত বিরোধী দল সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং দেশের আপামর জনসাধারনের প্রতি আহবান জানাচ্ছি যে, আসুন হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্রতী হই। আসুন আতœগঠন ও চরিত্র গঠনের এমাসে আমরা সবাই মিলে দেশ ও জাতির সমস্যা ও দুর্বলতা কোথায় তা চিহ্নিত করি এবং তা দুর করার বাস্তব ভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করি এবং শোষণ, বঞ্চনা ও পাপাচার মুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার গ্রহণ করি।’ কিন্তু আমাদের রাজনীতিকরা এরূপ উদারতা প্রদর্শন করতে পারেন না। এরূপ উদার-সহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের দেশে চালু নেই। যদি তা হত, যদি আমরা রমজানের এ শিক্ষা টুকুই গ্রহণ করতে পারতাম, তাহলে আমাদের সমাজের চিত্র অন্য রকম হতে পারত।
মহানবী সা. এর একটি দীর্ঘ হাদীসের এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, ‘এই মাসে আল্লাহ মুমিনদের রিজিক বৃদ্ধি করে দেন।’ একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, রমজান মাস এবং ঈদ আসলেই আমাদের দেশে খাদ্যদ্রব্য সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দাম বেড়ে যায়। আর এর দ্বারা আমাদের দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় হাদীসের এ অংশ টুকুর সম্পুর্ণ বিপক্ষে অবস্থান নেন। একদিকে তারা জিনিস পত্রের দাম বাড়িয়ে মানুষের প্রতি সহানুভুতির পরিবর্তে তাদের প্রতি শোষণের পথ অবলম্বন করেন। অন্যদিকে খাদ্য দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করে খাদ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন। অনেক দেশে রমজান এবং ঈদ আসলে খাদ্য দ্রব্য এবং পোশাক-আসাক সহ প্রয়োজীয় জিনিস পত্রের দাম হ্রাস করা হয় মানুষের প্রতি সহানুভুতি হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে রমজান- ঈদ আসলে এর সম্পুর্ণ বিপরীত অবস্থা সৃষ্টিহয়। এই পবিত্র দিনগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে জিনিস পত্রে দাম কমিয়ে দেয়া তো বহু দুরের কথা, কোন কিছুর দামই স্থিতিশীল থাকেনা বরং রমজান ও ঈদ আসলেইযে প্রত্যেক জিনিসের দাম বাড়বে এনিয়ে মানুষের মধ্যে রীতিমত আতংক বিরাজ করে। সারা বছরের ব্যবসা যেন এই মুক্তির মাস, বরকতের মাস রমজান এবং ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করেই। রমজান এবং ঈদে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়া একটি দুঃখ জনক প্রবণতা। এ প্রবণতা রোধকল্পে আমাদেরকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আসুন আমরা রমজান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনকে সত্য ও সুন্দরের দিকে নিয়ে যাই, সকল প্রকার অন্যায়কে না বলি, মানুষকে আরো ভালবাসতে শিখি, স্বার্থপরতা ও শোষণের কাল হাত গুটিয়ে নেই এবং সহানুভুতি ও সহমর্মিতার হাত প্রসারিত করি মানুষের তরে, গড়ে তুলি শান্তি ও সম্প্রীতির এক সুন্দর সমাজ।
লেখক : গ্রন্থকার।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • তামাক : খাদ্যনিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে বাধা
  • প্রশাসনের দৃষ্টি চাই : শব্দদূষণ চাই না
  • যাতনার অবসান হোক
  • রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন জরুরি
  • যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার
  • বিশ্বকাপে অসহনীয় বিদ্যুৎ বিভ্রাট
  • মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই
  • মাদক থেকে দেশ উদ্ধারের অঙ্গীকার
  • পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগান
  • তোমাকে শ্রদ্ধা লেবুয়াত শেখ
  • সামাজিক অবক্ষয় এবং এর প্রতিকার
  • সোশ্যাল মিডিয়ার ভয়ঙ্কর রূপ
  • শিশুর জন্য চার সুরক্ষা
  • বিশ্ব ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের সংকট ও প্রতিক্রিয়া
  • সম্ভাবনার অঞ্চল সিলেট
  • স্বপ্নের বাজেট : বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ
  • বাচ্চাটা একটা খেলনা ফোন চেয়েছিল
  • স্থানীয় সরকার প্রসঙ্গে কিছু প্রস্তাবনা
  • চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ
  • সিরিয়ার আকাশে শকুনের ভীড়-সামাল দিবে কে!
  • Developed by: Sparkle IT