মহিলা সমাজ

নজরুল ও সাম্যের চেতনা

সালেহা আফরীন বেবী প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫৫:৪৫ | সংবাদটি ৮২ বার পঠিত

ব্রিটিশ শাসিত অখন্ড ভারতবর্ষে সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রমী এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হিসেবে বিদ্রোহী কবির শিরোপা পেয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।
কবিতা গানের মাধ্যমে শুধু শিল্প সাহিত্যের অঙ্গনে নয়, রাজনীতি ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তাঁর বিদ্রোহী অবদান ছিল বাঙালির জাগরণ ও মুক্তির প্রেরণা। মানবতার কবি নজরুল সমাজের শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে লেখনির মাধ্যমে যেভাবে লড়াই করেছেন তেমন নজির বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। তাঁর সৃজন কর্ম ও বিদ্রোহী চেতনা, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মুক্তিকামী বাঙালির শোষণ-উৎপীড়ন বিরোধী সকল রাজনৈতিক সংগ্রামে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কবি নজরুল হয়ে ওঠেন আমাদের প্রেরণার একটি বড় উৎস। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের অখ- বাংলায় বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে দারিদ্র্য কবলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যে দুখু মিয়া। নিজের সংগ্রামী জীবন ও সৃষ্টিশীলতার মাহত্ম্যেই তিনি হয়ে উঠেছেন আমাদের জাতীয় কবি।
১১ই জ্যৈষ্ঠ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী নানা আনুষ্ঠানিকতায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আবেগে স্মরণ করা হয়। কৈশোরে কবি ময়মনসিংহের ত্রিশালের কাজীর সিমলা গ্রামে কিছুকাল অতিবাহিত করার সময়ে এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা ক্রমেই কবির জীবদ্দশায় নিবিড় হয়ে উঠে। কবি হিসাবে খ্যাতি ও স্বীকৃতি অর্জনের পর তিনি এদেশের নানা স্থানে সংবর্ধনা ও সম্মেলনে এসেছেন বহুবার। কবিতায় ও গানে উজ্জীবিত করেছেন এদেশের মানুষকে। ১৯৭২ সালে কবিকে ঢাকায় আনা হয়। ধানমন্ডির ২৮ নাম্বার সড়কের একটি ভবন ও একটি গাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয় কবির নামে। ডাক্তার, নার্স সহ সে শুশ্রƒষার সবরকম ব্যবস্থা করা হয় রাষ্ট্রীয় তরফে। ভবনটির নতুন নাম রাখা হয় কবি ভবন যা বর্তমানে আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান নজরুল ইনস্টিটিউট।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রি প্রদান করেন। ১৯৭৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। একই বছর কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয় এবং ‘চল চল চল’ গানটি আমাদের রণসঙ্গীতের মর্যাদা পায়।
সাম্য, শান্তি, গণমানুষের কবি নজরুলের জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। লেটোর দলে গান করা থেকে রণাঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন কবি। গণমূখী গণমাধ্যম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রপথিক হয়ে থাকা কবি চলচ্চিত্রের সব শাখায় উপস্থিত থেকে প্রতিভার প্রমাণ রেখেছেন। রাগপ্রধান সঙ্গীতে তাঁর ঐশ্বর্য তুলনাহীন।
জাতিসত্তা, নবচেতনা এবং প্রেমের কবি ছোটবেলায় দুখু মিয়া হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রুটির দোকানে কাজ করেছেন, মক্তবে পড়িয়েছেন, যাত্রাদলের হয়ে গান লিখেছেন। এর ভেতর দিয়ে তাঁর হাত ধরেই সৃষ্টি হয়েছে গান, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, ছোট গল্প, আরো কতো কী।
রাজনীতিক কবি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। সাংবাদিক-সম্পাদক ছিলেন তিনি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চুরুলিয়া গ্রামে দুরন্ত এ শিশুর জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে। পরে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মুক্তি ও চেতনার কবি। বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলে শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শক্তিমান লেখনির মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ গড়ে জেল খেটেছেন একাধিক বার। রাষ্ট্রীয় শোষকগোষ্ঠীর আনুকূল্য চাননি তিনি। জমিদারির প্রত্যাশাও ছিলো না। তাই অকপটে বলে গেলেন- ‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান। তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।’ নজরুল বিদ্রোহ করেছেন সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বলেছেন, ‘বল বীর, চির উন্নত মম শীর।’ ৪৩ বছর বয়স পর্যন্ত লিখেছেন দু’হাতে। দুরন্ত এই কবির লেখা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে ঐশ্বর্য। রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে এসে সৃষ্টি করেছেন এক নতুন জগৎ। কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেড়ে উঠা এবং তাঁর সাহিত্যচর্চার পরিম-লের সাথে বাংলাদেশ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। তিনিই প্রথম পূর্ব বাংলাকে নিয়ে কবিতা রচনা করেন।
বিদ্রোহী কবির ব্যক্তি জীবন ছিলো দারিদ্র্য ও ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ। ১৯১৯ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত মাত্র ২৩ বৎসর কবির কর্মময় জীবনের পরিধি। নির্বাক হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত সারাজীবন তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন। গেয়েছেন সাম্যের গান। অনন্য প্রেম সঞ্চারি মানবপ্রেমে উদ্দীপ্ত আপন সৃজনকর্মের গুণে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
বিদ্রোহী কবি, মানুষের কবি, মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট, ৩ রমজান পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। কবি নজরুল তাঁর এক সঙ্গীতে আবেদন করে ছিলেন ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’। কবির অন্তিম ইচ্ছা স্মরণে রেখেই যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই কবিকে সমাহিত করা হয়।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাজে যে অনির্বাণ প্রদীপ জ্বালিয়েছেন তার আলোকছটায় দূরীভূত হয়েছে অন্ধকার। প্রতিভাত হয়েছে সোনালী সূর্য।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT