মহিলা সমাজ

বেগম পত্রিকা ও নূরজাহান

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫৬:২৪ | সংবাদটি ১২২ বার পঠিত

বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত এবং সাহিত্যিক নূরজাহান বেগম। তিনি ভারত উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’ এর সূচনালগ্ন থেকে ছয় দশক যাবৎ এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। নূরজাহান বেগম এর জন্ম ৪ জুন ১৯২৫ সালে চাঁদপুর জেলার চালিতাতলী গ্রামে। তাঁর পিতা ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এবং মাতা ফাতেমা বেগম। ১৯২৯ সালে সাড়ে তিন বছর বয়সে তিনি মা আর মামা ইয়াকুব আলী শেখের সঙ্গে কলকাতায় বাবার বাসায় চলে যান, যা ছিল কলকাতার ১১ নাম্বার ওয়েলেসলি স্ট্রিটের দোতলা বাড়ি, ‘সওগাত’ পত্রিকার দপ্তর। ‘সওগাত’ পত্রিকা অফিসে নিয়মিত সাহিত্য মজলিস বসত, যেখানে যোগ দিতেন কাজী নজরুল ইসলাম, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, হবীবুল্লাহ বাহার, ইবরাহিম খাঁ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ। এই সাহিত্য মজলিসের নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন নূরজাহান। এই রকম সাতিহ্য-ঘেষা পারিবারিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠার সুবাদে তিনি আধুনিকমনা এবং মুক্ত চিন্তার অধিকারী ছিলেন। যা পরবর্তীতে তাঁকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত করেছে।
নূরজাহান বেগমের প্রথম স্কুল ছিলো সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যালয়, যেখানে তাকে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। তাঁর ২য় স্কুল বেলতলা উচ্চ বিদ্যালয়, যেখানে তিনি ২য় শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুলে তিনি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর পঞ্চম শ্রেণিতে আবার পূর্বের বিদ্যালয় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে ভর্তি হন, যা অবস্থিত ছিলো ১৭ নং লর্ড সিনহা রোডের তিন তলা ভবনে। অষ্টম শ্রেণি থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত তিনি ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেন। ১৯৪২ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তারপর এইচএসসিতে ভর্তি হন কলকাতার লেডি বেবোর্ন কলেজে। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিল সাবেরা আহসান ডলি, রোকেয়া রহমান কবির, সেবতি সরকার, বিজলী নাগ, হোসনে আরা রশীদ, হাজেরা মাহমুদ, জাহানারা ইমাম। লেডি বেবোর্ন কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে আই এ পাশ করে বিএ-তে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকেই তিনি বিএ পাশ করেন।
নূরজাহান বেগমের বাবা নাসির উদ্দিন প্রতিষ্ঠিত ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন সুফিয়া কামাল। প্রথম চার মাস সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। যারা মেমোরিয়াল স্কুল ও লেডি বেবোর্ন কলেজে পড়তেন তারা সবাই মিলে ‘বেগম’ এর জন্য কাজ করতেন। ‘বেগম’ এর শুরু থেকে নূরজাহান ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তিনি বিয়ে করেছিলেন রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই) কে। ১৯৫০ সালে তাঁরা বাংলাদেশে চলে আসেন। ঢাকায় এসে নারীদের ছবি, লেখার জন্য উৎসাহ দিতেন নূরজাহান বেগম। যাতে এসব ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে। যারা লেখা পাঠাত তাদের ছবিও ছাপাতেন ‘বেগম’ পত্রিকায়। প্রথম দিকে পুরুষরাও এতে লিখতেন। তবে এখন শুধুমাত্র নারীরাই এতে লিখে থাকেন। ১৯৫৪ সালে মার্কিন মহিলা সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী মিসেস আইদা আলসেথ ঢাকায় বেগম পত্রিকা অফিস পরিদর্শন করেন। ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বেগম ক্লাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়। যার প্রেসিডেন্ট হন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, সেক্রেটারি হন নূরজাহান বেগম এবং বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন এর অন্যতম উপদেষ্টা।
নূরজাহান বেগম ঢাকার শরৎগুপ্ত রোডের ৩৮ নাম্বার বাড়িতে বাস করতেন। প্রায় ৬৪ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বেগম’ পত্রিকা। যদিও বিভিন্ন সময়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হয়েছে পত্রিকাটি নিয়ে, কিন্তু এতে করে ‘বেগম’ এর উদ্দেশ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। নারী জাগরণ, নতুন লেখক সৃষ্টি, সাহিত্য ও সৃজনশীলতায় নারীকে উৎসাহী করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। প্রথম দিকে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাঁরা লেখা, ছবি সংগ্রহ করতেন ‘বেগম’ এর জন্য। এখন নারীরা এগিয়ে এসেছে, আজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে, পারিবারিক ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে মেধার পরিচয় দিয়ে তাদের আসনকে পাকাপোক্ত করেছে। তেমনি সাহিত্য সাধনায়ও তারা পিছিয়ে নেই। নিজেই ‘বেগম’ পত্রিকায় লেখা পাঠিয়ে দিচ্ছে।
নূরজাহান বেগম বলেন, ‘মেয়েরা এখন হরহামেশা বাইরে পড়তে যাচ্ছে। উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরছে। তারপরও আমার মনে হয় নারীকে আরও সুযোগ সুবিধা দেওয়া উচিত। তাহলে সামাজিক উন্নয়ন দ্রুত ঘটবে। যোগ্যতার সুবিচার করতে হবে তাদের।’
নূরজাহান বেগম আজীবন মানুষের সেবায় কাজ করে গেছেন। এছাড়াও তিনি আপওয়া, জোনটা ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ, মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে সমাজসেবা করেছেন। নূরজাহান বেগম সমাজসেবা ও সাংবাদিকতার জন্য জীবনে অনেক সম্মাননা অর্জন করেছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠ চক্রের সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রোকেয়া পদক, ১৯৯৯ সালে গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি থেকে শুভেচ্ছা ক্রেস্ট, ২০০২ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৩ ও ২০০৫ সালে নারী পক্ষ দুর্বার নেটওয়ার্ক ও কন্যা শিশু দিবস উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে তিনি সংবর্ধনা লাভ করেন। এছাড়াও তিনি সংবর্ধিত হয়েছেন বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, চট্টগ্রাম লেডিস ক্লাব, চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিস ক্লাব, বাংলাদেশের নারী সাংবাদিক কেন্দ্র প্রভৃতি সংগঠনের মাধ্যমে। স্বর্ণপদক পেয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, লেখিকা সংঘ, কাজী জেবুন্নেসা মাহবুবুল্লাহ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ সাংবাদিক ফোরাম, রোটারি ক্লাব প্রভৃতি সংগঠন থেকে।
প্রগতিশীল নারীদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন সাংবাদিক নূরজাহান বেগম। আমাদের নারী সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
২০১৬ সালের ৫ই মে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ মে ২০১৬ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতার সূত্রপাত করেছিলেন এবং সেটাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এই দৃঢ়প্রত্যয়ী সমাজসেবক নূরজাহান বেগম। মহিয়সী, প্রগতিশীল এবং আধুনিকমনা এই নারী সাংবাদিকের প্রেরণায় আমাদের নারীরা সাংবাদিকতা পেশায় এসে সফলতা পেয়েছেন। তিনি ‘বেগম’ পত্রিকার মাধ্যমে বহু মেধাবী প্রতিভাবান নারীকে মেধা বিকাশের তথা লেখালেখির সুযোগ করে দিয়েছেন।
তিনি যদিও আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন। নারী জাগরণে এবং নারীর সৃষ্টিশীল মনন ও মেধা বিকাশে নূরজাহান বেগমের অবদান আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT