ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম সুলতানপুর

এডভোকেট মোহাম্মদ জুয়েল প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৫-২০১৮ ইং ০১:১১:১৩ | সংবাদটি ২৬১ বার পঠিত

সুলতানপুর একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে ওলিকুল শিরোমনি হযরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট আগমন করেন। হযরত শাহ্ জালাল (রহ.) সফর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়াগণ সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। ৩৬০ আউলিয়ার বেশ কয়েকজন ওলি আউলিয়ার মাজার বালাগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে। তাঁদের অনেকের নামে বিভিন্ন গ্রামের নামকরণ হয়েছে। ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সফরসঙ্গী হযরত শাহ্ সুলতান (রহ.) বালাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে শায়িত আছেন। তথ্যে জানা যায়, হযরত শাহ্ সুলতান (রহ.) নামানুসারে সুলতানপুর গ্রামের নামকরণ হয়েছে। আয়তন ও জনসংখ্যায় দেওয়ানবাজার ইউনিয়নের মধ্যে সুলতানপুর একটি বৃহৎ গ্রাম। সুলতানপুর একটি ঐতিহ্যমন্ডিত গ্রাম। গ্রামের অনেক কৃতি সন্তান সুদূর অতীত থেকে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অবদান রেখেছেন। এলাকাবাসী তাদের নিয়ে গর্ববোধ করে থাকেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব মাওলানা লুৎফুল হক চৌধুরী। তিনি সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় প্রিন্সিপাল ছিলেন। দেওয়ান আব্দুর রহিম চৌধুরী। তিনি ১৮৯১ সালে সুলতানপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকে তিনি সমাজসেবার প্রতি মনোযোগী ছিলেন। তিনি ১৯১৮ সালে সিলেট লোকাল বোর্ডের সদস্য ও ১৯২১ সালে পূনরায় একই বোর্ডের সদস্য এবং চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তিনি আসামের মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসাবে নিখিল ভারত মুসলিমলীগ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ভারত সরকার তাঁকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য দেওয়ান আব্দুর রহিম চৌধুরী সরকার থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক লাভ করেন। তিনি ১৯২১ সালে সুলতানপুর গ্রামে তাঁর নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ঐ বিদ্যালয়টি এম.ই (মধ্য ইংরেজী) স্কুলে উন্নীত হয়। সরকারের সংলিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৯৫৫ সালে জুনিয়র বিদ্যালয়, ১৯৫৬ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে এবং ২০১৩ সালে কলেজ শাখার যাত্রা শুরু হলে প্রতিষ্ঠানটির নাম দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজে উন্নীত হয়। সিলেটের আরেক কীর্তিমান ব্যক্তিত্বদের মধ্যে দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী ছিলেন একজন। তিনি ১৯০৯ সালের ১৭ জানুয়ারি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৬ সালে আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, ১৯৬২ সালে এবং ১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সিলেট পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
হেকিম বশিরুল হক চৌধুরী। তিনি সিলেট শহরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। অত্যন্ত সৌম্য, শান্ত নিরীহ প্রকৃতির ভদ্রলোক ছিলেন। আলাপ-আলোচনা, পোশাক-পরিচ্ছদে পৃথক আভিজাত্যের ছাপ ছিল। সমাজ থেকে তিনি শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা, সুনাম খ্যাতি যশ কুঁিড়য়েছেন। মানুষ আর মানবতার সেবাই করে গিয়েছেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠা ও উদ্দ্যেগে ১৯৪৫ সালে আসাম সরকার কর্তৃক সিলেট সরকারি তিব্বিয়া কলেজ (ইউনানী চিকিৎসার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তিব্বিয়া কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরই পুত্র ইনামুল হক চৌধুরী বীর প্রতিক। তিনি ১৯ জুলাই ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার কর্তৃক বীর প্রতিক খেতাব লাভ করেন। তিনি ১৯৬৭-৬৮ সালে বৃহত্তর সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদের তিনি ভিপি (সহ-সভাপতি) নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ দু’বার সিলেট-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য (এম.পি) নির্বাচিত হন। তিনি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁরই ভ্রাতা ডাঃ ইহতেশামুল হক চৌধুরী (দুলাল)। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-মহা ব্যবস্থাপক ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বি.এম.এ)’র কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব দায়িত্বে আছেন। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহা পরিচালক (প্রশাসন) পদে দায়িত্ব পালন করেন।
দেশের অন্যতম শীর্ষ আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা আনোয়ারুল হক চৌধুরী। তিনি সুলতানপুরস্থ হযরত শাহ্ সুলতান (রহ.) মহিলা টাইটেল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামীম। তাঁরই হাতে গড়া এ মাদরাসা নারী শিক্ষায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছে। আমার জানা মতে, তিনি একজন প্রচার বিমূখ, প্রজ্ঞাবান আলেম। মরহুম হাজী সোনাহর আলী একজন সালিশ বিচারক ছিলেন। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজের অন্যতম ভূমি দাতা। তাঁর পুত্র হাজী ছিদ্দেক আলী একজন কৃতি ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যে স্বপরিবারে বসবাস করছেন। ডাঃ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী। তিনি ১৯৯২ সাল জালালাবাদ রোটারী ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০১০-১১ সালে জড়ঃধৎু উরংঃৎরপঃ এড়াবৎহড়ৎ নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৪ সালে রোটারী ইন্টারন্যাশনালের বোর্ড অব ডিরেক্টরস কর্তৃক রোটারী ইন্টারন্যাশনালের সম্মাননা ‘সার্ভিস এডাব সেলফ’ অধিৎফ লাভ করেন। আব্দুছ সবুর চৌধুরী। তিনি সরকারি উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। মরহুম শফি উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজ ভূমিদাতা।
তাঁর পুত্র এডভোকেট কামাল উদ্দিন চৌধুরী বিশিষ্ট আইনজীবী, তিনি মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নূর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম স্কুল এন্ড কলেজের ভূমিদাতা। তাঁর বড় পুত্র হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী। একজন রাজনীতিবিদ তিনি দীর্ঘদিন যাবত বালাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ভ্রাতা মামুন কবির চৌধুরী যুক্তরাজ্য প্রবাসী। সেখানে প্রবাসী বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর এডুকেশন ট্রাস্টের অন্যতম ট্রাস্টি। দেওয়ান আব্দুর রহিম স্কুল এন্ড কলেজের আজীবন দাতা। মো.আব্দুল মন্নান। বাংলাদেশ ব্যাংক ময়মনসিংহ শাখার যুগ্ম-ব্যবস্থাপক। জালাল উদ্দিন চৌধুরী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী ছিলেন। আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী কৃষি অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। মরহুম ফখরুল ইসলাম চৌধুরী শিক্ষক ছিলেন। সেবুল আহমদ চৌধুরী। তিনি যুক্তরাজ্যে প্রবাসী। তিনি লন্ডন যুবলীগের প্রাক্তন সভাপতি ছিলেন। এমরান কবির চৌধুরী। শিক্ষানুরাগী ও সমাজকর্মী। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজের আজীবন দাতা। মো.সামছুদ্দীন রূপালী ব্যাংক লিঃ এর উপ-মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। এছাড়া ইনামুল হক চৌধুরী বীর প্রতিকের স্ত্রী মারিয়ান চৌধুরী সিলেট জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক। সুলতানপুর গ্রামে দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজ, সুলতানপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন পরিষদ, হযরত শাহ সুলতান (রহ.) মহিলা টাইটেল মাদরাসা, সুলতানপুর ভূমি অফিস, দেওয়ান বাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, গহরপুর ডাকঘর ও জেলা পরিষদ সিলেটের মালিকানাধীন সুলতানপুর ডাক বাংলো (পরিত্যক্ত) রয়েছে। এছাড়া সুলতানপুর মৌজার প্রকাশিত মোরারবাজারে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক লিঃ ও রূপালী ব্যাংক লিঃ শাখা রয়েছে। পরিশেষে আমি আশা করব আগামী প্রজন্ম সুলতানপুরের ইতিহাস ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন রেখে সুলতানপুরের ঐতিহ্য আরো সুদৃঢ় করবেন।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সোনারগাঁও
  • হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা
  • স্বামী হত্যার বিচার পাননি সাহার বানু
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT