ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইসলাম ও ইতিহাসে মুদ্রা ব্যবস্থা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৫-২০১৮ ইং ০১:১১:৪২ | সংবাদটি ১৬২ বার পঠিত

মানব সভ্যতার ইতিহাসে মুদ্রার উদ্ভাবন এক বিরল ঘটনা। আদিম ও প্রাচীন সমাজে মুদ্রার ব্যবহার না থাকলেও আধুনিক জগতে প্রতিটি সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা এতই জটিল হয়েছে যে, মুদ্রা ব্যবস্থা ও মুদ্রার ব্যবহার না থাকলে সভ্যতার চাকা অচল হয়ে পড়বে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইসলামের অবদান অনস্বীকার্য।
আদিম সমাজে ব্যক্তি মানুষ তার প্রয়োজনীয় সকল জিনিস নিজেই তৈরী করতো। ঐ সময় বিনিময়ের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের চাহিদা তৈরী হতে থাকে এবং ব্যক্তির একার পক্ষে তার প্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যের উৎপাদন অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সমাজে শ্রম বিভাগের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে মানুষ প্রয়োজনীয় সকল দ্রব্য উৎপাদনের চেষ্টা না করে কোন একটি বিশেষ দ্রব্য উৎপাদনে নিজেকে নিয়োজিত করে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য দ্রব্য নিজের দ্রব্যের বিনিময়ে অপরের নিকট থেকে সংগ্রহ করে। এভাবে সমাজে শ্রম বিভাগ দেখা দেয়ায় মানুষের জীবনে বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
পরস্পরের সঙ্গে নিজ নিজ উদ্বৃত্ত দ্রব্যের সরাসরি বিনিময় দ্বারা মানুষ তার প্রয়োজন মিটাতে পারে। কোন একটি দ্রব্যের পরিবর্তে অন্য একটি দ্রব্য সরাসরি বিনিময় করাকে দ্রব্য বিনিময় প্রথা বলে। আদিম সমাজে যখন মুদ্রার প্রচলন ছিল না তখন দ্রব্য বিনিময় প্রথাই বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তখন কেউ কোন জিনিস ক্রয় করতে চাইলে তাকে নিজের দ্রব্যের বিনিময়ে অন্যের দ্রব্য সংগ্রহ করতে হতো। কিন্তু দ্রব্য বিনিময় প্রথার বহু সমস্যা ও অসুবিধা ছিল। যেমন, প্রয়োজনের অসঙ্গতি, দ্রব্যের অবিভাজ্যতা, মূল্য পরিমাপকের অভাব, দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন, ঋণ পরিশোধের অসুবিধা ইত্যাদি।
সমাজে মুদ্রা বা অর্থের প্রচলনের সাথে সাথে দ্রব্য বিনিময় প্রথার উপরোক্ত অসুবিধাগুলো দূর হয়েছে। বস্তুত মানব সভ্যতার ইতিহাসে অগ্নি উদ্ভাবনের মত মুদ্রার উদ্ভাবনও একটি অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা। মুদ্রার প্রচলনের ফলে নিম্নোক্ত উপায়ে দ্রব্য বিনিময়ের অসুবিধাগুলো দূরীভূত হয়েছে। এক কথায় মুদ্রা অর্থনৈতিক জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। বিনিময় প্রথাকে ইসলামে নিন্দা করা হয়নি কিন্তু এর মধ্যে এমন কিছু রীতি বা রেওয়াজ রয়েছে যা একে শোষণ ও অবিচারের দিকে ঠেলে দেয়। তাই মহানবী স. শুধু সীমিত ক্ষেত্রেই এ পদ্ধতি ব্যবহারের অনুমোদন দান করেছেন এবং বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রার ব্যবহারকে উৎসাহিত করেছেন। বর্তমান অর্থনৈতিক জগতে মুদ্রার গুরুত্বকে বাড়িয়ে বলার উপায় নেই। একথা আজ সর্বজনস্বীকৃত যে, মুদ্রার ব্যবহার না থাকলে সভ্যতার চাকা অচল হয়ে পড়বে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো প্রথম দিকে একটি মুদ্রাবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সে চেষ্টা সফল হয়নি। বস্তুতপক্ষে মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুদ্রার গুরুত্ব অপরিসীম।
যে পদ্ধতির সাহায্যে দেশের অর্থের যোগান ও এর মূল্য নিয়ন্ত্রিত হয় তাকে মুদ্রাব্যবস্থা বলে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মপ্রবাহ অক্ষুণœ রাখার উদ্দেশ্যে অর্থের যথোপযুক্ত যোগানের বন্দোবস্ত করে দেশের দাম স্তর ও অর্থের মূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই মুদ্রাব্যবস্থার লক্ষ্য। সুতরাং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মুদ্রাব্যবস্থার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
ইসলামী মুদ্রা ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, দ্বি-ধাতুমান মুদ্রাব্যবস্থা। ইসলামের আবির্ভাবের পর সাময়িকভাবে রোম সাম্রাজ্যের স্বর্ণ মুদ্রা এবং পারস্য সাম্রাজ্যের রৌপ্য মুদ্রা- এ দুটি মুদ্রাই যুগপৎভাবে ইসলামী রাষ্ট্রে প্রচলিত ছিল। অতঃপর উমর রা. উক্ত মুদ্রা দুটির আকার আকৃতির কিছু পরিবর্তন এবং ইসলামী ভাবধারার কিছু শব্দাবলী সংযোজন করে ইসলামী মুদ্রা প্রচলন করেন। পরবর্তীতে খলীফা আব্দুল মালিক এবং উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে আরো অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ইসলামী মুদ্রার প্রচলন করা হয়, যা ইসলামের সুদীর্ঘ শাসনামলে প্রচলিত ছিল। ইসলামী মুদ্রা ব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, দেশের অভ্যন্তরে প্রচলিত বিহিত মুদ্রার ধাতবমান। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় বিহিত মুদ্রার অবশ্যই ধাতব মূল্য থাকতে হবে, কিংবা অবশ্যই তা পরিবর্তনীয় হতে হবে। এ অর্থে ইসলামে বিভিন্ন দেশে প্রচরিত কাগজি মুদ্রাকে সমর্থন করে কিন্তু এটাকে অবশ্যই পরিবর্তনীয় মুদ্রা হতে হবে। অর্থাৎ এ মুদ্রার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সমপরিমাণ কিংবা ন্যূনতম পরিমাণ স্বর্ণ কিংবা রৌপ্য থাকতে হবে, যাতে জনসাধারণ ইচ্ছে করলে সরকারের নিকট থেকে কাগজি মুদ্রার পরিবর্তে ধাতব মুদ্রায় পরিবর্তন করে নিতে পারে, কিংবা এমন বৈদেশিক মুদ্রা থাকতে হবে যার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ কিংবা রৌপ্য ঐ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে যেমন মার্কিন ডলার।
ইসলামী মুদ্রা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এটা সুদমুক্ত ব্যবস্থা। ইসলাম সুদকে যুলুম, নির্যাতন ও অর্থনৈতিক শোষণের হাতিয়ার আখ্যা দিয়েই ক্ষান্ত হয় নি বরং মানবতার মুক্তির সনদ সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা সুদ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাক, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক। আর যদি তা না কর তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। আর তোমরা যদি তা থেকে বিরত থাক এবং তওবা কর তাহলে তোমরা তাতে বিনিয়োগকৃত তোমাদের মূল পুঁজি গ্রহণ করতে পারবে। তোমরা কাউকে যুলুম করবে না এবং তোমরাও কারো যুলুম নির্যাতনের স্বীকার হবে না”। রসূলুল্লাহ স.-এর পবিত্র হাদীসে কঠোরভাবে সুদ গ্রহণ, ভক্ষণ ও সুদের কারবারে সাক্ষ্যপ্রদানকে শুধু নিষিদ্ধ বা হারামই করা হয়নি বরং তিনি তাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। আর এ জন্যেই ইসলামী মুদ্রাব্যবস্থা এ অভিশপ্ত সুদকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার ও বর্জন করেছে।
ইসলামী মুদ্রা ব্যবস্থা সুদ বর্জন করা ছাড়াও ইসলামী শরীয়তের সকল নির্দেশাবলী মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। ইসলামী শরীয়তের নীতিমালা অনুযায়ী এর সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কার্যবিধি ও কর্মপদ্ধতিতে ব্যাংক সম্পূর্ণরূপে ইসলামী শরীয়ার অনুসারী। আমানত গ্রহণ, বিনিয়োগ ও পরামর্শ প্রদানসহ সকল ক্ষেত্রেই ইসলামী শরীয়ার বিধি-নিষেধের প্রতি খেয়াল রাখা ইসলামী ব্যাংকের কর্তব্য।
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মপ্রবাহ সচল ও গতিশীল রাখা। অর্থনীতিতে মুদ্রা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য সুদূরপ্রসারী। মুদ্রা শুধু বিনিময় মাধ্যম এবং মূল্যপরিমাপক হিসেবে কিংবা সঞ্চয়ের বাহন এবং ঋণ পরিশোধের হাতিয়ার হিসেবেই ভূমিকা পালন করে না। বরং মুদ্রা বৃহদায়তন উৎপাদন ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে। জীবন ধারণ এবং উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবার দ্রুত বন্টনের নিয়ামক হিসেবেও কাজ করে। অর্থনীতিতে ভোগ ও বিনিয়োগ নির্ধারণে অর্থ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থের প্রসারণ এবং সংকোচন দেশের মোট চাহিদা হ্রাস বৃদ্ধি করতে পারে। আধুনিক জগতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনুন্নত দেশগুলোর মুদ্রা ব্যবস্থা ও আর্থিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে। অনুন্নত দেশসমূহে প্রচুর অব্যবহৃত প্রাকৃতিক সম্পদের পূর্ণ নিয়োগ দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন এই সমস্ত দেশের প্রধান লক্ষ্য।
দেশে যে পরিমাণ মানব সম্পদ রয়েছে তাদের পূর্ণ নিয়োগ লাভ দেশের মুদ্রা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মুদ্রাব্যবস্থা ও বিশেষ আর্থিক নীতির মাধ্যমে দেশে পূর্ণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে দেশের মোট কর্ম-নিয়োগের পরিমাণ সমাজের মোট ব্যয়ের উপর নির্ভর করে এবং অর্থব্যবস্থা ও আর্থিক নীতির সাহায্যে এ ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে যখন স্বর্ণমান প্রচলিত ছিল তখন মুদ্রাব্যবস্থা ও আর্থিক নীতির বিশেষ লক্ষ্য ছিল মুদ্রার বর্হিমূল্য স্থির রাখা। স্বর্ণমানে বিনিময় হারের উঠানামার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ দাম স্তর, উৎপাদন ও নিয়োগ স্তরের কাঠামোতে পরিবর্তন হয়। সুতরাং স্বর্ণমানের নিয়ম মেনে চলে বৈদেশিক বিনিময় হারের স্থিরতা বজায় রাখাই তখনকার মুদ্রাব্যবস্থা ও আর্থিক নীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কিন্তু যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর পরিবর্তিত অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থের বা মুদ্রার বহিমূর্ল্য অপেক্ষা অর্থের অন্তর্মূল্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অর্থের অভ্যন্তরীণ মূল্যের পরিবর্তনের ফলে সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার মান প্রভাবিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, অর্থের বহিমূর্ল্য ও অভ্যন্তরীণ মূল্যের মধ্যে কোন বিরোধ থাকা উচিত নয়। দেশের স্বার্থ অনুযায়ী উভয় মূল্যকেই কখনো স্থির রাখা উচিত এবং কখনো পরিবর্তিত হতে দেয়া উচিত।
মুদ্রা ব্যবস্থার আরেকটি অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্থির মূল্যন্তর। অর্থ বা মুদ্রা বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য ও সেবার মূল্য পরিমাপের মানদ- এবং ঋণ পরিশোধের মাপকাঠি। সুতরাং সঙ্গত কারণেই মুদ্রার মূল্য স্থির থাকা বাঞ্চনীয়। কারণ দাম স্তরের উর্ধ্বগতি ও নিম্নগতি উভয়ই ক্ষতিকর। তাছাড়া বাণিজ্যচক্রের উঠানামা রোধ করতে হলে দাম স্তরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নেহায়েত জরুরী। এছাড়া দাম স্তরের স্থিতিশীলতা আয় বৈষম্য হ্রাস করতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে। স্থিতিশীল দাম স্তর রপ্তানি বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেনের ভারসাম্য সৃষ্টিতে সহায়তা করে। সর্বোপরি দাম স্তরের অস্বাভাবিক উর্ধ্বগতি সীমিত আয়ের জনসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই মুদ্রাব্যবস্থা ও মুদ্রা নীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল স্থিতিশীল মূল্য স্তর বহাল রাখা।
ইসলাম অতিরিক্ত সম্পদ পুঞ্জিভূত করাকে যেমন অপছন্দ করে, তেমনি অলস সঞ্চয় একত্র করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং যথার্থ বিনিয়োগেও উৎসাহিত করে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পুঁজি উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার অপরিহার্য। অনেকে অর্থ সঞ্চয় করে তা দিয়ে নিজ উদ্যোগে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে সক্ষম নাও হতে পারে। তা ছাড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর পক্ষেও উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ অসম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা যা সঞ্চয়ের সন্নিবেশ ঘটিয়ে অর্থনীতিতে গতিশীলতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে। ইসলামী মুদ্রাব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
সুদ নির্মূল করা ইসলামী মুদ্রা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। সুদের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করে মুনাফাভিত্তিক একটি কল্যাণধর্মী অর্থব্যবস্থার ভিত্তি রচনায় ইসলামী মুদ্রা ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। কুরআন ও সুন্নাহয় সুদের অভিশাপ থেকে মানবতাকে মুক্ত থাকার জন্য যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ইসলামী মুদ্রাব্যবস্থা এ সুদ সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর।
ইসলামী মুদ্রাব্যবস্থার আরেকটি উদ্দেশ্য হল ইসলামী শরীয়ার পূর্ণ অনুসরণ। ইসলামী মুদ্রা ব্যবস্থার যাবতীয় কর্মপরিকল্পনা ও নীতি ইসলামী শরীয়ার আলোকে প্রণীত। তাই ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ শরীয়ার নীতি বিরুদ্ধ কোনো কাজ করে না এবং শরীয়া লংঘিত হয় এমন কোনো লেনদেনও করে না। যে সব খাতে শরীয়া বিনিয়োগ নিষিদ্ধ, ইসলামী ব্যাংকসমূহ কখনো তাতে বিনিয়োগ করতে পারে না, তা যতই লাভজনক হোক না কেন। ইসলামী ব্যাংক তার আমানত গ্রহণ নীতি থেকে বিনিয়োগ প্রদান নীতি পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে ইসলামী নিয়ম-নীতিকে মেনে চলে। আয় বৈষম্য দূরীকরণ এবং আয়ের অসম বন্টন দূর করার জন্য ইসলাম যাকাতব্যবস্থা, কর আরোপ, সম্পদ হস্তান্তর এবং আবর্তনের নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী মুদ্রাব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আল্লাহর দেয়া সম্পদের যথার্থ ব্যবহার, অপচয়রোধ এবং মানব সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে মানব জীবনকে অর্থবহ ও কল্যাণকর করে তোলা ইসলামী মুদ্রা ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। এই দুনিয়ার যাবতীয় সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ এবং এ সম্পদ তাই আল্লাহর হুকুম মতো ব্যবহার করতে হবে। আর তা হলেই কেবল মানুষের কাক্ষিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণ সাধিত হতে পারে। সম্পদের ব্যাপারে ইসলামের যে ধারণা রয়েছে, ইসলামী অর্থব্যবস্থা একই ধারণার ভিত্তিতে সম্পদকে ব্যবহার করে।
সম্পদের ব্যাপারে আল-কুরআনে বলা হয়েছে- “আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সমস্ত আল্লাহর। তোমাদের মনে যা আছে তা প্রকাশ কর কিংবা গোপন রাখ, আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে তার হিসাব নেবেন। তারপর যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করে দেবেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
মহান আল্লাহ তাঁর দেয়া সম্পদ ব্যয় করার মাধ্যমে সমাজের মানুষের জন্য পূর্ণ কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন। এ জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালাও রয়েছে ইসলামে। যে কোনো উপায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা ইসলামে কাম্য নয়। অপ্রয়োজনীয় ও অনাকাক্ষিত দ্রব্য-সামগ্রীর ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ইসলাম সমর্থন করে না। কেননা এরূপ মাত্রাতিরিক্ত ও বলগাহীন অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পদের যথেচ্ছা ব্যবহার বৃদ্ধি করে এবং সমাজে অনৈতিকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে মানুষকে নিশ্চিত ধ্বংসের পথে পরিচালিত করে। তাই মানবীয় ও বস্তুগত সম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় বাঞ্ছিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণ সাধন করা যেতে পারে। আর এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে ইসলামী মুদ্রাব্যবস্থা।
আধুনিক জগতের সকল দ্রব্য বস্তু ও সম্পদের মূল্য পরিমাপক এবং বিনিময় মাধ্যম হিসেবে এবং সকল অর্থনৈতিক কারবারের চাবিকাঠি হিসেবে মুদ্রা অপরিহার্য মাধ্যম। আধুনিক মুদ্রার উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাসে ইসলামের গৌরবোজ্জল ভূমিকা রয়েছে, যদিও আধুনিক অর্থনীতির প্রবক্তাগণ ইসলামের এই অবদানকে উপেক্ষা করতে চান। ইসলামের আবির্ভাবের যুগসন্ধিক্ষণে রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের ‘দিনার’ ও ‘দিরহাম’ আরব বিশ্বেও ব্যবহার হতো। ইসলামের আবির্ভাবের পর নব গঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের দ্বিতীয় মহান খলীফা উমর রা. এর আমল থেকে ইসলামী মুদ্রার উৎপত্তি ও বিকাশ শুরু হয়ে বাগদানের পতন পর্যন্ত ইসলামের সুদীর্ঘ শাসনামলে একটি অতি উন্নত এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলামী মুদ্রা ও মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেছিল। ইসলামের সুদীর্ঘ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত স্বর্ণ মুদ্রা ‘দিনার’ এবং রৌপ্য মুদ্রার ‘দিরহাম’ তৎকালীন প্রায় গোটা পৃথিবীতে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতো। ইসলামী শাসনামলের অবসানের পরও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ইসলামী মুদ্রা বিভিন্ন নামে ব্যবহৃত হতো। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন যাদুঘরে ‘ইসলামী মুদ্রা’ সংরক্ষিত আছে। তাই মুদ্রার ইতিহাস তথা আধুনিক মুদ্রার আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ইসলাম ও ‘ইসলামী মুদ্রা’ ও মুদ্রা ব্যবস্থার গুরুত্ব ও অবদান অবিস্মরণীয়। ইসলামী শাসনামলের অবসানের পর বহু শতাব্দি কাল গোটা পৃথিবী ইসলামের আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। তারপর প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মুসলিম দেশগুলো পুনরায় স্বাধীনতা লাভ করতে থাকে। মুসলমানরা হারানো গৌরব আবার ফিরে পায়। দিকে দিকে শুরু হয় মুসলমানদের নব জাগরণ। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইসলামী অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে নানা গবেষণা চলছে। ইসলামী মুদ্রাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা তাই এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT