শিশু মেলা

চাঁদনী

অমিত কুমার কুন্ডু প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৫-২০১৮ ইং ০১:৪৯:১৮ | সংবাদটি ৩২ বার পঠিত

রিকশা চালক রশিদের ঘর আলো করে এসেছে এক কন্যাশিশু। রশিদের বৌ আদর করে মেয়ের নাম রেখেছে চাঁদনী। চাঁদের মতই ফুটফুটে মেয়েটি। লম্বা করে হাই তোলে, আড়ামোড়া দেয় আর মিষ্টি করে হাসে। রশিদকে দেখলে হাত পা ছুড়ে জানান দেয়, যে সে তার কোলে উঠতে চায়। রশিদও মেয়েকে কোলে নিয়ে স্বর্গ বুকে পায়।
এভাবে আদর সোহাগের মাঝে দেখতে দেখতে মেয়ের বয়স ছয় মাস হয়ে গেছে। একদিন গ্রামের স্বাস্থ্য আপা আসলো রশিদের বাড়ি। রশিদের মেয়েকে কোলে নিয়ে বললো,
-ভাবী মেয়ের বয়সতো ছয় মাস হলো। এবার বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবারও একটু একটু খাওয়াতে হবে।
রশিদ মেয়েকে খুব ভালবাসে। সে স্বাস্থ্য আপার কথা শুনে প্রতিদিন রাত্রে ঘরে ফেরার সময় আঙ্গুর, কমলালেবু কিনে আনে। রশিদের বৌ মেয়ের ছোট্ট লালটুকটুকে ঠোঁট গলিয়ে সেই ফলের রস খাওয়ায়।
রশিদ মাঝে মাঝে বাজার থেকে মোটা মাছের পিচ্ কিনে এনে রশিদের বৌকে বলে,
-আমার আম্মার জন্য কত মোটা মাছ কিনে এনেছি দেখ। তুমি এই মাছ রেঁধে আমার মেয়েকে খাওয়াবা।
রশিদের বৌ সেই মাছ রেঁধে নরম করে একটু একটু করে মেয়েকে খাওয়ায়। মেয়ের মুখে ঝাল লাগবে বলে পানি দিয়ে ধুয়ে মুরগির মাংস মেয়ের হাতে দিয়ে দেয়। চাঁদনী ছোট হাতে মুটো করে সেই মাংস ধরে মুখের কাছে নিলে রশিদের বৌ-এর মুখটা খুশির হাসিতে জ্বল জ্বল করে ওঠে।
আর রশিদ যখন দেখে তার ফুটফুটে মেয়েটা নরম ঠোঁট দিয়ে আস্তে আস্তে এসব খাচ্ছে আর মায়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে হাত পা নাড়ছে তখন রশিদের সব কষ্ট কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। রোদে পোড়ার কষ্ট, জলে ভেজার কষ্ট, যাত্রীদের তুই তুকারী করার কষ্ট, সব ভুলে যায়। আর তাইতো রোজগারের টাকা থেকে মেয়ের জন্য দামী দামী খাবার কিনে আনে।
এভাবে রশিদের সংসার খুব ভালোই চলছিল। পাঁচ ছয় মাস পরে হঠাৎ এক রাত্রে চাঁদনীর জ্বর আসলো সাথে বমি। রশিদ সাথে সাথে রিকশা নিয়ে মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। রাত্র বারোটা বেজে গেছে, তাই হাসপাতালে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও বড় ডাক্তার পাওয়া গেল না। শেষমেশ একজন প্যারামেডিককে ঘুম থেকে ডেকে তুললে, সে রাগান্বিত হয়ে বললো,
-কি হয়েছে।
রশিদ একরাশ উৎকন্ঠা নিয়ে বলে উঠলো,
-স্যার মেয়ের গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। সাথে বমি।
-ঠিক আছে হাসপাতালে ভর্তি করে দেও, আমি দেখছি।
এরপর ডাক্তার সাহেব ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিলেন। রশিদ মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করতে গেলে কোন বেড পেল না। রশিদের বৌ একজন নার্সকে পেয়ে কান্নাকাটি করলে সে কোথা থেকে ২টা খাওয়ার স্যালাইন, পানি আর জরের সিরাপ এনে দিলো। রশিদের বৌ কুল কিনারা না পেয়ে হাসপাতালের বরান্দায় বসে মেয়েকে একটু একটু স্যালাইন, বুকের দুধ আর জ্বরের সিরাপ খাওয়াতে লাগলো।
কিন্তু জ্বর কমলো না, বরং ঠান্ডা বাতাসে আরো বেড়ে গেল। রশিদের চোখটা একটু বুজে এসেছিল। হঠাৎ আজানের ধ্বনি গুণে তার ঘুম ভেঙে গেল। পাশে তাকিয়ে দেখে চাঁদনীর মা মেয়েকে কোলে নিয়ে নির্ঘুম বসে আছে।
একটু পরে অন্ধকার ভেদ করে ভোরের আলো ফুটে উঠলো। কিন্তু রশিদের সময় যেন আর ফুরাতেই চাচ্ছে না। শেষে সকাল নয়টার রশিদ মেয়েকে বড় ডাক্তার দেখাতে পারলেন। ডাক্তার সাহেব মেয়ের চোখ আর জিহ্বা দেখলেন তার পর মেয়ের রক্ত সহ কয়েকটা পরীক্ষা করতে বললেন আর একটা ঔষধ লিখে দিয়ে বললেন,
-যতক্ষণ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া না যাচ্ছে, বুকের দুধের পাশাপাশি আধাঘন্টা অন্তর এই ঔষধটা মেয়েকে হাফ চামচ করে খাওয়াবেন।
রশিদ সাথে সাথে হাসপাতাল গেটের দোকান থেকে ঔষধ কিনে আনলো। রশিদের বৌ মুখ খুলে ঔষধটা মেয়েকে খাওয়াতে গেলেও মেয়ে খেল না। তুলে দিল।
রশিদের বৌ আঁচল দিয়ে মেয়ের মুখ মুছতে মুছতে রশিদের সাথে রক্ত পরীক্ষার রুমে আসলো। কিছুক্ষণ পর প্যাথোলজিস্ট আপা যখন চাঁদনীর হাতে ছুঁচ ফুটিয়ে রক্ত টেনে আনলো, তখন রশিদের বুক ফেটে যেতে লাগলো। এ যেন মেয়ের হাতের রক্ত টেনে নিচ্ছে না। ধারালো ছুরি দিয়ে রশিদের বুক ফালাফালা করে দিচ্ছে।
এদিকে রশিদের বৌ যখন বুকের দুধ দিয়ে মেয়েকে ঠান্ডা করতে চেষ্টা করছে, তখন রশিদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললো,
-আল্লাহ, আমার মেয়েকে ভাল করে দাও। আমি তোমার কাছে আর কিছু চাই না।
এরপর চোখ বুজে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে যখন মাথা নিচু করলো, তখন রশিদের চোখ ভিজে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো মাটিতে।
এর মাঝে কয়েক ঘন্টা কেটে গেছে। রশিদের বৌ কয়েকবার ঔষধ খাওয়াতে গেলেও মেয়ে খায়নি। প্রতিবারই ঠোঁট গড়িয়ে ঔষধ মাটিতে পড়ে গেছে। কিছুক্ষণ হলো বুকের দুধও আর খাচ্ছে না। শুধু চোখ বুজে মায়ের কোলে ঘুমাচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পর রশিদ ভিতরে গিয়ে শুনলো রিপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর চাঁদনীকে নিয়ে ওরা ডাক্তারের কাছে গেল।
এতোক্ষণ মেয়ের শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ডাক্তার মেয়ের চোখ দেখে আঁতকে উঠলেন। তারপর রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে বললেন, ফরমালিনের বিষক্রিয়য় আপনার মেয়ের দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া বমি ও জ্বরে পানি শূন্যতারও সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের আর কিছুই করার নেই। আল্লাহকে ডাকুন একমাত্র তিনিই বাঁচাতে পারেন।
ডাক্তারের কথা শুনে রশিদের বৌ চিৎকার করে কেঁদে উঠলো, আর চাঁদনী মায়ের মুখের দিয়ে চেয়ে আস্তে আস্তে নিথর হয়ে মায়ের কোলে ঢলে পড়লো।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT