শিশু মেলা

চুচং যেভাবে চোখ হারালো

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৫-২০১৮ ইং ০১:৫০:৩১ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

ভূতদের সহজে মন খারাপ হয় না। সব সময় হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করে। মন খারাপ হলে ওদের মাথামু- ঠিক থাকে না। মাথা বিগড়ে যায়। তখন দুষ্টমির যত কূট-কৌশল আছে সব্ চর্চা করতে থাকে। এই যেমন ছোট বাচ্চাদের কাঁদানো। বাচ্চাদের রাগানো। কেউ কোনো ভালো কাজ করতে থাকলে তার মনকে মন্দপথে চালিত করা। বাচ্চাদের মনে দুষ্টমির নতুন নতুন ফন্দি জাগিয়ে তোলা। এসব না করলে নাকি ওদের একটুও ভালো লাগে না। দুষ্টমি করে ওরা মজা পায়। বেজার মন ভালো হয়ে যায়।
কিছু সিরিয়াস ব্যাপার আবার ভূতদের মাঝেও দেখা যায়। এই যেমন মৃত্যুর ব্যাপারটা। মৃত্যু জিনিসটা ওদের মাঝেও আছে। যদি কারো বাবা-মা মারা যায়। প্রিয় কোনো বন্ধু-বান্ধব মারা যায়। তখন মন খারাপ না হয়ে উপায় কী?
মন আপনিতেই খারাপ হয়ে যায়।
কিন্তু ভুচংয়ের মন আজ একটুও খারাপ হল না। ভুচং হল একজন বাচ্চাভূত। তোমাদের যেমন বয়স ওরও তেমন। গোল আলুর মত গোলগাল চেহারা। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। সারা শরীর পশুর মত লোমে ঢাকা। হাতির কানের মত বড় একজোড়া কান। দড়ির মত চিকন চিকন হাত-পা। ফুটবলের মত গোল মাথা। মাথায় দুটো শিং। হাঁড়িমুখো। গোল নাক। নাকে দুটো ফুটো। মূলার মত সাদা সাদা দাঁত। কপালে কোনো চোখ নেই। একটিমাত্র চোখ। তাও পেটের ঠিক মাঝখানে চোখটি দেখতে ক্রিকেট বলের আকার। ওদের সবারই এমন অদ্ভুত চেহারা।
ভুচং ভারি বজ্জাত। ছোট বাচ্চাদের পেছনে সারাক্ষণ লেগে থাকা স্বভাব। কিন্তু এখনো সে কারো পিছনে লাগতে পারেনি। বলা যায় সুযোগ পায়নি। আমার কথা তোমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? না হবারই কথা। কারণ ভুচংকে তো আর তোমরা কেউ দেখনি। দেখাদেখির দরকার কী? সব কিছু দেখে বিশ্বাস করতে হয় না। কিছু জিনিসি না দেখেও বিশ্বাস করতে হয়। যেমন আমরা ¯্রষ্টাকে না দেখেও বিশ্বাস করি। তিনি আছেন। তোমরা বড় রকমের কোনো দুষ্টমি করলে ধরে নিবে ভুচং আশ-পাশেই কোথাও আছে। দুষ্টমিটা আসলে তুমি করোনি। সে-ই করেছে। তোমাকে দিয়ে করিয়েছে।
আজ সকালে ভুচংয়ের বাবা-মা মারা গেছেন। তোমরা হয়ত জান না। ভূতদের নিয়ম-কানুন সব অন্যরকম। উল্টাপাল্টা। কারো বাবা মারা গেলে সাথে মাও মারা যায়। স্বাভাবিক নিয়মেই ভুচংয়ের মন খারাপ হওয়ার কথা। কিন্তু হয়নি। বাবা-মার মৃত্যু হওয়ায় আনন্দে সে শিম্পাঞ্জির মত লাফালাফি শুরু করে দিল।
তার আশ্চর্য উল্লাস দেখে বন্ধু চুচং জিজ্ঞেস করল-হ্যাঁরে ভুচং! তোর বাবা-মা মারা গেল। কোথায় তুই একটু শোক প্রকাশ করবি। মন-টন খারাপ করে বসে থাকবি। তা না করে উল্লাসে মেতে উঠেছিস। ব্যাপার কী, বল তো? চুচংয়ের কথা শুনে হা-হা করে হেসে ওঠল ভুচং। বলল, দোস্ত! বলতে পারিস, এতদিন আমি ছিলাম এক প্রকার বন্দী। বাবা-মার বারণ আর রক্তচক্ষুর শাসানিতে বুক ভরে স্বস্তির নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারতাম না। ভূতদের ঘরে জন্ম নিয়েছি। কোথায় একটু ছোটাছুটি করব। মনভরে একটু দুষ্টামি করব। কিন্তু বাবা-মার জন্য এতদিন সুযোগই পেতাম না। তারা শুধু বলত, এটা করো না। ওটা করো। ওটা করো না। এটা করো। এটা ঠিক নয়। ওটা ঠিক। ওসব শুনতে শুনতে আমার আর দুষ্টুমিই করা হল না। এখন বাবা-মা নেই। যা মনে ধরে আমি তাই করব। নাচব। গাইব। মানুষের বাচ্চাদের প্রতিদিন দুষ্টামি করা শিখাব। তারপর এক একটাকে অবিকল ভূত বানিয়ে ফেলব। কি বলিস তুই। বুদ্ধিটা খুব চমৎকার, তাই না?
চুচং এতক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে ভুচংয়ের কথা শুনছিল। এবার সে বলল, খুবই সঠিক কথা দোস্ত। এ ব্যাপারে আমিও তোর সাথে একমত। জানিস তো, আমার বাবা-মাও অনেক দিন হয় মারা গেছেন। অথচ আমি কী বোকা দেখ। জীবনে কত সুযোগ পেলাম। কিন্তু কাজে লাগালাম না। এতদিন আমি একটুও দুষ্টামি করিনি। এখন মনে হচ্ছে দুষ্টামি করাটা খুব দরকার ছিল। না করাটাই বরং ভুল হয়েছে। চল দোস্ত। দু’বন্ধু মিলে আজ সারা দিন শুধু দুষ্টামি করব।
তারপর দু’বন্ধু গলাগলি করে বেরিয়ে পড়ল। হেঁটে হেঁটে ওরা এক মাঠের কাছে এল। হঠাৎ ওদের চোখে পড়ল অনেকগুলো শকুন। শকুনগুলো কিছু একটা নিয়ে ঠোকাঠুকি করছে। ডানা ঝাপটিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। একসঙ্গে এতগুলো শকুন ওরা এই প্রথম দেখল। শকুন দেখে তো ওরা মহাখুশি! ব্যাপারটা আসলে কী ঘটছে দেখার জন্য ওদের মনে খুব কৌতুহল জাগল।
তারপর দু’জন এগিয়ে গেল শকুনদের কাছাকাছি। দেখল, একটা মরা গরু পড়ে আছে মাঠে। মরা গরু পেয়েই শকুনদের এত উল্লাস। কয়েকটি কাক ওড়াউড়ি করছে। কিন্তু নামতে পারছে না। অদূরে দাঁড়িয়ে চার-পাঁচটা নেড়ি কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। শকুনদের জন্য তারাও সুবিধা করতে পারছে না। কতগুলো বাচ্চা ছেলে-মেয়ে দূরে জড় হয়ে শকুনদের মরা গরু খাওয়া দেখছে।
ভুচং আর চুচংয়ের উপস্থিতিটা ইতিমধ্যে শকুনেরা টের পেয়ে গেছে। হঠাৎ ওরা চিৎকার-চেঁচামেচি রেখে ঘুরে দাঁড়াল। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ, ভুচং আর চুচংকে তো কেউ দেখতে পায় না। শকুনেরা দেখল কীভাবে? ভূতদের ব্যাপার আসলে বড়ই রহস্যপূর্ণ। মানুষ ছাড়া আর সবাই তাদেরকে ঠিক ঠিক দেখতে পায়।
ভুচং আর চুচং আরো একটু এগিয়ে গেল সামনে। অমনি শকুনগুলো আচমকা ডানা ঝাপটিয়ে জোরে চেঁচিয়ে ওঠল। কিন্তু কেউ উড়ে গেল না। ভুচং-চুচংয়ের কানে ফিসফিস করে বলল, চল গিয়ে একটাকে ধরে ফেলি। এক একটার গলা কত লম্বা দেখেছিস? ওদের লম্বা গলা ধরে মাথার ওপর নিয়ে ঘোরালে নিশ্চয়ই খুব মজা হবে। কী বলিস তুই? যাবি নাকি?
চুচং বলল, চল যাই।
তারপর দু’জন একেবারে শকুনদের কাছাকাছি চলে এল। চুচং হঠাৎ খপ্ করে একটি শকুনের গলায় ধরে ফেলল। ভুচং আরেকটিকে ধরতে গেল। কিন্তু ওর আর ধরা হল না। শকুনেরা চারদিক থেকে ওদের ঘিরে ফেলল। তারপর এলোপাথাড়ি ঠোকর বসাতে লাগল। শকুনের ঠোকর খেয়ে তো ওদের অবস্থা প্রায় দফারফা। শেষে কোনো মতে জান নিয়ে দু’জন পালিয়ে বাঁচল।
শকুনের ঠোকর ওদের শরীরে খুব একটা জখম করতে পারেনি। ভূতদের শরীর বলে কথা। একদম রাবারের মতই স্থিতিস্থাপক। তবে চূচং অক্ষতভাবে ফিরতে পারেনি। শকুনেরা ওর একমাত্র চোখটি খাবলে নিয়েছে। বেচারা চূচং এখন বড় অসহায় বোধ করছে। ওর অসহায় ভাব দেখে সাহস জোগাতে ভুচং বলল, চুচং বন্ধু আমার। মন খারাপ করিস না। ¯্রষ্টার কাছে শোকর আদায় কর। অসীম দয়ালু তিনি। ইচ্ছে করলে তিনি আমাদেরকে শকুনের পেটে দিতে পারতেন। কিন্তু দেননি। বাঁচিয়ে রেখেছেন। চুচং হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। বলল, এখন আমার কী হবেরে দোস্ত। আমার তো কোনো চোখ নেই। আমি এখন কি দিয়ে দেখব। ভুচং বন্ধুকে সান্ত¦না দিয়ে দৃঢ়কন্ঠে বলল, তোর চোখ নেই তো কি হয়েছে? আমার তো আছে। আমার চোখ দিয়েই এখন তুই দেখবি। সারাজীবন আমি তোকে ছায়ার মত আগলে রাখব, বুঝলি?
ভুচংয়ের কথা শুনে চুচং কিছুটা সান্ত¦না পেল। কিন্তিু পরক্ষণেই ওর মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, আহা! আমার প্রিয় চোখরে। তোকে আমি কোথায় খুঁজে পাই। জীবনে কোনোদিনই দুষ্টামি করিনি। আজ কেন যে ভূচংয়ের কথায় দুষ্টামি করতে গেলাম। এখন সারাজীবন আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। আহ কী দুঃখ আমার! নিজের বোকামির কথা ভেবে তার মনটা একেবারেই খারাপ হয়ে গেল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT