ধর্ম ও জীবন

এতেকাফের মাহাত্ম্য ও ফযিলত

ইমদাদুল হক ফয়েজী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৬-২০১৮ ইং ০১:৪৫:৪৭ | সংবাদটি ১৫৬ বার পঠিত

পুণ্যময় রামাযান। মুমিন জীবনে এক অনন্য অধ্যায়। মানুষ মাত্রই পার্থিব বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে জীবনে কিছু আনন্দ, খুশির মুহূর্ত রয়েছে। যেমন-ছাত্রের জন্য ফলাফল ঘোষণার সময়, পিতা-মাতার জন্য সন্তান লাভের সময় প্রভৃতি। অনুরূপ মুমিন বান্দার জন্য ইবাদাতের ফসল চাষ করে পরকালীন পুণ্য অর্জনের রয়েছে উর্বর মওসুম, উৎকৃষ্ট সময়। আর তা হচ্ছে রামাযান মাস। এ মাসে অবতীর্ণ করা হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব মহাগ্রন্থ কুরআন মাজীদ। বলা বাহুল্য, রামাযান মাসের প্রধান ইবাদাত সাওম। সাওম বা রোজার প্রতিদান আল্লাহ তা’আলা নিজ হাতে প্রদানের সুসংবাদ হাদীসে কুদসিতে বিবৃত হয়েছে। এমাসেই রয়েছে হাজার মাস থেকেও উত্তম রজনী-লাইলাতুল ক্বাদর বা শবে ক্বদর। হাদীসের বর্ণনানুযায়ী লাইলাতুল ক্বাদর রামাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত সমূহের কোনো একদিন হয়ে থাকে। আর এ দশকটিই আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ নিয়মে মসজিদে অবস্থান করাই হচ্ছে এতেকাফ। অভিধানে এতেকাফ অর্থ-অবস্থান করা, আবদ্ধ করা। বান্দা নিজেকে পার্থিব বিষয়াবলী থেকে আবদ্ধ করে প্রভূর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য মহান মাওলার ঘর মসজিদে অবস্থান করে বলেই এতেকাফ বলা হয়।
ইরশাদ হচ্ছে-‘আমি বিধান জারি করলাম ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) এর প্রতি-তোমরা পবিত্র রাখো আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, এতেকাফকারী ও রুকু সেজদাকারীর জন্য’। (আল কুরআন-২ : ১২৫)
রাসূল (সা.) কিছু কিছু আমল মাঝে মধ্যে ছাড়তেন আবার অনেকটা ছাড়তেন না। এতেকাফ হচ্ছে রাসূল (সা.) এর এরূপ একটি আমল, যা হিজরতের পর কখনও ছাড়েননি।
উম্মুল মু’মিনিন হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) মদীনায় হিজরতের পর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত প্রতি রামাযানের শেষ দশক এতেকাফ করেছেন এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর পতœীগণ এতেকাফ করেছেন। (বুখারি, মুসলিম)
এতেকাফের সর্বোত্তম স্থান মসজিদে হারাম, মর্যাদার অবস্থানে দ্বিতীয় স্থান হচ্ছে মসজিদে নববী (সা.) এবং তৃতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস। অতঃপর জামে মসজিদ সমূহ, সবশেষে ঐসব মসজিদ যেগুলোতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা হয়। অর্থাৎ পাঞ্জেগানা মসজিদ।
এতেকাফ তিন প্রকার। যথা- ওয়াজিব, সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ কেফায়াহ ও মুস্তাহাব।
বিশেষ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বা এমনিতেই রামাযানের শেষ দশক এতেকাফের মান্নত করলে তা আদায় করা হচ্ছে ওয়াজিব এতেকাফ। প্রতি জামে মসজিদে রামাযানের শেষ দশক এতেকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ কেফায়াহ। কমপক্ষে গ্রাম বা পাড়া-মহল্লার একজন পুরুষ আদায় করলে মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। অন্যথায় সকলেই এ ইবাদাত ত্যাগকারীর পাপকারী বলে গণ্য হয়ে যান। এ দু’প্রকার এতেকাফ ছাড়া যেকোনো সময় মসজিদে এতেকাফের নিয়তে অবস্থান করা হচ্ছে মুস্তাহাব এতেকাফ। আমরা সব সময় মসজিদে এ নিয়তে প্রবেশ করবো। এতে অতিরিক্ত পুণ্য লাভ হবে ইনশা-আল্লাহ। উল্লেখ্য, ওয়াজিব ও সুন্নাত এতেকাফের জন্য রোজাদার হওয়া শর্ত। এ দু’প্রকার এতেকাফের জন্য ২০ রামাযান সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়।
এতেকাফকারীকে স্মরণ রাখতে হবে যে, তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মানিত ও সর্বোত্তম স্থান মসজিদে বছরের শ্রেষ্ঠ সময়ে অবস্থান করছেন। মূল্যবান সময় ও স্থানে ইবাদত সম্পাদন করলে পরিমাণ-ওজনে সওয়াব অধিক হয় তদরূপ বিপরীত ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ পাপকাজে গোনাহও বেশি হয়। সুতরাং এতেকাফকারী সবসময় নিজেকে ইবাদাতে ব্যস্ত রাখবেন। সকল প্রকার গোনাহ’র কাজ এবং অনর্থক গল্পগুজব থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকবেন। মসজিদের আদব পরিপন্থী যাবতীয় কাজ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি এতেকাফ বিশুদ্ধ হওয়ার আবশ্যকীয় কিছু মাসয়ালা অনুসরণ করবেন। যথা-২০ রামাযান সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতর এর চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ শুনার পূর্ব পর্যন্ত রোজাসহ মসজিদে অবস্থান করতে হবে। (কাপড় বা এরকম কিছু দিয়ে অবস্থানস্থল বেষ্টন করে নিবেন) কারোও রোযা ভেঙ্গে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে, বা সাওম’র সক্ষমতা না থাকলে অথবা রোযা অবস্থায় নিষিদ্ধ এমন কোনো কাজ এতেকাফকারীর পক্ষ থেকে সংঘটিত হলে এতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। এতেকাফকারী এ সময়টুকুর মধ্যে প্রাকৃতিক প্রয়োজন, ওযু ও ফরজ গোসলের প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হতে পারবেন না। এ প্রয়োজনগুলোর কোনো একটির জন্য বের হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মুহূর্তকাল সময়ও বাইরে থাকতে পারবেন না। এমনকি কেউ এতেকাফের কথা ভুলে গিয়ে বাইরে সামান্যতম সময় অতিবাহিত করলে এতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, এতেকাফে প্রাকৃতিক প্রয়োজন, ওযু ও ফরজ গোসল, পাঞ্জেগানা মসজিদে এতেকাফ করলে জুম’য়ার নামাজের জন্য জামে মসজিদে যাতায়াত এবং মসজিদে খাবার এনে দেয়ার মতো কেউ না থাকলে খাদ্যগ্রহণের জন্য যাতায়াতের অনুমতি (অবশ্য তা একদম প্রয়োজন অনুযায়ী ও চুপচাপ হতে হবে) ব্যতিত ব্যক্তিগত, ধর্মীয় বা জনসেবামূলক কোনোও কাজের জন্য বাইরে বের হওয়ার অনুমতি নেই। তাই অভ্যাসগত সাধারণ গোসল, কাপড় কাঁচা, হাত-মুখ বা অন্য কিছু ধুয়া-মুছা/ পরিস্কার করা বা ধূমপান, গল্পগুজব প্রভৃতির জন্য বাইরে বের হওয়া মাত্রই এতেকাফ নষ্ট হয়ে যায়।
এতেকাফকারী অনুমতি ছাড়া কারোও কোনো কিছুতে হাত দিবেন না, ব্যবহার করবেন না। মসজিদ বা মুসল্লির ক্ষতি হয় এরূপ সবকিছু থেকে সর্বদা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। এতেকাফ সঠিক ও পুণ্যময় হওয়ার জন্য এতেকাফকারীকে বিষয়গুলোর প্রতি অবশ্যই যতœবান হতে হবে।
মহিলারা নিজ ঘরের নির্জন স্থানে এতেকাফ করবেন। ইবাদাত, পানাহারসহ সকল কাজে এস্থানেই নিজেকে সব সময় আবদ্ধ রাখবেন। অনর্থক ও পার্থিব কথাবার্তা, কাজকর্ম থেকে বিরত থাকবেন। প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও ওযুর প্রয়োজন ছাড়া নির্দিষ্ট স্থান হতে বের হবেন না।
এতেকাফের ফযিলত সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, রামাযানের শেষ দশক এতেকাফের সওয়াব হচ্ছে, দু’টি হজ্ব ও উমরাহ’র সমপরিমাণ। (বায়হাকি)
এতেকাফ মহান প্রভূর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পন্থা। বান্দা শুধুমাত্র পরকালীন পূণ্য লাভের উদ্দেশ্য পার্থিব সকল প্রয়োজন পিছনে ফেলে দশটি দিন আপন প্রভূর ঘর মসজিদে তাঁরই বন্দেগিতে নিবিষ্ট থাকে। কেবলই দরবারে এলাহিতে আরাধনা, প্রার্থনা করে। তাসবিহ-তাহলিল, তেলাওয়াত, জিকির, সালাত তথা ইবাদাত-বন্দেগিতে নিজেকে হরদম ব্যস্ত রাখে। প্রাণভরে সেজদা করে, নীরবে-নীভৃতে অশ্রু ঝরায়, কাকুতি-মিনতি করে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল চাওয়া-পাওয়া মনিবের হাতে সোপর্দ করে। পিছনের জীবনের পাপের জন্য ব্যথিত হৃদয়ে অনুতপ্ত হয়। লজ্জিত হয়ে প্রতিশ্রুতি দেয় ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না করার। প্রকৃত প্রেমাস্পদের ভালোবাসা পেতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এক কথায়, নিজেকে আপাদমস্তক সপে দেয় রাব্বে কারীমের হাতে। বুঝাতে চায়- প্রভূ, আমি তোমার অনুগত বান্দা। তুমি আমাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছো, আমি আমার সামর্থের সবটুকুই তোমার জন্য নিবেদন করছি। আমার সালাত, ইবাদাত, বেঁচে থাকা, ইন্তেকাল সবই শুধুমাত্র তোমার জন্য। আমি তোমাকে পেতে, তোমার ভালবাসা পেতে, সন্তুষ্টি পেতে তোমার ঘরে ছুটে এসেছি, তোমার দুয়ারে পড়ে রয়েছি। আমাকে বঞ্চিত করোনা; কবুল করে নাও, তোমার প্রিয় করে নাও।
বলা বাহুল্য, দুনিয়ার কোনো কৃপণ প্রকৃতির লোকের কাছ থেকে কেউ দুয়েক বার বিফল হয়ে ফিরে এসে যখন আবার যায়, মিনতি করতে থাকে, শেষপর্যন্ত কিছুটাও হলেও সফল হয়। অফুরন্ত দয়ার সাগর, অকল্পনীয় ভালোবাসার মহান অধিপতির পক্ষে কী করে সম্ভব, তাঁর বান্দাকে রিক্ত হস্তে ফিরিয়ে দেয়া, তাঁর প্রেম সাগর আর ভালোবাসার মোহনায় অবগাহন না করিয়ে বিদায় দেয়া? আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রাহ.) বলেন-‘এতেকাফের মাহাত্ম্য হলো আল্লাহর সাথে রূহ ও অন্তরের সম্পর্ক স্থাপন করা। এতেকাফকারীর দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মতো-যে কারো দরবারে হাজির হয়ে এ কথা বলে যে, আমার দরখাস্ত কবুল না করা পর্যন্ত আমি ফিরবোনা।’
সুতরাং বলা যায়, এতেকাফ প্রভুর ভালোবাসা এবং সান্নিধ্য লাভের সোপান। পবিত্র জীবন গঠনের, সর্বোপরি যাবতীয় পাপকাজ থেকে মুক্ত থেকে একনিষ্ঠভাবে খোদাভীরু-মুত্তাকি হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার ব্যতিক্রমী অনুশীলন হচ্ছে এতেকাফ। আসুন, শূন্য থলে পুণ্যে ভরার বসন্ত উৎসবে এতেকাফের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। অযতœ-অবহেলা, অনর্থক আর গোনাহ’র কাজে জীবনে কতো সময় নষ্ট করেছি তার তো কোনো ইয়ত্তা নেই। দশটি দিন মহান রাব্বে কারীমের কাছে মঞ্জুর হয়ে গেলে তা পূর্বের সকল পাপকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দিতে পারে। জান্নাতের পথ ধরে হয়ে যেতে পারে আগামীর পথচলা। আল্লাহর রঙ-এ রঙিন হয়ে যেতে পারে জীবন। রাব্বে কারীম, আমাদের তাওফিক দিন মহিমান্বিত এতেকাফসহ সকল পুণ্যকাজের, ইবাদাতের। আমিন ॥

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT