ধর্ম ও জীবন

রমযানের শিক্ষা

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৬-২০১৮ ইং ০১:৪৬:১৯ | সংবাদটি ৫১ বার পঠিত

ইসলাম এমন কোন ধর্ম নয় যাহা শুধু খোদা এবং মানুষের মধ্যকার একটা সম্পর্ক মাত্র। বরঞ্চ জীবনের সর্বক্ষেত্রেই নৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রেই ইসলাম নির্দেশ প্রদান করে থাকে। যেমন পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা, সহানুভুতি উদারতা প্রভৃতি। পক্ষান্তরে কতকগুলো নিন্দনীয় আচরণ যা সামাজিক শান্তি শৃঙ্খলা বিঘিœত করে যেমন হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, মিথ্যাচার আর পরনিন্দা চর্চা ইত্যাদি। তাছাড়া কারো দোষ খুঁজে বলে বেড়ানো, কুৎসা রটানো করা, গিবত করা। এসবকেই পরচর্চা ও পরনিন্দা বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে সুরা আল হুজুরাত আয়াত নং ১২ বলেছেন-২ হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুমান হতে দূরে থাক। কারণ, কোন কোন ক্ষেত্রে কল্পনা পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় তথ্য খুঁজিও না ও পশ্চাতে নিন্দা করো না। কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করবে? বস্তুত: তোমরা একে ঘৃণা করবে। আল্লাহকে ভয় কর আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী; দয়ালু। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে-পরনিন্দাকারী জান্নাতে প্রবেশ করিবেনা (বুখারী ও মুসলিম)। এ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেনÑতোমরা অন্যের দোষ অন্বেষণ করবে না, গুপ্তচরবৃত্তি করবে না, পরস্পর কলহ করবেনা, হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করবে না। একে অপরকে ঘৃণা করবে না, অন্যের ক্ষতিসাধণের কোন কৌশল অবলম্বন করবে না। তোমরা আল্লাহর প্রকৃত বান্দা ও পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও (বুখারী ও মুসলিম)।
ইসলামে কালেমা, নামাজ, যাকাত, রোজা ও হজ্ব এই পাঁচটি বিষয়কে স্তম্ভ বলা হয়েছে। আমরা সাধারণত: ভিত্তি ছাড়া দালান এবং মূল ছাড়া বৃক্ষ কল্পনা করতে পারিনা। তেমন পাঁচটি বিষয় ছাড়া আমরা ইসলাম কল্পনা করতে পারি না। আর ইসলামে যারা বিশ্বাসী এবং অনুসারী তাদেরকে বলা হয় মুসলিম। ইসলামে আধ্যাত্মিক ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের আত্মা প্রবৃত্তির দাসত্ব করে এবং পার্থিব ভোগ বিলাস ও লালসার মোহ থেকে মুক্ত হবে এবং আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টি লাভের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হবে। মানুষের এই মানষিকতা সৃষ্টির জন্যই নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্ব প্রতিপালনের জন্য খোদা প্রদত্ত নির্দেশ রয়েছে।
রোজা বা সিয়াম শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বিরত রাখা বা থাকা। ঊষার আলো প্রতিভাত হওয়ার পর থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার সহ যাবতীয় হালাল কাজ থেকে বিরত থাকা হয় বলে এই আমলকে সিয়াম বলা হয়। রোজা মানুষের মধ্যে আল্লাহভয় এবং আত্মশুদ্ধি ও মানুষের আত্মসংযমের মূল্যবান গুণের সৃষ্টি করে। রোজাদার ব্যক্তির মধ্যে যদি কুকর্ম ও কুপ্রবৃত্তি বর্তমান থাকে তবে বুঝতে হবে হয় সে রোজার উদ্দেশ্য বুঝতে পারেনি কিংবা বুঝে থাকলেও তদানুযায়ী আমল করেনি। তাই প্রকৃত পক্ষে রোজাদার এবং বেরোজাদারের মধ্যে কোন পার্থক্য রইল না। হাদীসে আছেÑযে কেউ রোজা থাকা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার উপর চর্চা করা ছেড়ে না দিবে সে যেন জেনে রাখে যে, আল্লাহ তালার তরফ থেকে দরকার ছিল না যে সে ব্যক্তি পানাহার ছেড়ে দিক (বুখারী)। মনে রাখতে হবে রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। নফ্সকে (রিপুকে) বশে বা দমনে রাখার মাস। নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ছবর ও ধৈর্য্যরে মাস’। হুযুর (সা.) আরও বলেছেন-প্রত্যেক জিনিষেরই যাকাত আছে এবং শরীরের যাকাত রোজা। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকটি কাজ তার নিজের জন্য তবে রোজা ব্যতীত। কেননা রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার জন্য প্রতিদান দেব (বুখারী ও মুসলিম)। বর্তমান যুগে চিকিৎসকগণ রোজা রাখাকে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলছেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যাচার ও পরনিন্দা বা পরচর্চা থেকে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হলো মিথ্যাকে সংযত রাখা। একবার রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হলো-কোন কাজে জান্নাতে যাওয়া যাবে? তিনি উত্তরে বললেন-আল্লাহর ভয় ও সৎচরিত্র। অত:পর প্রশ্ন করা হলো কোন কাজের জন্য মানুষ জাহান্নামে যাবে? তিনি বললেন-অসংযত, নিন্দা ও লজ্জাস্থানের হেফাযত না করার জন্য। অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন- অসংযত নিন্দা মানুষকে আগুনের ইন্দন জোগাবে।
ইসলামের নির্দেশ হলো যথাসম্ভব কম কথা বলা। যে যত বেশী কথা বলবে তার ভুল তত বেশী হয়, তাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে। যিনি কম কথা বলেন, তিনি অনেক আপদ থেকে বেঁচে যান। ইংরেজি ভাষায় একটা কথা আছে দ্যা টাং, ইজ-এ ম্যানস বেষ্ট ফ্রেন্ড। ইট ইজ অলসো হিজ ওয়াষ্ট এনিমি। অর্থাৎ জিহবা একজন মানুষের সর্বোত্তম বন্ধু আবার এটা তার সর্বনিকৃষ্ট শত্রুও বটে। আমাদের মাতৃভাষায় একটা কথা আছে- নীরবতা হিরন্ময়। মানে হলো- বাচাল কথা বার্তার চেয়ে নীরবতাই বাঞ্চনীয়। আর আরবী ভাষায় প্রবাদ হলো- মান সাকাতা সালিম। অর্থাৎ যে নীরব রহিল সে নিরাপদ থাকিল। এই জন্য প্রত্যেক মুমিনের উচিত অহেতুক কথা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। জিহ্বা সংযত রাখার অর্থ নিজেকে মিথ্যা থেকে বাঁচানো আর পরচর্চা, পরনিন্দা থেকে বিরত থাকা। হাদীসে ভাল কথা কে ‘সদকা’ বলা হয়েছে। সুতরাং মাহে রমজান মাস ব্যাপী প্রশিক্ষণ নিতে হবে-অনৈতিক ও অনৈসলামিক কর্মকান্ড, অসদাচরণ কথাবার্তা, অবৈধ লেনদেন এবং পরচর্চা ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকার। রমজানের শিক্ষা হলো মিথ্যা কথা বলে খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল দিব না। ফলমূলে ফরমালিন মেশাবো না। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করব না। মজুদদারি কালোবাজারি, মুনাফাখোরী ও প্রতারণা করব না।
পরিশেষে বলব, রমজান মাস কঠোর সাধনা ও তপস্যার মাস। এ মাস আত্মশুদ্ধির মাস। সিয়াম সাধনার কঠিন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যদি মিথ্যাচার ও পরনিন্দা বর্জনের প্রাত্যাহিক অভ্যাস গড়ে তুলি তাহলে সমাজ থেকে যাবতীয় অনাচার পাপাচার ও দুর্ণীতি দূর হবে এবং দেশ একটি শান্তির আবাসস্থল হিসাবে গড়ে উঠবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT