ধর্ম ও জীবন

 তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম

দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম মতলিব প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৬-২০১৮ ইং ০১:৪৬:৪২ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

আমরা রোজা রাখি, কেন রাখি? এ জন্যই আমরা রাখি যে, এটি আমাদের প্রভু বিশ্ব জাহানের মালিক, সৃষ্টিকর্তা, জীবন যাপনের জন্য সব ব্যাপারে জীবন বিধান বা আইনদাতা, আমাদের জীবন-মৃত্যুর মালিক মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন। সে হুকুম পাই আমরা কুরআনের সূরা বাকারায়। আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন-‘হে ঈমানদারগণ তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল। আশা করা যায় এ দ্বারা তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণাবলী সৃষ্টি হবে।’ আল্লাহর এ নির্দেশ পালনের জন্যই আমরা রোজা রাখি। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমরা খাওয়া দাওয়া করি না, অনেক হালাল কাজ থেকে আমরা বিরত থাকি, সেহরি খাওয়ার জন্য রাতে উঠে খাওয়া আরম্ভ করেছি, খাওয়া চলছে, হঠাৎ সাইরেনের আওয়াজ, এরপর ফজরের আযান। অমনি খাওয়া দাওয়া বন্ধ। এখন থেকেই রোযা আরম্ভ। দিনে কতো তৃষ্ণা লাগে, ক্ষুধায় কাতর, ঘরের মধ্যে লোভনীয় খাদ্য আছে, কিন্তু যতোই তৃষ্ণা লাগুক, যতোই ক্ষুধা লাগুক, তাতে খাবার জন্য হাত দেই না। ঘরে কেউ নেই, কেউ না দেখুক কিন্তু আল্লাহ আমাকে রোজা রাখবার যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেই আল্লাহ’তো দেখে ফেলবেন। তখনতো আমি আসামী হয়ে যাব। মনের মধ্যে যে আল্লাহর এই ভয় এবং কেউ না দেখলেও আমার আল্লাহ আমাকে দেখেছেন, তাঁর বিধানের খেলাফ করলে আমাকে কঠিন শাস্তির সম্মুখিন হতে হবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁর নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হবো। মনের এ যে বাস্তব অনুভূতি, দুনিয়ার কেউ না দেখলেও যেহেতু আল্লাহ দেখেছেন, তাই কিছুই খাই না। মনের এ অবস্থানকেই তাকওয়া বলে। এ তাকওয়া মানুষের মধ্যে সৃষ্টির জন্য রমযান মাসের রোজা আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি প্রশিক্ষণ।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে খেলাফতের দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। খেলাফতের দায়িত্বের অর্থ হলো-আল্লাহর বান্দারা দুনিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থা আল্লাহর বিধান অনুসারে পরিচালনা করে আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণের ব্যবস্থা করবে। দুনিয়ার যাবতীয় জুলুম-নির্যাতন-সন্ত্রাস বন্ধ করে দিয়ে, মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে আল্লাহর বিধানের অধীনে নিয়ে আসবে। এজন্য আল্লাহ প্রেরিত সমস্ত নবী-রাসুলগণ দুনিয়ায় এসে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধানের দাওয়াত দিয়েছেন। সেই দাওয়াত যারা প্রহণ করেছেন, তাঁদেরকে নিয়ে সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করেছেন এবং যারা সংগঠিত হলেন তাঁদেরকে যোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাদেরকে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উপায়ে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার চেষ্টা করেছেন। আল্লাহর আইন চালু করতে চেয়েছেন। যাতে মানবতার কল্যাণ সাধিত হয়।
আল্লাহর বান্দা হিসাবে পৃথিবীতে দায়িত্ব পালনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হচ্ছে, তাকওয়া। অর্থাৎ মনে আল্লাহর ভয়, কেউ না দেখলেও আমার আল্লাহ আমার কাজকর্ম সব দেখেছেন। যা রোজার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়। মানুষের মধ্যে যার তাকওয়া শক্তি যতো বেশি, সে ততোই আল্লাহর নেক বান্দা, যাদেরকে আমরা সৎ লোক বলে থাকি, তাকওয়ার গুণই মানুষকে ভালো মানুষ হতে সাহায্য করে। তাকওয়া সম্পন্ন লোক অর্থাৎ সৎ লোক ছাড়া ব্যক্তি জীবন থেকে সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কোনো কল্যাণ আসতে পারে না। একজন লোক যখন চিন্তা করে আমি যদি অন্যের অধিকার হরণ করি, অন্যকে ঠকাই, অন্যকে মিথ্যা বলি, রিলিফের মাল চুরি করি, চাঁদাবাজি করি, ঘুষ খাই, মানুষকে নির্যাতন করি, ওয়াদা ভঙ্গ করি, শপথ ভঙ্গ করি, চুক্তি লঙ্ঘন করি, নিজ দায়িত্বে অবহেলা করি তাহলে কেউ যদি আমাকে ধরতে না পারে, কেউ আমাকে না দেখে, কোনো সাক্ষীও যদি না থাকে, তবুও আল্লাহ সব দেখেছেন। আল্লাহর কাছ থেকে তা রেহাই পাব না। এর পরিণতি আমাকে ভোগ করতেই হবে। তাহলে মানুষ নিজের বিবেকের তাগিদেই এসব কাজ থেকে বিরত থাকবে, সমাজে দুর্নীতি বন্ধ হবে। মানুষ মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত হবে। তাই নেক বা সৎ মানুষ গড়ে তুলে, সেই সব মানুষের নেতৃত্বে যাতে একটা সুখী ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে উঠে। বান্দাদেরকে তাকওয়া সম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্যই মহান আল্লাহ রমজান মাসের রোযা ফরজ করেছেন। এ রমযান মাসেই পৃথিবীর মানুষের জন্য জীবন ব্যবস্থা হিসাবে আল্লাহপাক কুরআন নাযিল করেছেন। এ কুরআন শুধু কিছু ধর্ম-কর্মের জন্যই আল্লাহ নাযিল করেন নি। ইহা পৃথিবীতে মানবজাতির জীবন যাপনের গাইড লাইন হিসেবেই দেয়া হয়েছে। কুরআনে যেমন নামায-রোজা-হজ্ব-যাকাতের কথা বলা হয়েছে, তেমনিভাবে সমাজনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির ব্যাপারেও বিধান দেয়া হয়েছে। মুসলমান শুধু ব্যক্তিগত ব্যাপারে কিছু মানবে, আর অন্যান্য সব মানবে না, তা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।
আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন-‘হে ঈমানদারগণ তোমরা পূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হও’ অর্থাৎ আল্লার দেয়া ব্যবস্থা সর্বক্ষেত্রেই মানতে হবে। মসজিদে ইসলাম, রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষ এবং অর্থনীতিতে সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদ মানবো, তাহলে ইসলাম গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান বা দ্বীন অপূর্ণাঙ্গ নয় যে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অন্য কিছু ধার করতে হবে। আল্লাহর দেয়া পূর্ণাঙ্গ ইসলামই আমাদেরকে মানতে হবে। দেশের শাসন ব্যবস্থা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার আলোকে সংস্কার না করলে পূর্ণ ইসলাম মানা যাবে না। আর তাকওয়া সম্পন্ন বা সৎ লোকের নেতৃত্ব ছাড়া কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন করা যাবে না। তাই দুর্নীতিমুক্ত, কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা একমাত্র সৎ লোকের দ্বারাই সম্ভব। আর রোজাই আমাদেরকে সে সমস্ত গুণাবলী অর্জনে সাহায্য করে। রোজার মাসে আল্লাহ আমাদেরকে আরও একটি নিয়ামত দান করেছেন, তাহলো শবে ক্বদর। এ একটি রাত হাজার মাসের চেয়েও অধিক উত্তম। তাফসিরকারকগণ বলেছেন, এ রাতের নেক আমল হাজার মাসের নেক আমল অপেক্ষা অধিক উত্তম। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘ক্বদরের রাত রমযান মাসের শেষ দশ রাত্রিতে রয়েছে। যে ব্যক্তি উহার সোয়াব লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, আল্লাহ তার আগের ও পিছনের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন’। (মাসনদে আহমদ)
রাসুল (সা.) রমযানের শেষ দশ দিন নিয়মিত এতেকাফ করতেন। আমাদেরকেও আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য এতেকাফের চেষ্টা করা প্রয়োজন। রমজান মাসের রোযার বিরাট মর্যাদা ও কল্যাণ সম্পর্কে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ব্যক্তি ঐ রোজাদারের সমপরিমাণ পুরস্কার পাবে, তাতে ঐ রোজাদারের পুরস্কারের কমতি হবে না। যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি পুরিয়ে আহার করাবে। আল্লাহ তাকে আমার হাউজে কাউছার থেকে পান করাবেন। এরপর জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে আর তৃষ্ণার্ত হবে না। যে ব্যক্তি রমযান মাসে অধীনস্থদের উপর থেকে কার্যভার লাঘব করবে আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবেন এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত দিবেন। রমযান মাসের আগমনে আসমানের দুয়ার খুলে দেয়া হয়, রমযান মাস এলে জান্নাতের দুয়ার খুলে দেয়া হয়, রমযান মাস এলে রহমতের দুয়ার খুলে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি রমযান মাসে একটি ফরজ আদায় করবে, সে ঐ ব্যক্তির সমতুল্য, যে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করে। যে ব্যক্তি রমযান মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করবে, সে ঐ ব্যক্তির সমতুল্য, যে অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করে। রমযান মাস পরস্পরের সহানুভূতি আদায়ের মাস। রমযানে মুমিনের জীবিকা বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। মাহে রমযান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের মাস। আমরা যতো বেশি চেষ্টা সাধন করবো ততো বেশিই তা লাভ করবো। এ মাসে সেহরির একটু আগে উঠলে অতি সহজে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া যায়। কুরআন নাজিলের এ মাসে সম্পূর্ণ কুরআন একবার বুঝে পড়া যায়। মানুষকে আল কুরআন শুদ্ধ করে পড়ার এবং জীবন ব্যবস্থা হিসাবে কুরআনের বিধানকে ব্যাপকভাবে মানুষকে বুঝানোর ব্যবস্থা করা যায়। রমযান মাসে আল্লাহর অফুরন্ত ভা-ার থেকে লাভবান হবার তাওফিক মহান আল্লাহ আমাদেরকে দান করুন। আমীন ॥

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT