সম্পাদকীয়

বনের ওপর আগ্রাসন

প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫০:১৮ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

বনের ওপর মানুষের আগ্রাসন বলা যায় চিরদিনের। মানুষ বন উজাড় করবে, এ যেন একটা স্বভাবজাত বিষয়। বনে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় নির্বিচারে। খোদ বনবিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলই ধ্বংস হচ্ছে অব্যাহতভাবে। শুধু বনাঞ্চল ধ্বংস নয়, বরং বনাঞ্চল উজাড় করে সেই ভূমি বেদখল হচ্ছে। সেখানে গড়ে উঠছে নানা ধরনের স্থাপনা। সিলেটের বিভিন্ন বনাঞ্চলসহ সারাদেশের প্রতিটি বনের অভ্যন্তরে কমে যাচ্ছে বৃক্ষের সংখ্যা। গাছ কর্তন ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মরে যাওয়া গাছের স্থানে নতুন গাছ জন্ম না নেয়ার হুমকির মুখে এখন বনাঞ্চল। এমনকি জলবায়ুর পরিবর্তনসহ নানা কারণে বিলুপ্তির তালিকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রজাতির উদ্ভিদ। বনভূমি কিংবা বনাঞ্চল যেভাবেই হোক রক্ষা করতে হবে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে। তা না হলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় মোকাবেলা ও পরিবেশ সুরক্ষা কিছুতেই সম্ভব নয়।
দেশে বর্তমানে কী পরিমাণ বনভূমি রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সরকারের বন অধিদপ্তর বলছে, বনাঞ্চল আগে যা ছিলো তা-ই রয়ে গেছে। অর্থাৎ বনাঞ্চলের পরিমাণ কমছে না। আর বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে আয়তনের ১৭ শতাংশের কিছু বেশি জমিতে রয়েছে বনাঞ্চল। আবার অনেকে বলছেন বনভূমি কমলেও সবুজায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে, আচ্ছাদিত বনভূমির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। সামাজিক বনায়নসহ বনব্যবস্থায় সহব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের ফলে সারাদেশে মোট বৃক্ষের সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করছেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানীগণ। বন অধিদপ্তরের মতে দেশে মোট বনভূমির পরিমাণ ২৬ লাখ হেক্টর। বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমি হচ্ছে ১৬ লাখ হেক্টর।
কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, বনভূমির বেদখল হওয়ার সঠিক তথ্য নেই বনঅধিদপ্তরে। তাদের মতে কেবল সরকারেরই বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক বনভূমির তিন লাখ হেক্টর জমি জবরদখল রয়েছে। এর বাইরেও বনবিভাগের বিপুল পরিমাণ জমি জবরদখল হয়েছে। যার কোন পরিসংখ্যান নেই। বিশেষজ্ঞগণ পুরো ব্যাপারটির জন্য বন অধিদপ্তরের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে বনদস্যুদের সঙ্গে বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের যোগসাজশ, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, মান্ধাতা আমলের জরিপ ব্যবস্থাপনাসহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে বনঅধিদপ্তরের কার্যক্রম এখন প্রশ্নের সম্মুখীন, যে কারণে দেশের বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে। জানা গেছে, বন বিভাগ নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য বনভূমি বেদখল কিংবা বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে চায় না। শুধু সরকারি বনাঞ্চলই নয়, দেশে প্রাকৃতিক বনের পরিমাণও কমছে। বর্তমানে সাতশতাংশের বেশি প্রাকৃতিক বন নেই।
বন উজাড় করে নির্মিত হচ্ছে আবাসস্থল, রাস্তাঘাট, কৃষি জমি। এজন্য বাড়ছে উষ্ণতা, পরিবর্তিত হচ্ছে ঋতু বৈচিত্র্য, জলাবদ্ধতা বৃদ্ধিসহ বাড়ছে মরুময়তা। সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। বন হ্রাসের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৮ শতাংশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন উজাড় হচ্ছে সারা বিশ্বে। তারপরেও ৩১ শতাংশ বনভূমি রয়েছে এখনও সারা বিশ্বে। অথচ আমাদের দেশে বনের পরিমাণ ১৭ শতাংশ। আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি দেশে আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা জরুরি। যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে হবে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমি। মূলত বন বিভাগের ‘বনখেকো’ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সঙ্গে এই অধিদপ্তরের জনশক্তি বাড়িয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে আরও কর্মতৎপর করে তুলতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT