পাঁচ মিশালী

প্রাণঘাতি বজ্রপাত : মুক্তির উপায়

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৬-২০১৮ ইং ০২:৩৩:০৩ | সংবাদটি ৩৭ বার পঠিত

বাংলাদেশে সাধারণত কালবৈশাখীর সময় বজ্রপাত হতে আগের বছরগুলোতেও দেখা যেত। বর্তমান কালে আকাশে মেঘ দেখলেই আগের দিনের চেয়ে এখন জনমনে একটু বেশি ভয়ের আশঙ্কা দেখা দেয়। কেননা বর্তমানে কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশ এমনিতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ হিসাবে খ্যাত। তাই প্রকৃতিগত ভাবেই প্রতি বছর ভয়াবহ বন্যা, সাইক্লোন, অতিবর্ষণ, পাহাড় ধস ইত্যাদি দুর্যোগের দ্বারা শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়ে থাকে, তলিয়ে যায় হাজার হাজার একর জমির ফসল, নষ্ট হয় শত শত ঘরবাড়ী ও বিপুল পরিমাণ বনজঙ্গলসহ প্রাণীসম্পদ। আমরা সর্বদাই প্রকৃতির অনুকম্পার উপর নির্ভরশীল, তাই এই বিশ্ব ভূবনের একমাত্র মালিক ও রক্ষক আল্লাহর উপর ভরসা করেই আমরা বেঁচে আছি এবং আগামীতেও বেঁচে থাকব ইনশাল্লাহ।
তারপরও আমরা মানুষ হিসাবে বজ্রপাতের কারণে এমন হঠাৎ মৃত্যু মেনে নিতে পারি না। গত ৪ মে শুক্রবার লাবনী আকতার (১২) নামের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বাড়ীর উঠোনে কানামাছি খেলার সময় হঠাৎ বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। জামালপুর জেলায় জান্নাতি আক্তার (১৪) নামের ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী বৃষ্টির মধ্যে খুশিতে গাছের আম কুড়াতে গিয়ে হঠাৎ বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। কিশোরগঞ্জ জেলায় বাবার সাথে নিজ জমির ধান নিয়ে বাড়ী ফেরার পথে শরীফুল ইসলাম (১৫) নামের এক মাদ্রাসার ছাত্রের বজ্রপাতে মৃত্যু হয়। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের মখলিছ আলীর পুত্র ফেরদৌস মিয়া (১২) দুপুর ১২টার দিকে বাড়ীর পাশের ডোবায় মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। গত কয়েক বছরে বজ্রপাতের কারণে বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। গত কয়েক দিনের বজ্রপাতে সারা দেশের প্রায় ৬০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। চলতি মে মাসে এই বজ্রপাতের মাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। কিন্তু প্রাকৃতিক রোষানলে পড়ে এমন মৃত্যুর কারণ খুঁজে বেশ কিছু যুক্তি উপস্থাপন করেছেন দেশের বিশেষজ্ঞবৃন্দ।
বজ্রপাতের কয়েক সেকেন্ড আগে নির্দিষ্ট এই এলাকার বাতাস বিদ্যুতায়িত হয়ে যায়। খেয়াল রাখুন, যদি আপনার মাথার চুল ও শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায় এবং সমস্ত শরীর একদম সোজা হয়ে স্থির হয়ে যেতে চায় তখনই বুঝবেন আপনার আশপাশে ভয়াবহ বজ্রপাত হতে যাচ্ছে। তাই মুহূর্ত দেরী না করে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ স্থানে সরে যান অথবা নিরাপদ হওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। একদম ফাঁকা মাঠে থাকলে তাৎক্ষণিক মাটি স্পর্শ না করে যতটুকু সম্ভব মাটির কাছাকাছি থাকুন। আপনার ভিজা কাপড় বা হাতের কোনো ধাতব বস্তু থাকলে তা ফেলে দিয়ে রাবারের জুতা পরে বসে থাকুন। কেননা বজ্রপাতের সময় এলাকাটির মাটি, পানি, বাতাস, ধাতব পদার্থসহ সবকিছু বিদ্যুতায়িত হয়ে যায়।
বজ্রপাতে সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্তৃক কিছু জরুরী নির্দেশনা দিয়েছেন, যা জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য উত্থাপন করা হলÑ
ক) বজ্রপাত বা ঝড়ের সময় বাসাবাড়ির ধাতব পদার্থ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।
খ) প্রতিটি বাসাবাড়ীতে বজ্র নিরোধ দন্ড স্থাপন করার চেষ্টা করুন।
গ) বজ্রপাতের সময় একসাথে দাঁড়াবেন না, অন্তত ৫০ হাত দূরে দূরে অবস্থান করুন।
ঘ) একই বাড়ীতে সবাই এক কক্ষে না থেকে পৃথক পৃথক কক্ষে অবস্থান করুন।
ঙ) ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগগুলো খুলে রাখুন বা বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন রাখুন।
চ) এপ্রিল হতে জুন মাসেই বেশি বজ্রপাত হয় তাই এই মাসগুলোতে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে সাবধানে বাহিরে যাবেন।
ছ) খোলা জায়গায়, বড় গাছের নীচে নয় বরং বড় গাছ থেকে দূরে থাকুন।
জ) ছেঁড়া বিদ্যুতের তার ও বিদ্যুতের তারের নীচে থাকবেন না
ঝ) যত দ্রুত সম্ভব বজ্রপাতের সময় দালান বা কংক্রিটের ছাউনি যুক্ত ঘরে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করুন।
ঞ) বজ্রপাতের সময় ঘরের জানালার কাছে থাকবেন না এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির নিকট থেকে দূরে থাকুন।
ট) বজ্রপাত বা ঝড়ের সময় প্লাস্টিকের জুতা এবং কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করুন।
ঠ) বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায়, মাঠে বা উঁচু স্থানে থাকবেন না।
ড) বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে নদী, পুকুর, ডোবা, জলাশয়, ভিজা জায়গা থেকে দূরে থাকুন।
ঢ) বজ্রপাতের সময় শিশুদেরকে খোলা মাঠে খেলাধূলা থেকে বিরত রাখুন, নিজেও বিরত থাকুন।
দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে জানাচ্ছেন, বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল জলবায়ুর পরিবর্তন ও বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এ ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের বনজঙ্গল কেটে ফেলা, বড় বড় গাছপালা কমে যাওয়া, কলকারখানা ও গাড়ীর ক্ষতিকর গ্যাস সমৃদ্ধ উপাদানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। তাই সবাইকে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে, পরিবেশকে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পতিত জায়গায় পর্যাপ্ত গাছ লাগানো যেমন জরুরী তেমনি কলকারখানাসহ গাড়ী ও যন্ত্রপাতি ইত্যাদির ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হওয়ার পথ বন্ধ করা জরুরী নয়। তো বায়ুমন্ডলির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে বজ্রপাতের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আমাদের দেশ এমনিতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ, তার উপর বজ্রপাতের মতো দুর্যোগের দেশ হিসাবে বিশ্বের কাছে পরিচিত হোক, তা আমরা চাই না। তাই প্রাণঘাতি বজ্রপাত দেশ থেকে বিতাড়িত হউক এটাই দেশবাসীর কাম্য।
জনগণকে সচেতন করা সম্ভব হলে ভয়াবহ এ দুর্যোগ থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করা সম্ভব। তারপরও যদি হঠাৎ প্রচন্ড গতিতে ঝড়বৃষ্টি বা বজ্রপাত শুরুর সময় মাঠে ঘাটে, হাওরে বা নদীতে যারা কাজ করেন, তাদেরকে নিরাপদ করার জন্য বজ্রপাতরোধী কোনো যন্ত্র বা উপকরণ তৈরী করা প্রয়োজন। শহরের তুলনায় গ্রামেই বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। বর্তমানে গ্রামের মানুষ আকাশের ঘনঘটার রূপ দেখলে ও গুরুগম্ভীর ডাক শুনলে খুবই ভয় পেয়ে থাকে এবং বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়, ফলে আঁতকে উঠে প্রাণ। তাই গ্রামের মানুষগুলো দ্রুত বজ্রনিরোধ স্থাপনের জন্য সরকারের নিকট দাবী জানাচ্ছে। বিশেষ করে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ, হাওর, বিল বা চাষাবাদ করার জমি, বাড়ী এলাকায় বজ্ররোধক স্থাপনের দাবী জানাচ্ছে দেশের আতঙ্কিত জনসাধারণ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT