পাঁচ মিশালী

ফার্সি ভাষার মহাকবি

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৬-২০১৮ ইং ০২:৩৫:১২ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

ফার্সি ভাষার মহাকবি শেখ সাদি সময়ে সময়ে সুন্দর সুন্দর বিখ্যাত বাণী বা উপদেশ দান করতেন। তার একটি বিখ্যাত বাণী গভীর আস্তায় হৃদয়ে ধারণ করে ইবাদতের সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। সাদি বলেছেন, ‘আমি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই। তারপরেই ভয় পাই যে আল্লাহকে মোটেই ভয় করে না।’
শেখ সাদি তার কবি নাম। তার পুরো নাম আবু মুহাম্মদ মোশাররফ উদ্দিন বিন মোসলেহ উদ্দিন আবদুল্লাহ সাদি সিরাজি (১১৮৪-১২৯১ খ্রি.)। তার পিতার নাম সৈয়দ আবদুল্লাহ। মা’র নাম মাইমুরা খাতুন। সাদির পিতা ইরানের রাজদরবারে চাকুরি করতেন। সাদির বাল্যকালেই তার পিতার মৃত্যু হয়। তার দিন কাটে খুব কষ্টেসৃষ্টে। তাকে সেবা যতœ ও বড় করে তোলার দায়িত্ব পড়ে তার নানার ওপর। কবি সাদি অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী ছিলেন। সাদির অসম্ভব মেধাশক্তির জন্য তার মায়ের ভাবনার অন্ত ছিলো না। এক ধনী ব্যক্তির সহায়তায় সাদি স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ২১ বছর বয়সে শেখ সাদি একটি কবিতা লিখে বাগদাদের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজামিয়া মাদরাসার শিক্ষক আবুল ফাত্তাহ বিন জুজি’র নজরে পড়েন। তিনি মুগ্ধ হয়ে সাদিকে মাসোয়ারার ব্যবস্থা করে দেন। ৩০ বছর বয়সে তিনি ধর্ম, দর্শন, নীতিশা¯্র অধ্যয়ন করে মাদরাসার ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ‘মাওলানা’ উপাধি লাভ করেন।
শেখ সাদি তার দীর্ঘ জীবনের ৩০ বছর ব্যয় করেন লেখাপড়ায়, ৩০ বছর ব্যয় করেন দেশভ্রমণে, গ্রন্থ রচনায় ব্যয় করেন ৩০ বছর আর আধ্যাত্মিক চিন্তায় ব্যয় করেন ৩০ বছর। শোনা যায় তার জীবনের উক্ত চারটি পর্যায় যে দিন পূর্ণ হয় সে দিনই তিনি ইন্তেকাল করেন। শেখ সাদি পায়ে হেঁটে চৌদ্দ বার হজ্ব পালন করেন।
কবি শেখ সাদির অমর সৃষ্টি ‘গুলিস্তা ও বুস্তা’। বিশ্ব সাহিত্য ভা-ারে কাব্যগ্রন্থ দু’টিকে অনবদ্য সৃষ্টি বলে গণ্য করা হয়। গুলিস্তায় কবি লিখেছেন, ‘আমি কখনো কালের কঠোরতা ও আকাশের নির্মমতার ব্যাপারে অভিযোগ করিনি। তবে একবার নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। কারণ পায়ে তখন জুতা তো ছিলই না এমনকি জুতা কেনার মতো অর্থও ছিলো না। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ইরাকের সমজিদ আল কুফায় গিয়ে উঠলাম। তখন দেখি একটি লোক শুয়ে আছে যার একটি পা-ই নেই। তখন খোদাকে শোকর জানিয়ে নিজের খালি পা থাকায় সন্তুষ্ট হলাম।
শেখ সাদির বাবা সৈয়দ আবদুল্লাহ শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মানুষ ছিলেন। এই বাবার কাছেই শেখ সাদির লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়। কবি শেখ সাদি প্রথম দিকে কিশোরদের উপযোগী উপদেশমূলক গল্প ও কবিতা লিখতেন। গল্পের মাধ্যমে তিনি ছোটদের, কিশোরদের যে সব উপদেশ দান করেছেন সেগুলো সত্যিকারভাবে মানুষ হয়ে ওঠার জন্য খুবই প্রয়োজন। মানুষের বেড়ে ওঠা বা জীবনের সামগ্রিক বিকাশকে লক্ষ্য রেখেই সাদি গল্প-কবিতা রচনা করেছেন। মানব চরিত্রে সততা এমন একটি গুণ যা মানুষকে দিয়েছে মহান মর্যাদা। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে শুনিয়েছেন কিভাবে সততার পুরস্কার পাওয়া যায়, কিভাবে বিনীতশীলিত হতে হয়, কিভাবে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা করতে হয়। সাদির রচনায় কিশোর বয়সে নৈতিক চরিত্র ঠিক রাখার ঠিক নির্দেশনা পাওয়া যায়। তার লেখায় পবিত্র কুরআন-হাদিসের বিস্তর উদ্ধৃতির ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ সাদির অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ‘কসিদা’ যা দোয়া-মাহফিলে, মিলাদ-মাহফিলে সুর করে সমবেত কন্ঠে আবৃত্তি করা হয়। ‘বালাগাল উলা বিকামালিহি/ কাশাফাদ দুজা বিজামালিহি/ হাসুনাত জামিউ খিসালিহি/ সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহী। (অতিশয় মহান গুণগান যার/ রূপে যার দূরীভূত হলো অন্ধকার/ মনোহর যার সমুদয় আচার/ পড় সবে দরূদ উপরে তাহার)।
কবি এরকম কসিদা বা কবিতা ছাড়াও কতিপয় বিখ্যাত বিখ্যাত বাণী বা উপদেশও রেখে গেছেন আমাদের জন্য। এগুলো অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ এবং চিন্তা ও মনন জগতের অমূল্য সম্পদ। শেষ সাদির এরকম প্রণিধানযোগ্য দু’টি বাণী নি¤œরূপ :
ক) দুই শত্রুর মধ্যে এমনভাবে কথাবার্তা বল, যেন তারা মিলে গেলেও তোমাকে লজ্জিত হতে না হয়।
খ) প্রতাপশালী লোককে সবাই ভয় পায় কিন্তু শ্রদ্ধা করে না।
তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদক তানিয়া তুষ্টি’র ‘শেখ সাদির অবাক জীবন’, ৬ এপ্রিল ১৮।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT